• প্রচ্ছদ » » যে শিশুকে ধর্ষণের শিকার হয়ে কুৎসিত উপায়ে রাতারাতিবড় হয়ে যেতে হয়, তার শৈশব-কৈশোর আর আসে না


যে শিশুকে ধর্ষণের শিকার হয়ে কুৎসিত উপায়ে রাতারাতিবড় হয়ে যেতে হয়, তার শৈশব-কৈশোর আর আসে না

আমাদের নতুন সময় : 11/05/2019

আফসানা বেগম

একদিন আবিষ্কার করলাম যে হারানো কিছু খুঁজে বেড়ানো আর নিজে হারিয়ে যাওয়া মোটামুটি একই ব্যাপার। দেখলাম হারানো জিনিস বা হারানো মানুষকে খুঁজছি, তন্ন তন্ন করে খুঁজছি, সে কোথায়, সে কেমন আছে, না জানা অবধি খুঁজছি, আবার নিজে হারালেও খুঁজছি চেনা রাস্তা, চেনা মুখ, আসলে সেসবের নিরীখে নিজের পরিচয় খুঁজছি। জীবনে প্রথম হারিয়েছিলাম চার বছর বয়সে, প্রথম কিন্ডার গার্টেন স্কুল থেকে। দিনাজপুরের কালীতলার যে স্কুলে বেশিদিন পড়া হয়নি ‘মুক্তি’ নামের একজনের সঙ্গে পালিয়ে বেড়ানোর অপরাধে। মুক্তি প্রতিদিন আমাকে স্কুল থেকে মুক্ত করে কোথায় যেন নিয়ে যেতো। একদিন এক বাড়ির সামনের বাগানে বসিয়ে বললো একটু পরই আসবে। বাগানের ফুলে কতো প্রজাপতি এলো-উড়লো-গেলো, মুক্তি এলো না। রাস্তা-ঘাটের দিক-নিশানা না বোঝা আমার বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিলো না। তাছাড়া ছিলো মুক্তির ফিরে আসার দায়বদ্ধতা, সে ফিরে এসে যদি আমাকে না পায়? বিকাল গড়িয়ে শেষে আমাকে পেয়েছিলেন বাবার অফিসের পিওন, রফিকুল্লাহ ভাই। দূরে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে উচ্চতা দেখিয়ে যখন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করছিলেন নীল জামা পরা এতোটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে হারিয়ে গেছে, কেউ দেখেছে নাকি, আমি তখন আমার গায়ের জামার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠেছিলাম, এই তো আমার গায়ে নীল জামা, আমি কি তবে হারিয়ে গেছি!
তারপর আরো বড় হবার পালা। খেলার মাঠে খুলে রাখা স্যান্ডেল ভুলে বাড়ি ফিরে প্রায়ই মাকে জিজ্ঞাসা করতাম, স্যান্ডেল হারালে এতো খারাপ লাগে কেন? মা হেসে বলতো, তোর আর কি হারাবে ওই স্যান্ডেল ছাড়া? কিন্তু ধীরে ধীরে কতো কিছু যে হারালো! যতো হলো, যতো জমলো, ততো হারালো। একসময় দেখলাম, জীবনটা হারিয়ে হারিয়ে সামনে চলার এক স্মৃতিকাব্য, মন-শরীর এক স্মৃতি-জাদুঘর। দিনের পর দিন বন্ধু হারালো, প্রিয় বই হারালো, কখনো মনোবল হারালো, কখনো হারালো বিবেচনা-শক্তি। আমাদের আশির দশক হারালো, পৃথিবীর সবচেয়ে আবেদনময় গানগুলো কান থেকে দূরে সরে গেলো। নিজের দোষে কতো কিছু হারালো, প্রকৃতির দোষে হারালো প্রিয়জনেরা। অথচ ক্রমশ বুঝতে পারলাম, হারাতে হারাতে একসময় থিতু হওয়া যায়, হারানোর ব্যক্তিগত কষ্টের তীব্রতাই যায় হারিয়ে। কিংবা আবার সেই স্যান্ডেল-সর্বস্ব সময়ের মতো ভাবা যায়, বেশি কিছু হারানোর নেই আর। তখন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা যায় হারানোর উৎসবের দিকে।
দূরে কোথাও ধর্মীয় রেষারেষির বোমায় দেশ হারানো, চুক্তির কারণে সার্বভৌমত্ব হারানো, তাড়িয়ে দেয়ায় জন্মভূমি হারানো, নাগালের বাইরের সব হারানো চুপটি করে দেখা যায়। আবার একেবারে নিজের ঘরে হলেও স্বাভাবিকভাবে নেয়া যায় মাত্র চার মাসে ধর্ষণের কারণে ২৭৯ শিশুর শৈশব-কৈশোর হারানোর কথা, আগের বছর ২৭১ নারীকে ধর্ষণের পরে হত্যার মাধ্যমে জীবন হারাতে বাধ্য করার কথা, কিংবা ‘শুভ নববর্ষ!’ বলে আরম্ভ করা বছরটির শুরুর মাত্র তিন মাসের প্রতিদিন একজন মানুষের বিনাবিচারে গুলি খেয়ে হারিয়ে যাবার কথা, একই সময়ে ১২ জন মানুষ কে জানে কোথায় হারিয়ে উবে যাবার কথা, ১১ জনের এখানে-ওখানে হারিয়ে গিয়ে মরে পড়ে থাকার কথা। কখনো অন্য মনস্কভাবে নিজেকে প্রশ্ন করা যায়, আচ্ছা হারিয়ে যাওয়া জিনিস আসলে থাকে কোথায়?… কোথাও তো থাকে যেখান থেকে কেউ কেউ নির্বাক হয়ে ফিরে আসে! ধর্ষণের পরে হত্যার শিকার মেয়েটি, শিশুটি আর আসে না। যে শিশুকে ধর্ষিত হয়ে কুৎসিত উপায়ে রাতারাতি বড় হয়ে যেতে হয়, তার শৈশব-কৈশোর আর আসে না। কতো স্বাভাবিক এই হারিয়ে যাওয়া, কতো সহজ এই হারিয়ে যাওয়াকে মেনে নেয়া! শুধু খানিক ঝামেলা হলো, এই সমস্ত কিছুর নিরীখে নিজেকে আর চেনা যায় না, ‘আমিত্ব’ যায় হারিয়ে। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]