অর্থ : জিডিপি কথা ও দরিদ্র পৃথিবী!

আমাদের নতুন সময় : 17/04/2019

কাকলী সাহা : কোনো দেশের উন্নতি অবশ্যই নির্ভর করে তার উচ্চমাত্রায় বিনিয়োগের ওপর। সনাতনী মালিকানা-ব্যবস্থায় দৃষ্টিপাত করলে মানতেই হয়, ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিনিয়োগের সুযোগ অনেকাংশেই প্রসারিত। কিন্তু বিশ্বের বাজারে চোখ ঘুরিয়ে এক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটাই দেখা যায়। কিন্তু ে কন এই উলটপুরাণ, একটু ভেবে দেখা যাক। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উচ্চমাত্রায় বিনিয়োগের ফলে আশানুরূপ উচ্চ লাভ সম্ভব হয়ে থাকে; কিন্তু মুশকিল হলো এই উচ্চলাভের বেশিরভাগ অংশ ব্যয় হয়ে যায় উপভোগে। কারণ লাভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধনিক শ্রেণির বিলাসব্যসনের বেড়ে যায়। আর শিল্পপতিদের উপভোগের মাত্রা বাড়লে সেই সাথে শ্রমিক শ্রেণির পারিশ্রমিকও বাড়িয়ে দিতে হয়। তার ফলে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটলে যে লাভ হয়, তার লভ্যাংশ প্রথমে মালিকশ্রেণির পুষ্টি ঘটায়; তারপর তার শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে ছিটেফোঁটা লাভের গুড় ছড়িয়ে দেয়। ফলে পরবর্তী বিনিয়োগে ততোখানি উৎসাহিত হতে দেখা যায় না। বরং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত বৃদ্ধি অনেক গুণ সহজতর। অবশ্য এটা মানতেই হবে, শুরুতেই এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ততো বেশি হতে পারে না।
জীবনযাত্রার মান যথেষ্ট সঙ্কুচিত করে এনে সম্পূর্ণ উদ্বৃত্ত বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করলে তাতে হয়তো কিছু কিছু নতুন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হবে কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলানো কিছুতেই সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে দ্রুত আর্থিক উন্নতি চাইলে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে অর্থাৎ সেক্ষেত্রে জাতীয় উদ্বৃত্ত বাড়াতে হবে। আবার আর্থিক উন্নতির বেশিরভাগ অংশ বিনিয়োগে শামিল করলেও একটা অংশ অবশ্যই উপভোগে ব্যয় করতে হবে নতুবা জনসাধারণের মধ্যে একটা অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এভাবেই বিনিয়োগের মাত্রা ক্রমশ বাড়িয়ে তুলে আর্থিক প্রগতির হার তীব্রতর করে তোলা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হামেশাই হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ার সাথে সাথে লাভের মাত্রা বেড়ায় যায় এবং যেহেতু লাভের সম্পূর্ণটাই রাষ্ট্রের হাতে তাই তার বেশিটাই পুনরায় বিনিয়োগ করতে কোনো বাধা থাকে না।
অবশ্য এখানে কিছু প্রশ্ন অবশ্যই সামনে এসে পড়ে, যদি দ্রুত আর্থিক প্রগতির জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার উৎকর্ষই একমাত্র পথ হয়, তবে তা গ্রহণ করতে দরিদ্র দেশগুলোর এতো অনীহা কেন? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই দেশগুলি তাদের অর্থনৈতিক দৈন্য স্বীকার করতে লজ্জাবোধ করে, আর সে-কারণেই তাদের দেয়া পরিসংখ্যান ততোটা বিশ্বাসযোগ্য হতে সক্ষম হয় না। অবশ্য আর্থিক বৃদ্ধির হার খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। এই হিসেবে পৃথিবীর সব দেশকেই অনুন্নত বলা চলে, কারণ প্রচেষ্টা চালিয়ে তাদের অধিক আর্থিক বৃদ্ধি সম্ভব। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে ঠিকই কিন্তু সেই বৃদ্ধির পরিমাণ তাদের সম্ভাব্যতম হারের তুলনায় অনেকটাই কম। অবশ্য বিশ্বের উন্নত দেশগুলির বিনিয়োগের হার জাতীয় আয়ের শতকরা বারো থেকে পনেরোর মধ্যে থাকলেই চলে যায়। সেক্ষেত্রে অনুন্নত দেশগুলোতে বিনিয়োগের হার জাতীয় আয়ের শতকরা পাঁচ থেকে দশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই এ বিষয়ে তাদের অনেক বেশি সতর্ক হওয়া জরুরি। সেক্ষেত্রে সেই সব দেশ যদি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভরসা রাখতে চায় সেক্ষেত্রে তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ তাদের লাভের অধিকাংশ ব্যয়িত হবে শিল্পপতিদের উপভোগের অঙ্ক বাড়াতে এবং পুঁজিবাদী-ব্যবস্থায় পুঁজিপতিরা ব্যক্তিগত পুঁজি বাড়াবার দিকে উৎসাহিত হবেন। আর এই শ্রেণির উপভোগের আয়োজন করতে অত্যধিক চাপে জনসাধারণের কৃচ্ছ্রসাধন করতে করতে দীন থেকে আরো দীনতর পরিস্থিতি তৈরি হবে। যেহেতু এই সংখ্যাটা মোটেই নগণ্য নয়, তাই পরিসংখ্যানগত শ্রীবৃদ্ধি ঘটলেও আসলে দেশে বিনিয়োগ বা উন্নতিতে তা মোটেই সহায়ক হবে না। কারণ শিল্পপতিদের প্রধান লক্ষ্য হলো মুনাফা। তাদের মতে যেখানে লাভ নেই, সেখানে বিনিয়োগ অর্থহীন। কিন্তু মার্কসবাদে হিসেব করে দেখানো আছে, ক্রমাগত বিনিয়োগের ফলে পুঁজি যতোটা বৃদ্ধি পায়, জাতীয় আয় সেই হারে বাড়ে না। অতএব লাভের হার কমতে থাকে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]