সামনের দিনগুলোতে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের জন্য কী অপেক্ষা করছে!

আমাদের নতুন সময় : 14/04/2019

দেবদুলাল মুন্না: জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ পুলিশের কাছে গ্রেফতার হওয়ার পর এখন একটাই প্রশ্ন তার জন্য সামনে কী অপেক্ষা করছে? অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার হওয়ার পর ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো টুইটারে লিখেছেন, ইকুয়েডর সরকার অ্যাসাঞ্জের আশ্রয় প্রত্যাহার করেছে, কারণ অ্যাসাঞ্জ বারবার আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও কূটনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে দূতাবাস ভবনে বসবাসের ‘ডেইলি–লাইফ প্রটোকল’ লঙ্ঘন করেছেন। ‘আইএনএ পেপার্স’ নামে প্রকাশিত ওই নথিতে মোরেনো ও তার পরিবারের ব্যক্তিগত ছবিও ফাঁস করে উইকিলিকস। সেই তথ্য সামনে আসার পর মোরেনো প্রশ্ন তুলেছিলেন, তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ও ছবি হ্যাক করার অধিকার কে দিয়েছে অ্যাসাঞ্জকে? নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাসাঞ্জকে ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ঋণ মওকুফের আবেদন জানিয়েছেন এরিমধ্যে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো।তাহলে কী অ্যাসাঞ্জের শক্রু ইকুয়েডর সরকার? কিন্তু উইকিলিকস কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ইকুয়েডরে একটা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকারী এক চীনা কোম্পানির কাছ থেকে প্রেসিডেন্ট মোরেনোর পরিবারের সদস্যরা ঘুষ নিয়েছেন।প্রেসিডেন্ট মোরেনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ঋণ বা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য অ্যাসাঞ্জকে তাদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছেন। ব্রিটিশ কুটনৈতিক সাংবাদিক রিচার্ড হ্যাসলে ‘দ্য থট’ ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘ ইকুয়েডরের ‘আইএনএ পেপার্স’এর তথ্যাদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হ্যাকাররা হ্যাকের মাধ্যমে প্রচার করে ইকুয়েডরের সঙ্গে সম্পর্ক অ্যাসাঞ্জের সম্পর্ক নষ্ট করার পরিকল্পনার অংশ মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অ্যাসাঞ্জকে জীবন্তই চেয়েছে। কারণ তার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের বিরোধী শিবিরের তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য অ্যাসাঞ্জকে ব্যবহার করবে।’ রিচার্ড হ্যাসলের এ মন্তব্য যদি সঠিক হয় তবে অ্যাসাঞ্জকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবা গুটির মতো ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটিশ পুলিশ অ্যাসাঞ্জকে গ্রেফতার করার পেছনে যুক্তি দেখিয়েছে, জামিন লঙ্ঘনের অপরাধে। গ্রেপ্তারের দিনেই অ্যাসাঞ্জ আদালতে হাজির হতে ব্যর্থতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং তাঁকে যুক্তরাজ্যের কারাগারে ১ বছর পর্যন্ত থাকতে হতে পারে। একই দিনে বৃটেনের পুলিশ অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধের (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পরিপ্রেক্ষিতে। এই পদক্ষেপটির ফলে অ্যাসাঞ্জের সামনে এখন যুক্তরাজ্যে তাঁর জামিন লঙ্ঘনের অপরাধ দৃশ্যত গৌণ হয়ে পড়েছে, মুখ্য হয়ে উঠেছে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাঠগড়ায় কবে দাড়াবেন সেটি।জটিলতার এখানেই শেষ নয়। জটিলতা রয়েছে ইকুয়েডর সরকার ও যুক্তরাজ্য সরকারের সম্পর্কেও। