আমরা কি গরুর জাতি হতে চলেছি?

আমাদের নতুন সময় : 08/05/2019

ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম

আমরা কি গরুর জাতি হতে চলেছি না ইতোমধ্যে তা হয়ে গেছি তা একবার ভেবে দেখতে হবে। এশিয়ায় কয়েক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তার মধ্যে সেরা হিসেবে ৪৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকা হয়েছে, যাতে নেপাল-ভুটানের মতো দেশের অবস্থান থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই। ভারতের আছে অর্ধশতাধিক, আর পাকিস্তান? অবাক করার মতো সংখ্যা বটে, তারও ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় এ সেরার তালিকায় আছে। ‘উন্নয়নের রোল মডেলে’  বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও এ তালিকায় নেই। অন্য দেশ নিয়ে কথা বলতে চাই না। প্রতিবেশী ভারতে ধর্মভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসলেও যথাযথ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তারা ক্ষমতায় আসে। সেখানে সেক্যুলার লোকজনও বিজেপিকে ভোট দেয়। দেয় এজন্য যে, ভারতের বৃহত্তর মধ্যবিত্ত সেক্যুলার শক্তিকে উপেক্ষা করে বিজেপি কখনো প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে যেতে পারবে না, যতোই তারা রামরাজত্বের কথা বলুক। বাস্তবে দেখাও গেছে তাই, বিজেপির হাত দিয়ে এমন প্রগতিশীল আইন পাস হয়েছে, যা আমাদের সেক্যুলার বাংলাদেশে দেশে পাস করা অসম্ভব। তারা নারীর অধিকার আইন পাস করেছে। সমকামিতার পক্ষেও আইন করে বসে আছে, যা বৈদিক ধর্ম মোটেও সমর্থন করে না। আর কেন ভারতের সেক্যুলার হিন্দুর এক উল্লেখযোগ্য অংশ বিজেপিকে ভোট দেয়, সম্প্রতি ভারত ভ্রমণে অনেকের সঙ্গে আলোচনায় আমার এই ধারণা হয়েছে যে, এটা তারা করছে ইসলামভীতি থেকে। ভারতের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত লোকগুলোর মধ্যে ভেতরে ভেতরে এক কঠিন ইসলামভীতি কাজ করছে। এর কারণ মুসলমানের বেপরোয়া আচরণ। একের পর এক জঙ্গি হামলায় তারা ভীত। এর সঙ্গে আরও ভয়, ইসলামী আলেমদের ওয়াজ-নসিহত। এরা জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য উসকানি দেয়। একজন একটি সচিত্র প্রতিবেদন দেখিয়ে বললেন, বলুন দাদা, আমরা ভয় না পেয়ে যাবো কোথায়? তাতে দেখা গেলো এক জবরদস্ত ইসলামী চেহারার মাওলানা হুঙ্কার দিয়ে ঘোষণা করছেন, আমাদের প্রত্যেকের নবীর সুন্নত অনুযায়ী চারটি বিবাহ করা উচিত এবং প্রত্যেক বিবির ১০ করে মোট ৪০টি সন্তান জন্মনো উচিত। এতে আমরা ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারবো। তিনি বললেন, মুসলমানদের ভয় করি এজন্য যে, ধর্মের নামে তারা না করতে পারে এমন কোনো অপকর্ম নেই। হিন্দু মৌলবাদীরা অতোটা করার সাহস রাখে না। ভদ্রলোক নিজে নাস্তিক, কখনো মন্দিরে যান না। বলেন, হিন্দু তো কোনো ধর্ম নয়, এর কোনো কেন্দ্রীয় দেবতা নেই। রাজস্থানে এক দেবতা তো, মহারাষ্ট্রে আরেক। আবার একই স্থানে পাশাপাশি অনেক দেবতা। কালেভদ্রে হিন্দুরা জাগ-যজ্ঞ করে, পূজা করতে গেলে মন্দিরে যায়। কিন্তু মুসলমান যেখানে