অশ্লীল স্থূলতা নয়, চাই মানবিক সংবেদনশীলতা

আমাদের নতুন সময় : 11/05/2019

চিররঞ্জন সরকার : ধর্ষণ এখন দেশে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। মে মাসের প্রথম ৮ দিনে দেশে ৪১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আসলে বাংলাদেশ এখন ধর্ষকদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, ৯৭ শতাংশ ধর্ষকের শাস্তি হয় না। ধর্ষণের এই মহামারীর বিরুদ্ধে অল্প কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নারী-পুরুষ প্রতিবাদ করলেও বাকি সবাই যেন ঘুমিয়ে আছে। এমনকি সরকারও ঘুমোচ্ছেÑধর্ষণের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণে সরকারের এ উদাসীনতা ক্ষমাহীন।

গাড়িতে পুরুষ যাত্রী, ড্রাইভার-হেলপার, বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, চাচা-মামা-খালু, দুলাভাই, স্কুল-কলেজে শিক্ষক, কর্মস্থলে সহকর্মী কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয় নারীকে। শুধু তাই নয়, ধর্ষণ বা দলগত ধর্ষণের মতো ভয়ংকর ঘটনার শিকারও হতে হচ্ছে নারীকে। অনেক সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। যেমন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে চলন্ত বাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

এখন অনেক নারীর কাছে পুরুষ মানেই ‘ধর্ষক’! সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়, এই বুঝি কোনো পুরুষ এসে ‘ধর্ষণ’ করবে, খুবলে খাবে, কিংবা বিভিন্ন ছুঁতোয় গায়ে হাত দেবে! মানুষের নৈতিকতার যখন চরম অধঃপতন ঘটে, তখনই তারা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে। আর এ ঘটনাগুলো যখন দেশে অহরহ ঘটতে থাকে, তখন অনুমান করা যায়, আমাদের নৈতিকতার কতোটা অধঃপতন হয়েছে।

আসলে আমরা এক ভয়াবহ বিকারের মধ্যে বসবাস করছি। গেলো বছর অভিনেতা মোশাররফ করিম এক টিভি অনুষ্ঠানে ‘ধর্ষণের কারণ পোশাক নয়’ এমন এক মন্তব্য করে ফেঁসে গিয়েছিলেন। পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারী ধর্মবাদীরা মোশাররফ করিমের বিরুদ্ধে হামলে পড়েছিলেন। এদেশে এখন যেন উল্টো ¯্রােত বইছে। এখানে ধর্ষণ এখন নিতান্তই যে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তার ব্যক্তিগত ‘সমস্যা’। তার পোশাকের সমস্যা। আচরণের সমস্যা! যুক্তি-বুদ্ধি-কা-জ্ঞান বিসর্জন দিয়ে আমরা এক অদ্ভুত বিশ্বাসের জগতে বাস করছি। এই ‘বিশ্বাস’ কেবলই নারীকে ‘ভোগ’ করতে, ‘দখল’ করতে, ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে শেখাচ্ছে। আর একটি শিক্ষা ইদানীং ব্যাপক মাত্রায় চালু হয়েছে তা হলো আগুনে পোড়া রোগীর মতো নারীকে কাপড়ে একেবারে আগাগোড়া মুড়ে ‘ব্যান্ডেজ’ করে ঢেকে রাখা! এর আরেক নাম দেয়া হয়েছে ‘পর্দা!’ এই উন্মত্ততার যুগে ধর্ম হয়ে উঠেছে কামতাড়িত পুরুষের বর্ম। তাই পুরুষের চোখের ‘পর্দা’ নয়, নারীর শরীরের পর্দা নিয়ে চারদিকে এতো মাতম!