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তি সংক্রান্ত আইনে অ্যাসাঞ্জের বিচার করা হলে তাঁর মৃত্যুদ- হতে পারে। কিন্তু ইকুয়েডর সরকার ২০১২ সালে অ্যাসাঞ্জের কূটনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিল এই যুক্তি দেখিয়ে যে এমন এক ব্যক্তি তাদের দেশে আশ্রয় চেয়েছেন, যাঁর সামনে পলিটিক্যাল পারসিকিউশন ও মৃত্যদ-ের ঝুঁকি রয়েছে। ইকুয়েডর তার ভ’খ-ে বা কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয়প্রার্থী এমন ব্যক্তির অনুরোধ ফিরিয়ে দেয় না, যার ওই ধরনের পরিণতির ঝুঁকি আছে। মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে, এমন কোনো দেশে ইকুয়েডর কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণও করে না। উপরন্তু ২০১৭ সালে ইকুয়েডর সরকার অ্যাসাঞ্জকে সে দেশের নাগরিকত্ব দিয়েছিল। অর্থাৎ এখন অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যার্পণ করা হলে ইকুয়েডর সরকারের নিজের বিধান নিজেরই ভঙ্গ করা হবে। ফলে ব্রিটেনও অ্যাসাঞ্জকে আইনত যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যার্পণ করতে পারে না একই কারণে। যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি ও নাগরিক সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিরোধিতা করে নিন্দা জানাচ্ছে এরমিধ্যে। লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন টুইটারে লিখেছেন, ‘যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত ইরাক ও আফগান্তিানে নৃশংসতার প্রমাণ উন্মোচন করার দায়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যার্পণ বিরোধিতা করা উচিত।’ নিউইয়র্কভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) অ্যাসাঞ্জের গ্রেপ্তারের দিনেই নিজেদের ওয়েবসাইটে লিখেছে,তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারের উদ্যোগের ব্যাপারে সিপিজে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। কারণ, সিপিজে জানতে পেরেছে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে যুক্তরাজ্য পুলিশ অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার করেছে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিষয়ে একটা সমঝোতার অংশ হিসেবে। সিপিজের ডেপুটি ডিরেক্টর রবার্ট ম্যাহোনি মনে করেন, চেলসি ম্যানিংয়ের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের বিচার করা হলে সেটার পরিণতি হবে সাংবাদিকতা চর্চার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার অন এক্সট্রা জুডিশিয়াল এক্সিকিউশন্স অ্যাগনেস ক্যালামার্ড অ্যাসাঞ্জের কূটনৈতিক আশ্রয় বাতিলের জন্য ইকুয়েডর সরকারের সমালোচনা করে টুইটারে লিখেছেন, ‘ইকুয়েডর তার দূতাবাস থেকে অ্যাসাঞ্জকে বহিষ্কার করার মাধ্যমে যুক্তরাজ্যকে তাঁকে গ্রেপ্তার করার সুযোগ দিল, তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যার্পণের ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। এভাবে তাঁকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিল।’ ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাঠগড়ায় অ্যাসাঞ্জকে তোলে দেওয়া হবে কি না এ নিয়ে যে তর্ক বিতর্ক শুরু হয়েছে এতে মনে হচ্ছে যে কোনো দিকের পাল্লাই ভারী হতে পারে। জার্মানির দ্য ফিগ্যাল গত শুক্রবার জানিয়েছে, সুইডেনে যে দুই নারী অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন, তাঁরাও চান না অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হোক। তাঁদের একজন বলেছেন, অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হলে তিনি ভীষণ বিস্মিত হবেন এবং দুঃখ পাবেন। তারা দুজনেই চান অ্যাসাঞ্জের বিচার শুরু হোক সুইডেনের আদালত থেকেই। তবে যুক্তরাজ্য অ্যাসাঞ্জকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাবে এবং সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ আনা হবে বলে হবে মনে করেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সুইস আইনজীবি হেনস সান্ড্রি।তিনি রেডিও ‘স্ল্যাশফ্ল্যাশ’কে গতকাল বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত হয়তো এসপিওনেজ অ্যাক্টের অধীনেই অ্যাসাঞ্জের বিচার করা হবে, সে আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে। সম্পাদনা : ইকবাল খান




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]