আজান, সেখানে নামাজ। ওয়াক্ত হতে মসজিদ বা ঘর-বাড়িরও দরকার নেই, পাতার উপর, ঘাসের উপর, রাস্তার পাশে, এয়ারপোর্টে, ক্ষেতের আলে নামাজ পড়া শুরু করে। এমনই ধর্মান্ধ এরা। ধর্মের ক্ষেত্রে এদের এতোটা ঐক্য যে, যেকোনো সময় যে কেউ জঙ্গি হতে পারে। শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক আত্মঘাতী মুসলিম হামলাকে নিয়ে ভারতের কেউ কেউ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, তা ভারতের হিন্দুদেরই মনের কথা। এতোটা সংখ্যালগিষ্ঠ হয়েও যারা সংখ্যাগুরুর দেশে এমন হামলা করতে পারে, তারা কতোটা অপরিণামদর্শী? তাদের পক্ষে কিনা সম্ভব? ভারতে মুসলমানের সংখ্যা বিশ কোটির অধিক, এদেরকে সুযোগ দিলে, এরা ভারতের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তারা মনে করে সেক্যুলার-আবহাওয়ায় মুসলমানদের বাড়-বাড়ন্ত হবে। এর চেয়ে বিজেপি ভালো হবে। তারা মুসলমানদের চাপে রাখবে, বাড়তে দিবে না। চলমান ইলেকশনে যদি বিজেপি জেতে, তো কারণেই জেতবে। ইচ্ছা করেই ব্যাপক প্রসাঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। শুরু করেছিলাম বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিয়ে। এক্ষেত্রে ধর্মান্ধ-মিলিটারি ধর্ষিত গণতন্ত্রের পাকিস্তানের চেয়েও আমাদের অবস্থা অন্তত নয় গুণ খারাপ। তাদের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় সেরার তালিকায় আছে, আমাদের একটিও নেই। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কেন, এদেশের সমগ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলে গেছে বর্বর ম্যানেজমেন্টর হাতে। রাজধানীর এক নামকরা স্কুলের এক শিক্ষক সেদিন দুঃখ করে বলছিলেন, আমারা এমন এক সভাপতি পেয়েছি, তিনি যে কি বলেন আর কি ভাষণ দেন, শুনতে লজ্জা লাগে। তবে রাজাকার চরিত্রের যেসব শিক্ষক আছেন, তারা উনাকে খুব তাল দেন। তাদের সঙ্গে উনার সম্পর্কও মধুর। আমরা যারা কিছু লেখাপড়ার চর্চা করি, বঙ্গবন্ধুকে বুকে লালন করি, তারা বরং কর্নারাইজড। বললাম সভাপতি সাহেবের পরিচয় কি? একটু হেসে বললেন, শ্রমিক লীগ নেতা। এই শ্রমিক লীগ নেতা, ছাত্রলীগ নেতা, আর আওয়ামী লীগ নেতারা এখন সব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার (মানে সব প্রতিষ্ঠানকে কান ধরে উঠবস করাচ্ছেন)। ফেনীর যে মাদ্রাসাটির সুপার সিরাজদৌলা সম্প্রতি ধর্ষণান্তে নুসরাত জাহান নামক আলিম পরীক্ষার্থী ছাত্রীটিকে নিজ ক্যাডার বাহিনী দিয়ে পুড়িয়ে মারলেন, সে মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের শক্তিশালী লোকজনও আওয়ামী লীগ নেতা। আর ইতোপূর্বে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সিরাজদৌলার শক্তির উৎস ছিলো তারাই। এভাবেই চলছে। বিএনপি আসলে জিয়ার চশমা, আওয়ামী লীগ এলে বঙ্গবন্ধুর তকমা। এ দিয়েই নির্ধারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির চেয়ার থেকে, শহর-গ্রামের স্কুল-মাদ্রাসার পরিচলনা কমিটি। দেশে প্রকৃত শিক্ষানুরাগী লোক, রিটায়ার্ড শিক্ষক, চাকুরে বা অন্যান্য পেশার যোগ্য মানুষগুলো যেন মরে হয়েছে!

