• প্রচ্ছদ » » ‘ছেঁটে দেওয়া’ নববর্ষের অনুষ্ঠান বনাম বর্ষবরণের হুজুগ


‘ছেঁটে দেওয়া’ নববর্ষের অনুষ্ঠান বনাম বর্ষবরণের হুজুগ

আমাদের নতুন সময় : 14/04/2019

চিররঞ্জন সরকার

পুলিশের পক্ষ থেকে এবারের বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সর্বশেষ ঘোষণা মতে, এবারের বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায় কোনো মুখোশ পরে অংশ নেয়া যাবে না। বিকাল পাঁচটার পর কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না। সকালের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ঢুকে অবাঞ্ছিত কেউ যেন আনন্দ-উৎসবে বিঘœ ঘটাতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর রাখবে পুলিশ। বছর তিনেক আগে পহেলা বৈশাখে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার মতো কোনো কিছু যেন এবার না ঘটে, সেজন্যই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা। তবে আশার কথা হচ্ছে নিরাপত্তার নামে পুলিশের এই ‘ছেঁটে দেওয়া’ নববর্ষ পালন নিয়েও মানুষের উৎসাহের কোনো শেষ নেই। প্রকৃতির উত্তাপকে থোড়াই কেয়ার করে মধ্যবিত্ত নাগরিকরা ঠিকই নিজেদের মতো করে বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মেতে উঠেছে। যেন বর্ষবরণ করতে না পারলে, বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারলে, বৈশাখের দিন ইলিশ খেতে না পারলে পুরো মানব জন্ম বৃথা হয়ে যাবে! বেঁচে থাকার আর কোনো মানে থাকবে না!
পুরাতন বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের আগমন খুবই স্বাভাবিক এবং অনিবার্য একটি ঘটনা। মহাকালের নিয়মে নববর্ষ আসবেই। পৃথিবীর তাবৎ সুন্দরী যদি নিবিড় আলিঙ্গনে পুরনো বছরকে ধরে রাখতে চায়, তবু তারা সফল হবে না। আবার দুনিয়ার সব মারণাস্ত্র তাক করলেও নতুন বছরের আগমনকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। নতুন বছর অনেকটা ধর্ষক-লম্পটদের মতো নাছোড়বান্দা। আইনকানুন, নীতি, গণতন্ত্র, সংবিধানের দোহাই দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী সে চলে। সেদিক থেকে বিচার করলে নতুন বছরের আগমন আর পুরনো বছরের চলে যাওয়ার মধ্যে তেমন কোনো নতুনত্ব নেই। তাৎপর্যও বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। যারা এ বছর ‘ভর্তা’ হয়েছে, আসছে বছর তারা বড়জোর ‘ভাজি’ হবে। এর চেয়ে বেশি কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না।
তারপরও কিন্তু পুরনো বছরের শেষে একশ্রেণির মানুষ অকারণেই হিসেব মেলানোর চেষ্টা করেন। কী পেলাম আর কী পেলাম নাÑএ নিয়ে ফালতু সময় ব্যয় করেন। ঘোড়ার আÐা ছাড়া কোনো কিছু না পেলেও নতুন বছরে অনেকেই নতুন প্রত্যাশা নিয়ে শুরু করতে চান। গেলো বছর যে ষাঁড়টা সবাইকে দাবড়েছে, আসছে বছর সে যেন শান্ত-শিষ্ট-ভদ্র হরিণে পরিণত হয়Ñএমন প্রত্যাশাও করেন অনেকে।
নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ এলেই কিছু লোকের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। শীতকালীন চুলকানির চেয়েও প্রকটভাবে দেখা দেয় বর্ষবরণের হুজুগ। পান্তাভাত ইলিশ খেয়ে, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, শাড়ি পরে অকারণ শহরময় দাপাদাপি করাটা এখন শহুরে বাঙালি মধ্যবিত্তের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ‘একদিনের বাঙালি’ সাজার সেই হুজুগে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি আঁতেলরাও উৎসাহ জোগাচ্ছেন। এই আঁতেল শ্রেণির মধ্যে আবার নববর্ষ এলেই স্বপ্ন-প্রত্যাশার ঢেউ জাগে। তারা স্বপ্নের রঙে আগামীর ক্যানভাস রাঙিয়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বিগত দিনে ব্যর্থতা-হাহাকার-বঞ্চনার ক্ষতে আগামী দিনের