ডাক্তারদের দুবছরের ইন্টার্নশীপ নিয়ে আমার কিছু কথা

আমাদের নতুন সময় : 11/05/2019

অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন : শুরুতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। বিভিন্ন সভায় তিনি আজকাল ডাক্তারদের নিয়ে কথা বলছেন। তার অনেক কথা আমাদের কারো কারো পছন্দ হোক বা না হোক, ইতিবাচক দিকটা হলো তিনি বাংলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ডাক্তারদের ইন্টার্নশীপের মেয়াদ দুবছর হবে।

আমাদের স্বাস্থ্যখাতে দূরদর্শী নেতার অভাব। সবকিছু সুপরিকল্পিতভাবে করার চেয়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে করার ব্যাপারেই যেন তাদের আগ্রহ। একজন জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার দুই যুগের জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, বাংলাদেশের মতো দেশে দুই বছরের ইন্টার্নশীপ হবে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। সেক্ষেত্রে তৃণমূলে কাটানো ইন্টার্নশীপের দ্বিতীয় বছর হতে পারে একজন চিকিৎসকের জীবনের স্বর্ণ সময়, অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ একটি বছর। এই সময়ে তৃণমূলের বাস্তবতায় সকল সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে কীভাবে কাজ করতে হয় তা শেখার পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে একজন নবীন ডাক্তার সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবে।

অনেক বছর ধরেই আমি বলছি, আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষা, বিশেষ করে এমবিবিএসের কারিকুলামটি অসম্পূর্ণ এবং যুগোপযোগী নয়। আমরা তাদের মোটামোটা বই পড়িয়ে অসংখ্য অসুখ  শেখাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের আমরা গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিচ্ছি না। ‘মানুষকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিংবা রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় একজন রোগীর অনুভূতি, মূল্যবোধ, প্রত্যাশাকে আমরা কতোটুকু বিবেচনায় নেই? রোগীর সাথে ডাক্তারের ব্যবহার যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা আমরা কতোটুকু শেখাই? প্রমাণভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বোঝার জন্য যতোটুকু গবেষণাবিষয়ক জ্ঞান-দক্ষতা অর্জন করার কথা, তা কি আমরা তাদের শেখানোর চেষ্টা করি না আমাদের মেডিক্যাল কারিকুলামে বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে আছে?

আগামী ১৪ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সকাল দশটায় সভা আহ্বান করা হয়েছে, সভার আলোচ্যসূচির দ্বিতীয় এজেন্ডা হলো ইন্টার্নশীপ দুবছরে উন্নীত করা এবং এক বছর উপজেলা হাসপাতালে ইন্টার্নশীপে সংযুক্ত থাকার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে এবং মিডিয়ার সাম্প্রতিক আলোচনার ভিত্তিতে আমার ধারণা, বাংলাদেশে অচিরেই ডাক্তারদের জন্য দুবছর মেয়াদী ইন্টার্নশীপ চালু হবে।

সম্ভাব্য এই খবরে আমাদের ইন্টার্নি ডাক্তার এবং মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশা এবং ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন। আমার কাছে এসব প্রতিক্রিয়া-হতাশা-ক্ষোভ খুব একটা অযৌক্তিক মনে হয়নি। মেডিকেল ছাত্র-ছাত্রী এবং ইন্টার্নি ডাক্তারদের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারকদের প্রতি সবিনয়ে অনুরোধ করবো, কেবলমাত্র প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতার কারণে এমন যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত যেন সমালোচিত এবং ব্যর্থ না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে। মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত আসন্ন সভায় অংশগ্রহণকারীদের তালিকাটি আমার কাছে অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। এখানে ইন্টার্নি ডাক্তারসহ মেডিকেল ছাত্রছাত্রী এবং আরো কিছু ডাক্তারদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মতামতগুলো গ্রহণ করা যেতো।

এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কিছু বিষয় বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ইন্টার্ণশীপ কয় বছরের হবে সেটা মেডিকেল কারিকুলামের অংশ। যে ছাত্রটি এক বছরের ইন্টার্নশীপের কথা জেনে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলো,  হুট করে কি তার ইন্টার্নশীপের মেয়াদ দুই বছর করা যায়?  তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম, আগামী বছর বা কাছাকাছি সময় থেকেই ইন্টার্নশীপের মেয়াদ দুই বছর করা হল। সে ক্ষেত্রে ইন্টার্নীদের মাসিক ভাতা কত হবে? সেটা কি বর্তমানের মতো একই থাকবে নাকি কমপক্ষে দ্বিগুন করা হবে? উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের বাসস্থানের কি কোনো ব্যবস্থা করা হবে? ইন্টার্নশীপের প্রশিক্ষণ চলাকালীন তাদের তত্ত্বাবধান করবে কে? তারা হাতে-কলমে কী কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন সেটা কবে-কখন-কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?

দুই বছর মেয়াদী ইন্টার্নশীপের এক বছর গ্রামে থাকার বিনিময়ে কি তাদের বিশেষ কোনো প্রনোদনা প্রদান করা হবে? উপজেলা হাসপাতালে ইন্টার্নশীপ করার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কি বিদ্যমান? আজকাল যেভাবে ডাক্তারদের কর্মস্থলে নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে, সেক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার জন্য কি কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এমনিতেই পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্স, তার উপর দুই বছরের ইন্টার্নশীপ, ক্যারিয়ার শুরু করতেই তো অনেক সময় লেগে যায় ডাক্তারদের। তার উপর আছে পোস্টগ্রাজুয়েশন করার তাড়া। সেদিক বিবেচনা করে এমবিবিএস ডিগ্রিটাকে চার বছর মেয়াদের করা যায় কিনা? পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন এমবিবিএস ডিগ্রির মেয়াদ চার বছর এবং প্রমাণিত হয়েছে, সময় হিসেবে এটি যথেষ্ট। ডিগ্রি শেষ করতে যেহেতু অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে, সেহেতু ডাক্তারদের জন্য বিসিএস চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো যায় কিনা? আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, তাড়াহুড়া না করে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে আস্থায় নিয়েই এবিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। মেডিকেল কারিকুলাম আধুনিক ও যুগোপযোগী করার এখনই উপযুক্ত সময়। দূরদর্শী নেত্রী, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্থা রেখে বরাবরই বড় আশাবাদী হতে ইচ্ছে করে।

লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]