পুরুষরা নারীর প্রতি এমন কামার্ত কেন হয়? পুরুষতান্ত্রিক ভাষ্য হচ্ছে : ‘উত্তেজনার বশে’ কিছু পুরুষ এমন কাজ করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, উত্তেজনাটা তাহলে কি? বিজ্ঞান মতে, উত্তেজনা এক বিশেষ রকম অনুভূতি যা মস্তিষ্কে তৈরি হয় এবং মানুষ তার অধীন হয়ে পড়ে। উত্তেজনার বশে মানুষ কখনও নৃত্য করে উঠে, কখনও গালি দেয়, কখনও অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে পড়ে, কখনও ক্রোধে উন্মত্ত হয়। এই উত্তেজনার বশেই নাকি কিছু কিছু পুরুষ নারীদের যৌন হয়রানি করে থাকে, কখনওবা ধর্ষণও। অর্থাৎ এই যুক্তিতে, ‘পুরুষের উত্তেজনা’ই নারীর প্রতি যৌন হয়রানির মূল কারণ! কিন্তু এটা তো বাহ্য। পুরুষজাতির মধ্যে এই ‘উত্তেজনা’ আনে কে? নারীর উত্তেজক পোশাক। বহুশ্রুত যুক্তি নারী ‘উত্তেজক পোশাক’ পরে বলেই পুরুষ উত্তজেনার বশবর্তী হয়ে তার উপর চড়াও হতে বাধ্য হয়। অতএব নারীর লাঞ্ছনার জন্য নারীই দায়ী। প্রশ্ন হচ্ছে ‘উত্তেজক পোশাক’ কাকে বলে? উত্তেজনা তো মস্তিষ্কের ক্রিয়া। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় যে, নারীর ‘স্বল্পবসন’ সত্যই পুরুষের উত্তেজনার কারণ, তার দায় পোশাকের কেন হবে? সেই দায় তো পুরুষের মস্তিষ্কের। কিন্তু সে কথা আমাদের দেশে বলা যাবে না। বললেও তা কেউ মানবেন না। ধর্মের বাণী দেখিয়ে তেড়ে-ফুঁড়ে আসবে।

পুরুষতান্ত্রিক বিধানে যৌনতার অনুষঙ্গকে বহন করে চলার আবহমানকালীন অভ্যাস মেয়েদের মেনে নিতে হয়েছে বলে নিজস্ব এক সন্ত্রাসের জগতে বাঁচাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েদের অনিবার্য নিয়তি। সে জগতে অবিশ্বাস-ধস্ত নারী, পুরুষের প্রতিপক্ষে একা নারী, মন সেখানে অস্বীকৃত-উপেক্ষিত, কেবল আছে নারীর শরীরটুকু আর তাকে ঘিরে আদিমতার উল্লাস। ভোগের সেই উৎসবে শামিল শত-সহ¯্র-লাখোজন। নইলে ব্যক্তিগত শারীর লালসা থেকে পারিবারিক বিবাদের আক্রোশ পর্যন্ত যে কোনো কারণেরই সহজ শিকার নারী, প্রতিশোধস্পৃহার সহজ নিবৃত্তি ধর্ষণ কেন? আমরা মেয়েদের ভয় দেখিয়ে সারাক্ষণ ঘরের চারদেয়ালের দিকে ঠেলে দিই, বলি : মেয়ে, তুমি সাবধানে থাকো। যে কোনো সময় তুমি আক্রান্ত হতে পারো (বলি না যে, পুরুষের লালসার শিকার হতে পারো)! তুমি যতোই অপাপবিদ্ধ হও না কেন, দুর্ভাগ্য নেমে আসতেই পারে যখন-তখন। অতএব সাবধান। নিজেকে ঢেকেঢুকে লুকিয়ে রাখো। আমরা নানাভাবে ধর্ষণ শব্দটিকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করেছি। শ্লীলতাহানি, ইজ্জত লোটা থেকে শুরু করে নানা ঢাকা-চাপা নাম দিয়েছি জিনিসটার। আজ কিন্তু সেটা খসে গেছে। যদিও এর বিপরীত দিকও আছে। ধর্ষণ শব্দটা বারবার শুনতে শুনতে আমাদের মন এমন অসাড় অবস্থায় পৌঁছে গেছে যে এরপর একটি মেয়ে কোনো পুরুষের অবাঞ্ছিত স্পর্শ নিয়ে আপত্তি জানালে বোধহয় শুনতে হবে : তাতে কি হয়েছে, ধর্ষণ করে মেরে তো আর ফেলেনি?

অতএব ধর্ষণ কেবল নারী নির্যাতন নয়, তা বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের একটি প্রকাশ। তাই ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেয়া এবং তার প্রতিকার করা, এর কারণগুলো অনুসন্ধান করা, কোনোভাবেই যেন যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ প্রশ্রয় না পায় তা নিশ্চিত করা। এটা প্রতিটি সভ্য মানুষের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখতে হবে, অশ্লীল স্থূলতা নয়, মানবিক সংবেদনশীলতা যেন আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়কে দ্রবীভূত করে।  লেখক : কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]