স্বপ্ন-সুখের মলম লাগিয়ে শান্তি ও সান্ত¡না খুঁজে পেতে চান। যা জোটেনি, যা হারিয়ে গেছে, সেসব ফিরে পেতে আবার নতুন সংকল্পে বুক বাঁধার উপদেশ দেন। যদিও তা কোনো কাজে লাগে না। আর লাগবেই বা কেন? এ যুগে কে শোনে কার কথা? এ যুগে সবাই সবাইকে শিক্ষা দিতে চায়Ñউচিত শিক্ষা। শিক্ষা নেয়ার মতো যথেষ্ট সময় কার আছে? তবে ‘নিরাপত্তার কারণে’ বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান বিকাল ৫টার মধ্যে শেষ করা এবং মুখোশে মুখ ঢেকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ না নেয়ার ঘোষণা অনেককেই ক্ষুব্ধ করেছে। কোনো যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে পুলিশ তার কোনো প্রতিকার করতে পারে না। উল্টো কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে এমন একটি অনুষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করা হলো। এতে করে কী সমস্যার সমাধান হবে? এরপর কী বলা হবে, ঘরে বসে উৎসব করো!
এদিকে বৈশাখকে সামনে রেখে রাজধানীতে চলছে কেনাকাটার ধুম। সরকার গত দু’বছর ধরে বৈশাখী ভাতাও চালু করেছে উৎসবের গুরুত্ব বিবেচনায়। একদিকে উৎসব ভাতা চালু হবে অন্যদিকে উৎসবের আয়োজনকে শৃঙ্খলিত করা হবেÑএটা স্পষ্টতই স্ববিরোধিতা। উৎসব করার সব ব্যবস্থা থাকবে, আবার নিয়ন্ত্রণও থাকবেÑএটা কেমন কথা? এটা কী তবে হাত-পা বেঁধে ইচ্ছেমতো সাঁতার কাটার মতো অবস্থা নয়? অবশ্য আমাদের সব কিছুই এমন স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। যে উৎসবটাকে আমরা বলছি বাঙালির ‘প্রাণের উৎসব’, কোনো বিশেষ ধর্মের বাইরে সব মানুষের, সব জাতি-গোষ্ঠীর উৎসবÑসেটাকে ধর্ম আর নিরাপত্তার অজুহাতে ‘কর্তন’ বা ‘খÐিত’ করার একটা অপপ্রয়াস যেমন আমরা দেখছি, পাশাপাশি দেখছি বর্ষবরণের একটা যুক্তিহীন হুজুগ। আপাতত সেই হুজুগের জয় হোকÑআমরা সেটাই চাই। তাতে অন্তত ধর্মব্যবসায়ীদের গালে থাপ্পড় পড়বে। ছাই পড়বে লম্পটদের বাড়াভাতে, যারা নারীর চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এটাই হবে আমাদের জন্য সুদিন! আমাদের সুদিনের স্বপ্ন যেন কেবল হারিয়ে যায়। প্রত্যেক নতুন বছরে যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশার মিনার গড়ে তুলি, বছর শেষে দেখা যায় তা অনন্ত জিজ্ঞাসার চিহ্ন হয়ে আমাদের উপহাস করছে। নববর্ষ আসে নববর্ষ যায়, কিন্তু আমাদের জীবনে নেমে আসা অনিশ্চয়তার অন্ধকার যায় না। গত বছরের শুঁটকিকেই এ বছরের তাজা মাছ মনে করে আবার আমরা স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন পরের বছর আবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সেই পুরনো গল্পটি মনে পড়ছে। এক দাগী চোর মৃত্যুশয্যায় ছেলের হাত ধরে বলেছিলো, বাবা তুই এমন কাজ করবি যাতে করে মানুষ আমার অপকর্মের কথা ভুলে যায়। সবাই আমাকে ভালো বলে। ছেলে বড় হয়ে বাবার কলঙ্কের অপবাদ ঘুচিয়েছিলো। তবে উপায়টা ছিলো ভয়াবহ। বাবা চুরি করেই ক্ষান্ত ছিলো, কিন্তু ছেলে শুধু চুরিই করতো না, চুরির পর ওই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিতো। ছেলের এই ভয়ংকর ভ‚মিকায় মানুষজন আস্তে আস্তে বাবার অপকর্মের কথা ভুলে গেলো। সবাই তখন বলতে শুরু করলো, এর চাইতে ওর বাপই ভালো লোক ছিলো। আমাদের অভিজ্ঞতাও অনেকটা এ রকমই। এক বছরের ভয়াবহতা দেখে বলেছি, এর চাইতে আগেই তো ভালো ছিলাম। তারপরও আমরা বাংলা নববর্ষে ‘এসো হে বৈশাখ’ বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করবো। সবাই মিলে আনন্দে মাতোয়ারা হবো। আমাদের বর্ষবরণের সম্মিলিত হুজুগে সব নিয়ন্ত্রণের শেকল, নিষেধাজ্ঞা, মৌলবাদীদের সব ফতোয়া ভেসে যাক, মুছে যাক।
লেখক : কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]