• প্রচ্ছদ » » বাঙালি জাতিসত্তা ও অভিন্ন পহেলা বৈশাখ


বাঙালি জাতিসত্তা ও অভিন্ন পহেলা বৈশাখ

আমাদের নতুন সময় : 14/04/2019

শেখ মিরাজুল ইসলাম

পৌরাণিক আমলে ক্রদ্ধ বিশ্বমিত্র তার অবাধ্য সন্তানদের অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা নিম্নতম বর্ণভুক্ত হয়ে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তসীমায় বসবাস করবে। প্রাচীন ধর্মসূত্রেও পুÐ্র ও বঙ্গদেশ ছিলো নিষিদ্ধ অঞ্চল। সেখানে পদার্পণ করলে বৌধায়ন প্রায়শ্চিত্তের বিধান দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য বঙ্গ অঞ্চল গুপ্ত সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবার পর বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাহ্মণ বসতি স্থাপন করেন। অভিশাপমুক্ত হয় বঙ্গভ‚মি। এরপর ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শশাঙ্ক, পাল আমল, সেন আমল, সুলতানী আমল পেরিয়ে ১৫৮৬ সালে মুঘল স¤্রাট আকবর কর্তৃক সমগ্র বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ, বিহার, আসাম, উড়িষ্যা, পশ্চিম বাংলা) দখল করার পূর্ব পর্যন্ত আক্ষরিক অর্থে ‘বাংলা’ নামের পৃথক প্রদেশের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-ভৌগোলিক সীমারেখা ছিলো না। আবার পরবর্তীতে বাংলা ভাষাভাষি না হওয়া সত্তে¡ও ইংরেজরা কোম্পানি আমলেই বিহার ও উড়িষ্যাকে যুক্ত রেখেই বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি গঠন করে। আবার ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন পূর্ব বাংলার ১৫টি জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাকে বিভক্ত করতে চাইলেন তখন যে তীব্র প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিলো তার মূলে ছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণা। এই আঞ্চলিক তার আলোকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণ ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যাবে, বহুমাত্রিক ধারার ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনে বৃত্তবন্দি হয়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলার আদি মানচিত্র বদলে গেলেও মূলগত সংস্কৃতির ভেতর পারস্পরিক গ্রহণ-বর্জনের আবহে যে মিশ্র সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছিলো তাই সময়ের ¯্রােতে বাঙালিত্বের মূল ঘরাণা হিসেবে টিকে আছে। যে কারণে পাকিস্তানে বৈশাখী উদযাপন রীতি আর বাংলাদেশের নববর্ষ পালনের উৎসব-উদ্দেশ্যে সমিল থাকলেও তার উদযাপন ও পালন রীতিতে ভিন্নতা অনস্বীকার্য। বাংলা নববর্ষের প্রেক্ষাপট শুধুমাত্র নিজস্ব আত্মপ্রতিকৃতিকে উপলব্ধি করবার ক্ষেত্রে প্রধান বাহন নয়, এই অঞ্চলের ধর্মীয় সম্প্রীতির ‘মিলনমেলা’ হিসেবেও উৎসবটির সার্বজনীনতা সকল ধর্মের মধ্যে অন্তর্গত সমন্বয় পালন করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে আসছে। ইতিহাসের পাঠ থেকে সে ব্যাপারে সম্যক ধারণা পেতে পারি।