অতীতকে ভুলতে পারি না। ২০১৩ সালের একটি কালো দিনও তার সঙ্গে হৃদয়ে হানা দেয়। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পবিত্র মুখ চাঁদের মধ্যে দেখা গেছে, অতএব এতো বড় কামেলকে কেন জেলখানায় আটকায় রাখা, তার প্রতিবাদে রাতের আঁধারেই শত শত মুসলমান সরকারি গাড়ি, পুলিশ ফাঁড়ি, অফিস-আদালতে হামলা চালাতে, আগুন জ্বালাতে থাকে। পরের দিন কর্তব্যরত পুলিশসহ প্রায় দু’শো মানুষকে হত্যা করে এই বর্বর ধর্মান্ধের দল। ভেবেছিলাম বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে, সেক্যুলার সংস্কৃতির চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষাঙ্গনে প্রকৃত শিক্ষিত ও সৎ লোকের নের্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ একবিংশ শতাব্দীর প্রগতির রেসে এগিয়ে যাবে, দেশ থেকে তাড়াবে অশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকার।  কিন্তু বাস্তবে দেখছি তার উল্টো, প্রগতির জায়গায় অধঃগতি, অন্ধকারের জায়গায় আরো অন্ধকার। আওয়ামী লীগের যেসব নেতারা আজ একটি প্রাইমারি স্কুলেও নের্তৃত্ব দিচ্ছে, আমার জানামতে, তারা প্রায় সবাই সুবক্তা। প্রতিষ্ঠানের যেকোনো অনুষ্ঠানে মাইক হাতে পেলে পল্টনের মাঠ মনে করে তারা এমন ভাষণ শুরু করে যে, কোমলমতি ছেলে-মেয়ে তাদের জ্ঞান-গরিমায় হতভম্ব হয়ে যায়। আমাদের জিডিপির হিসাব, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব তাদের ঠোঁটস্থ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নতির জন্য জাতিসংঘের স্বীকৃতিসহ কতো শত পদক পেয়েছেন এবং তার শিক্ষা ও জ্ঞান-গরিমা বলে কতো শত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পেয়েছেন, তা তার নিজের স্মরণে না থাকলেও এসব নেতাকর্মীর মুখস্থ রয়েছে। আর এর সঙ্গে মাঝে মাঝে টংকার দিয়ে বলে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। আমাদের কোমলমতি ছাত্রদের সামনে এরাই আদর্শ, এরাই নেতা! জাতীয় প্রগতি আর শতকরা দু-পাঁচজনের অগাধ সুযোগ-সুবিধার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যে এক জিনিস নয়, সে বোধটুকু আজ নির্লজ্জ নের্তৃত্বের অন্তর থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। সমগ্র পৃথিবীর নয়, শুধুমাত্র এশিয়ার ৪৫০টি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের নামটি কেন স্থান পায়নি। দলীয় ভিসি, দলীয় শিক্ষক আর দলীয় ক্যাডারের লালসায় ওগুলো পচে উঠেছে। জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষা পীঠের পচনকে বলা যেতে পারে মগজে পচন। ওই মগজই দেশে নের্তৃত্ব দিবে। প্রাইমারি স্কুল থেকে দেশের সর্বোচ্চ চেয়ারে ওরাই একদিন পাছা রাখবে। প্রগতির সঙ্গে যে আলোকায়নের প্রশ্ন জড়িত তা কে এদের মনে করিয়ে দিবে? তবে আমাদের পরম হিতৌষী দেশ-নায়কেরা প্রগতির সংজ্ঞাটা যেভাবে বদলিয়ে দিয়েছেন তাতে আর কোনো অসুবিধা হবার নয় (!)। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির নামে বোগল বাজাবো। বলবো এই তো প্রগতি।

লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]