ফেসবুকের কারণে সংসার ভাঙার সংখ্যা বাড়ছে

আমাদের নতুন সময় : 13/04/2019

দেবদুলাল মুন্না : ফেসবুক ব্যবহারের কারণে শতকরা ৯০ ভাগ বিবাহবিচ্ছেদ হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। তিনি বলেন, ফেসবুকের কারণে স্বামী সন্দেহ করছেন স্ত্রীকে আর স্ত্রী স্বামীকে সন্দেহ করছেন। নিজেদের মধ্যে কলহ দিন দিন বাড়ছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আজিমপুর কমিউনিটি সেন্টারে একটি অভিভাবক সমাবেশে এ কথা বলেন হানিফ।
গতকাল শুক্রবার বসুন্ধরার শিউলি বেগম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। এতে লেখেন, ‘দীর্ঘদিন আমি ও মুহিম সন্তানের কথা ভেবে একই বাসায় আলাদা আলাদা থাকতাম। কিন্তু এখন আর সম্ভব না। সত্য কঠিন। কঠিনেরে ভালোবাসিলাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আগামী সপ্তাহে ডিভোর্সের আনুষাঙ্গিক কাজ সারবো। এরজন্য দায়ী এই ফেসবুক। এখান থেকে মুহিম অন্য নারীর সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েছে।’ ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সালমা বছরখানেক আগে স্বামী শিবলী সাদিককে তালাক দিয়ে নতুন বিয়ে করেছিলেন। বর্তমানে তাদের মধ্যেও দাম্পত্য সমস্যা যাচ্ছে।তার বর্তমান স্বামীর সঙ্গে এক মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে। এ নিয়ে তিনি ইতোমধ্যে তিনি মিডিয়ার কাছে মুখও খুলেছেন। সম্প্রতি তিনিও পোস্ট দিয়েছেন, ‘ফেসবুক হতে সাবধান। আপনার আপনজনকে হারিয়ে ফেলছেন না তো ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুদের ভীড়ে?’ কণ্ঠশিল্পী হৃদয় খান স্ত্রী মডেল অভিনেত্রী সুজানাকে, অভিনেত্রী সারিকা স্বামী মাহিন করিমকে তালাক দিয়েছেন। তালাকের পেছনে বড়ো কারণ হিসেবে তারা ফেসবুককে দায়ী করেছেন। ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে প্রেম ও বিয়ের প্রলোভনদেখিয়ে ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ফাহিম নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১০। গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে রায়ের বাজারের ২৭৪/১, ফ্লাট- ডি/২ বাসা থেকে আলামিন ওরফে ফাহিমকে গ্রেফতার করা হয়। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলের রাজাপুর গ্রামে। এতথ্য জানিয়েছেন র‌্যাব-১০ এর কোম্পানি কমান্ডার (সিপিসি-১) মেজর আশারাফুল হক। অতীতকালে সংসার ছিল বজ্র কঠিন বাধনে বাধা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন ঠুনকো কাচের দেয়ালে পরিনত হয়েছে সেই বন্ধন। গ্রাম থেকে শহর সবখানেই প্রায়অভিন্ন চিত্র। স্বপ্নগুলো সত্য হয়ে উঠতে না উঠতেই খানখান হয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের পরিমাণ বেড়েছে দ্বিগুন আর সঙ্গীদের থেকে আলাদা থাকার প্রবণতা বেড়েছে তিনগুন। সম্প্রতি বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।দেশে এধরনের সামাজিক পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে বিবাহ নিবন্ধক, মনোবিজ্ঞানী এবং জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন হ্রাস, বহুগামিতা, বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্ক, অতিমাত্রায় ভার্চুয়াল জগতে বিচরণ, অর্থনৈতিকভাবে নারীদের শক্ত অবস্থান, পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণেই বিবাহ বিচ্ছেদ এবং আলাদা থাকার প্রবণতা বাড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকায় একজন নারী এখন তার পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা করতে পারছে। পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে অনেক নারী নিজের পেশা জীবনকে গুরুত্ব¡ দিচ্ছেন। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে নারী নিজেই এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।’
প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে বেশি তালাক হচ্ছে ঢাকা সিটিতে। ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় তালাক হচ্ছে ১টি করে। ঢাকার অভিজাত অঞ্চলখ্যাত উত্তর সিটিতে তালাকের প্রবণতা বেড়েছে ৭৫ ভাগ। দক্ষিণ সিটিতে বেড়েছে ১৬ শতাংশ। দুই সিটিতে আপোস হচ্ছে গড়ে ৫ শতাংশের কম। তালাকের সবচেয়ে বড় কারণ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ‘বনিবনা না হওয়া’।
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বলেন, ‘ফেসবুকে সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণে দাম্পত্য বিচ্ছেদ বাড়ছে।এরকম খবর আমাদের কাছে রয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শোয়েব আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সমাজে মানুষ এতোই যান্ত্রিক হয়ে উঠছে যে সে এখন বাস্তব আড্ডার চেয়ে পছন্দ করে ভার্চুয়াল আড্ডা। চ্যাটিং বরলেই একজনের সাথে গল্প করা যায়। নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। এভাবে ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেও কখনো কখনো জড়িয়ে পড়ছে বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে। ফলে একসময় অশান্তি দেখা দিচ্ছে।’
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ফারাহ দীবা বলেন, ‘বিয়ে বিচ্ছেদের কারণকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এর মধ্যে একটি মুখ্য কারণ হলো নারীর আর্থিক সক্ষমতা। দেখা যায়, কর্মজীবী নারীদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেশি। আবার ফেসবুকের মাধ্যমে অজনাকে জানার আগ্রহও প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে মানুষকে প্ররোচিত করছে।’ সম্পাদনা : ইকবাল খান
বিবাহ বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল বলেন, বিয়ে ভাঙার ক্ষেত্রে ফেসবুক বা মোবাইল কালচার বড় প্রভাব ফেলছে । বিশেষ করে ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আমাদের মধ্যে নানা ধরনের আকাঙ্খা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখান থেকেই বাড়ছে অপ্রাপ্তিবোধ ও হতাশা।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]