সরকার কি চায়?

আমাদের নতুন সময় : 11/05/2019

কামরুল হাসান মামুন

ইউএনওদের জন্য কেনা হচ্ছে ১০০ দামি গাড়ি! ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় সরকারের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিদেশে মাস্টার্স এবং পিএইচডি করার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ’ নামে একটি ফেলোশিপ চালু করা হয়েছে। যার আওতায় নামকাওয়াস্তে কিছু সরকারি কলেজের শিক্ষক, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকেও যোগ করা হয়েছে। উপরের দুটি প্রকল্প দেখলে মনে হবে সরকারের টাকার কোনো অভাব নেই। বাংলাদেশের উপজেলা লেভেলে রাস্তার কি বেহালদশা আমরা জানি। এ রকম বিলাসবহুল গাড়ি চালানোর রাস্তাই নেই সেখানে কোন যুক্তিতে তাদের এই গাড়ি দেয়া হচ্ছে? রাস্তায় ইগড বা মার্সেডিজ বেঞ্জ গাড়ি দেখলে আমার স্ত্রী বলে এতো দামি গাড়ি চালানোর রাস্তা কি ঢাকায় আছে? তাছাড়া এতো দামি গাড়ি চালানোর আরামটা কি মালিক পাচ্ছে? গাড়ি তো চালাচ্ছে ড্রাইভার! বাংলাদেশের অধিকাংশ উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা পরিবার নিয়ে উপজেলায় থাকেন না। তাদের স্ত্রী-সন্তান থাকে ঢাকায়, কারণ তাদের সন্তানরা ঢাকার স্কুলে পড়েন। কর্মকর্তারা বুধ-বৃহস্পতিবার ঢাকায় আসেন আর রোববার রওনা হয়ে দিনের শেষ দিকে গিয়ে কর্মস্থলে যোগ দেন। এই গাড়ি এখন তাদের ঢাকায় আনা-নেয়ার কাজেই মূলত ব্যবহার হবে। এই গাড়ি সরকারি কাজে কীভাবে ব্যবহার হবে আমি বুঝি না। অল্পস্বল্প কাজে নিশ্চয়ই লাগবে, কিন্তু তার জন্য সরকারের এতো টাকা খরচের কি আদৌ কোনো যুক্তি আছে?
ঠিক তেমনিভাবে ‘প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ’ চালু করে কর্মকর্তাদের মাস্টার্স করার জন্য ৬০ লাখ টাকা দেয়া আর পিএইচডির জন্য দুই কোটি টাকা দিয়ে তাদের মাস্টার্স আর পিএইচডি করানো কি এতোটাই জরুরি? তাদের পরিবর্তে একই অর্থ ব্যবহার করে কলেজ শিক্ষকদের পিএইচডি করালে লাভের পরিমাণটা কি বুঝতে পারা খুব কঠিন? একজন শিক্ষককে এর আওতায় এনে তার মান উন্নয়ন করালে সে বছর বছর ধরে শতজন এমনকি হাজারজন ছাত্রছাত্রীকে এর সুফল দিতে পারবে। তাহলে এই ফেলোশিপ এই মুহূর্তে কাদের দেয়া সবচেয়ে জরুরি? কাদের দিলে জাতি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে? উত্তর হলো শিক্ষকদের দিলে জাতি সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।
এমনিতেই সরকারি কর্মকর্তা যেমন উপসচিব থেকে শুরু করে সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যেই পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় তা অভাবনীয়। এটা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়। এটা বৈষম্যের বিষয়। এসব দিয়ে রাষ্ট্রে একটি বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। নেপাল-শ্রীলঙ্কায় শিক্ষকদের বেতন হয়তো বাংলাদেশের শিক্ষকদের চেয়ে কম। একসময় বাংলাদেশেও শিক্ষকদের বেতন অনেক কম ছিলো এখন তুলনামূলক বেড়েছে যদিও সেইসঙ্গে দ্রব্যমূল্য বেড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে। তথাপি স্বল্প বেতনে নেপাল-শ্রীলঙ্কার শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর বাইরে অন্য কোথাও পার্টটাইম বাংলাদেশের মতো গণহারে পড়ায় না। কারণ ওখানে ওই দেশের তাদের সমপর্যায়ের মানুষরা তাদের চেয়ে খুব একটি বেশি ভালো জীবনযাপন করে না। অর্থাৎ বৈষম্যটা খুব চোখে পড়ার মতো নয়। সব কিছুই আপেক্ষিকতা দিয়ে বিচার করতে হবে। শিক্ষকরা যে প্রাইভেট পড়ায়, কোচিং করায়, পার্টটাইম পড়ায় ইত্যাদি এই বৈষম্য ঘোচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা মাত্র। হয় রাষ্ট্র এই বৈষম্য ঘোচাবে না হয় বৈষম্যের শিকার যারা তারাই সেটা করতে চাইবে। এই বৈষম্যের কারণে আরেকটি বড় ক্ষতি হলো পুরো ছাত্রসমাজকে বিসিএসমুখী করে ফেলা হয়েছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কিংবা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি কিংবা যেকোনো লাইব্রেরিতে চটি বইয়ের গাইড বই ব্যতীত কোনো বই-ই তেমন পড়ে না।
শিক্ষকরা গবেষণার জন্য টাকা পায় না, বিদেশে ওয়ার্কশপ/কনফারেন্সে যোগ দেয়ার জন্য টাকা পায় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য টাকা দেয়া হয় না অথচ ওদিকে তাকালে মনে হয় সরকার টাকা খরচ করার জায়গা খুঁজে পায় না। জেনেছেন নিশ্চয়ই যে, আমাদের ৪৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। আর অন্যদিকে অক্সফোর্ড নামক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছরের বাজেট বরাদ্দ ২৪ হাজার কোটি টাকা। এই টাকা দিয়ে বাংলাদেশের মতো ১৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বরাদ্দ দেয়া যাবে। ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের চেয়ে ঢের বেশি টাকা দেয়।
সরকার কি চায়? সরকার কি আমাদের নতুন প্রজন্মকে উন্নতমানের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায় নাকি তাদের নাম মাত্র শিক্ষা দিয়ে শুধু অনার্স আর মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করে পুলকিত অনুভব করতে চায়? বর্তমানের ইন্টারনেটের যুগে তথ্য সব এখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়। ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে সব তথ্য জানা যায়। একটু ঘেঁটে দেখুন তো পৃথিবীতে এমন কোনো একটি দেশ আছে কিনা যেই দেশ আগে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে তারপর শিক্ষায় উন্নতি করেছে। একটি দেশও পাবেন না। সবকিছুর ব্যতিক্রম আছে। ব্যতিক্রম হিসাবেও একটি দেশ পাবেন না। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, ভারত এদের উন্নতির উৎস হলো শিক্ষা। মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে উন্নত মানুষে রূপান্তরিত করতে হবে। কেবল সেই উন্নতমানের মানুষই দশকে উন্নত করতে পারে। টাকা কোথায় বিনিয়োগ বেশি করতে হবে সেটা বোঝার ক্ষমতাও দেখছি আমাদের নেই। তাহলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করবো?
‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিয়ো ক্ষুধার লাগি’ দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী! ঠিক তেমনি জোটে যদি মোটে একটি পয়সা খাদ্য কিনিও জনগণের লাগি তারপরেই যদি পয়সা জোটে শিক্ষায় ব্যায় করেন হে অনুরাগী! ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]