পাল যুগে এই অঞ্চলে ছিলো বৌদ্ধ ধর্মের প্রাধান্য। পরবর্তীতে সেন যুগে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলো। ত্রয়োদশ শতাব্দী নাগাদ তুর্কীরা বাংলা বিজয় করে দুই ধর্মের প্রতিষ্ঠাকে সংকুচিত করে ইসলাম ধর্মের প্রাধান্য সূচিত করলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়। তবে বাংলায় তারও আগে সুফীদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার শুরু হয়েছিলো তার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘সেক শুভোদয়া’ নামের বাংলা-সংস্কৃত মিশ্র ভাষার এক গ্রন্থে জানা যায়, লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে শেখ জালালুদ্দীন নামের এক মুসলিম আউলিয়া নদীয়ার রাজ্য সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তুর্কীরা বখতিয়ার খিলজী’ সূত্রে গৌড় দখল করলো, আর সমুদ্র পথে সুফিরা বাংলায় প্রবেশ করলেন। ধীরে দক্ষিণ পূর্ববঙ্গে এক বৃহৎ মুসলমান অধ্যুষিত সমাজ গড়ে উঠলো। বহিরাগত মুসলমানরা গৌড়ে রাজকাজ চালাতেন ফার্সি ভাষায়, আবার নিম্নবর্গের অগণিত ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মাতৃভাষা ছিলো বাংলা। মুসলিম শাসন ব্যবস্থার মধ্যেই শক্তিশালী হয়ে উঠে বাংলা ভাষার পরিধি। তার অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন হচ্ছে পনেরো শতকের ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’, মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’, বিপ্রদাস রচিত ‘মনসা-বিজয়’ ইত্যাদি। এর পূর্বে লক্ষণ সেনের আমলে কবি জয়দেব রচনা করেছিলেন শ্রেষ্ঠ সংস্কৃত কাব্য ‘গীতগোবিন্দ’। এভাবে সুলতানী আমলেই গড়ে উঠে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ধর্মের এক মেল বন্ধন। সেই সঙ্গে এক ভিন্ন বাঙালি-ভাষী মুসলমান সমাজের গোড়া পত্তন ঘটে। ফলশ্রæতিতে আমরা পাই শাহ মুহম্মদ সগীরের মতো সুফী কবিকে। আরো পাই দৌলত কাজী, আলাওল, সৈয়দ সুলতানের মতো বিশিষ্ট সাধক কবিদের, যাদের মাতৃভাষা ছিলো বাংলা। সেই আমল হতেই বৈষ্ণব পদাবলী নিয়ে নব্য মুসলমান ও হিন্দু কবি একযোগে পদাবলী-সাহিত্য রচনা করেছেন। স্বাধীন সুলতানদের আমল থেকে এভাবে বাঙালি জাতিসত্তায় এমন শুভযোগ সম্পন্ন হবার যে ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিলো পহেলা বৈশাখের মতো নববর্ষ সেই অভিন্ন বাঙালিত্ব আত্মপরিচয়ের একটি উৎসব-সূত্র। তাই বাঙালির নববর্ষ উৎসব কেবলমাত্র একটি বর্ষপঞ্জিকা নির্ভর উৎসব মাত্র নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে আবহমান বাংলার সংস্কৃতির উৎসজাত হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ ধর্মের ‘সংঘাত ও সমন্বয়ে’র ছাঁচে গড়া বাঙালিত্বের ভিত্তিভ‚মির সুপ্রাচীন ইতিহাস। তবে বর্তমানে একে ঘিরে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত নাগরিক সম্প্রদায়ের উদযাপনের রীতিকে দেখে যারা বৈদিক বনাম শরিয়তী পন্থার আলোকে যারা কুতর্কে মাতেন তারা আদতে গুলিয়ে ফেলেন বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়কে। অথবা নিজস্ব লোকসাহিত্য-ভাষাতত্ত¡-নৃ-ত্তত্ব-জাতিতত্তে¡র ইতিহাসের উৎসবরূপী আয়োজনকে তারা অভিযোজন ও আত্তীকরণের নব ধারায় দেখতে অভ্যস্ত হননি আজও। কারণ বাঙালির বাউল গানে ‘দেহভাÐে আছে ব্রহ্মাÐ’ কথাটি এখন বৈশ্বায়নের আগ্রাসনে ভিন্নরূপ নিলেও বাঙালিত্বের প্রধান বিজ্ঞাপন হিসেবে ‘পহেলা বৈশাখ’ উৎসব টিকে থাকবে সব সময়।
লেখক : চিকিৎসক ও লেখক




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]