জঙ্গিদের লঙ্কাকা- : আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে

আমাদের নতুন সময় : 27/04/2019

 

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
গত ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও আবাসিক হোটেলে যেসব আত্মঘাতী জঙ্গি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রার্থনারত মানুষ এবং হোটেলে অবস্থানরত দেশি-বিদেশিদের প্রাণনাশের ঘটনা ঘটিয়েছিলো তাদের মানসিক বিকৃতি নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। জঙ্গিরা নিজেদের আত্মঘাতী বোমায় উড়িয়ে দিয়েছে- এটি তাদের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু নিজেদেরকে হত্যা করতে গিয়ে যেসব মানুষকে তারা হত্যা করেছে তাদের অপরাধ কি? একজন মানুষ হিসেবে তো এই প্রশ্নগুলো যেকোন মানুষেরই মধ্যে কাজ করা উচিত। যে মানুষ এমন সহজ সরল বৈশিষ্ট্যগুলো হারিয়ে ফেলে সে কখনোই সাধারণ মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে না। ধার্মিক হিসেবে তো নয়ই। কোনো ধর্মই নিরাপরাধ মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে না, অনুমোদনও দেয় না, ইসলামও দেয়নি। তারপরেও কিছু তরুণ নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে যখন এমন জঘন্য হত্যাকা- ঘটাতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের মতো পথ বেঁচে নেয় সেই তরুণকে মুসলমান নামে দেখার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
শ্রীলঙ্কা এমন একটি দেশ যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠী অনেকটাই স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করছে। শ্রীলঙ্কায় তাদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের তেমন কোন অভিযোগ নেই। বৈরি কোনো আচরণও নেই। সেখানে কিছু সংখ্যক তরুণ গির্জায় প্রার্থনারত মানুষকে হত্যার জন্য যে পথটি বেছে নিয়েছিল তা ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসে যদি সামান্যতম চির ধরাতে পারে তাহলে সেটার জন্য দায়ী ওইসব জঙ্গিরাই। এমন বাস্তব বোধ যদি বেশিরভাগ মানুষ পোষণ করেন তাহলে ভালো। কিন্তু সব মানুষতো সবকিছু যুক্তি দিয়ে সমানভাবে বুঝতে পারে না। তৈরি হয় তাদের মধ্যে নানা ধরনের আবেগ যোক্তিক অযোক্তিক, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, ঘৃণাবোধ। শ্রীলঙ্কার এই হত্যাকা- সারা পৃথিবীতেই একটি আতঙ্ক নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে যা শুধু শ্রীলঙ্কার বিষয় হয়ে থাকলো না। এই হত্যকা-ে আড়াইশ-এর বেশি নিরীহ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৫শ এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন অনেক মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে কেমন বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে এখন বসবাস করছেন সেটি আমরা প্রতিদিনই মিডিয়ার মাধ্যমেই দেখতে পাচ্ছি। শ্রীলঙ্কায় এই মুহূর্তে এমন লঙ্কাকা- ঘটবে সেটি শ্রীলঙ্কার কোনো মহলেই ভাবতে পারেনি। যদিও শ্রীলঙ্কায় সরকারের মধ্যে একধরনের শৈতিল্য বিরাজ করছিলো, প্রশাসনের মধ্যেও নানা দুর্বলতা বিরাজ করছিলো। সেই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়েছে জঙ্গিরা। জানা গেছে এসব জঙ্গি দেশে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী সংগঠনের দীক্ষা তারা নিয়েছে। কিন্তু ইসলামের শাশ্বত শান্তির শিক্ষা তাদের মনকে গড়ে তুলতে পারেনি। সেকারণেই তারা মানুষ হত্যার নামে এমন পৈশাচিক পথে নিজেদেরকেও তারা শেষ করে দিয়েছে- যেটি হয়তো তাদের কাছে একধরনের উৎসর্গকৃত মনে হতে পারে, কিন্তু তারা ইসলাম এবং মানবতার জন্যে কতটা ক্ষতির কারণ হয়েছিলো সেটি তারা একবারও বুঝতে চায়নি।
বলা হয়েছে এটি সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্ট চার্জ নগরীর মসজিদের হত্যাকা-ের প্রতিশোধ! সেই হত্যাকা- শুধু নিউজিল্যান্ডের সরকার ও মানুষই ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেনি সারাবিশ্বের মানুষ হত্যাকারীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে দাবি করেছে। সে এখন বিচারের কাঠগড়াতেই আছে। নিউজিল্যান্ডের মসজিদের হত্যাকান্ডের জন্য দুঃখপ্রকাশ। সেইদেশের সরকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মুসলমানদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এমন অবস্থানের পর বিশ্বের মুসলমানরা সহজেই হত্যাকা-ের ক্ষত ভুলতে শুরু করেছে। কেউই প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভাবেনি। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় জঙ্গিগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী মদদে যে লঙ্কাকা-টি শ্রীলঙ্কায় ঘটিয়েছে সেটি সব অর্থেই মানবতাবিরোধী, ধর্মবিরোধী, ইসলামবিরোধীও। কিন্তু যারা একবার জঙ্গিপনায় আত্মসমর্পন করেছে তারা কোনোভাবেই নিজেদের বিবেক, বুদ্ধি, ধর্মশিক্ষা মানবতাবাদের শিক্ষা- কাজে লাগাচ্ছে না। তারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রার্থনারত মানুষকে হত্যা করতে এমন আত্মবিধ্বংশী সিদ্ধান্ত নেয়। যেখানে বেশকিছু নিরীহ শিশু ছিলো। একইভাবে হোটেলে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও আত্মঘাতী হামলার শিকার হলো। আমাদের বাংলাদেশের আট বছরের কিশোর জায়ান চৌধুরী নিহত হলো। অথচ এই মানুষগুলো গিয়েছিল ছুটিতে শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে। তাদের কাউকে কাউকে দেশে ফিরতে হলো লাশ হয়ে, আবার অনেকেই চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে গেলেন।
একদিনে কয়েকটি বিস্ফোরণে শ্রীলঙ্কায় শুধু কয়েকজন মানুষই মারা যাননি বা আহত হননি। গোটা শ্রীলঙ্কা এখন শোকে স্তব্ধ, জনজীবন পর্যুদস্ত। কেউ জানে কবে সেখানে আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে। সুতরাং জঙ্গি হামলার প্রতি যারা ততোটা সচেতন নন তারা বুঝতে পারবেন না যখন নিজের দেশেই নিজের শহরে কিংবা নিজের পরিবারের উপর এমন বিপর্যয় নেমে আসবে তখন সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। থাকবে না এখনকার যে কর্মচাঞ্চল্য, জীবনজীবিকা নিয়ে ব্যস্ততা, পরিবার পরিজন নিয়ে স্বপ্ন দেখা, ধর্মকর্ম নিয়ে সুখে-শান্তিতে থাকা ইত্যাদি। এসবই মুহুর্তের মধ্যে কতটা লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে সেটি শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে অনুমান করা সম্ভব হতে পারে। তেমন অনুমান থেকে আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। কেননা এখানেও জঙ্গিবাদের দীক্ষা নিয়ে একসময় বেশকিছু আলালের ঘরের দুলাল মানুষ হত্যায় মেতে উঠেছিল, হলিআর্টিজান, শোলাকীয়ায় ঈদের জামাতে আক্রমণ ইত্যাদি ঘটনায় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি আমাদেরই কিছু সংখ্যক উঠতি তরুণ কিভাবে মানুষ হত্যায় মেতে উঠেছিলো। ওদের কিছু অনুসারী এখনও আমাদের সমাজের ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে এ ধরনের জঙ্গিপনার বিকৃত মানসিকতা স্থান করে নিয়েছে। এরা বিবেক ও মানবতার শিক্ষায় নিজেদেরকে পরিচালিত করার কথা ভাবে না। সুতরাং তারা যেকোন সময় যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। যদিও আমাদের দেশে জঙ্গিদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, সমাজেও সচেতনতা আগের চাইতে বাড়ছে, তারপরও অনেকের মধ্যেই আন্তর্জাতিক নানা ঘটনা দুর্ঘনায় যেসব প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে সেটি অনেক সময়ই যথার্থ বলে মনে হয় না। সামাজিক গণমাধ্যমে তেমন কিছু লক্ষণ মাঝে মধ্যে দেখা যায়। সেকারণেই সতর্কতা আমাদের চারপাশে রাখতেই হবে। আমাদের উঠতি তরুণদের সঠিকপথে পরিচালিত করার জ্ঞান ও চর্চা অব্যাহত রাখতেই হবে। তাহলেই আমরা যেমন নিরাপদ থাকবো, সারাবিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তিও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]