আমার বিষণœতার কাল

আমাদের নতুন সময় : 13/05/2019

হাসনাত কাইয়ূম

ক. আমার কিছু কিছু পলিটিক্যাল বন্ধু আছেন যারা এমনকি আমি ফেসবুকে কি লিখি সেটাও মনোযোগ দিয়ে পড়েন এবং আমি যেন বিষণœতার কথা না বলি তার জন্য জোর তাগিদ দেন। কিন্তু আমি কি করবো? আমি প্রায়ই আক্রান্ত হই এবং কোনো কোনো সময় তা প্রকাশও হয়ে যায়। খ. যেমন ১ রোজায় ঘুম থেকে উঠেই জানলাম তারাবি থেকে সেহেরির সময়টুকুর মধ্যে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল সদস্যরা পাঁচজনকে ধরে নিয়ে গুলি করে মেরে, ক্রসফায়ারের অতিব্যবহৃত বিবৃতিটি পত্রিকায় ছাপতে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমরা জানি, পুলিশ জানে, রাষ্ট্র পরিচালকরা, মোল্লা-মুন্সী, বিচারকসহ সকলেই জানে এগুলো কোনো ক্রসফায়ার নয়, এসবই ঠাÐা মাথার খুন। হয়তো এরা অপরাধী, হয়তো এদের জ্বালায় এলাকাবাসী অতিষ্ঠ, হয়তো পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠিকই জানে, এগুলো এমন সব ছ্যাঁচরা আপরাধে জড়িত যে, এদেরকে ধরে জেলে পাঠিয়ে কোনো লাভ নেই, দুইদিন পর একটা ছ্যাঁচ্ছোর উকিলই জামিন করে বের করে দেবে, আবার আসবে, আবার জড়াবে, আবার জ্বালাবে, তার চেয়ে ১ রোজাতেই এ লাইনের ছ্যাঁচড়াদের একটা বড় থ্রেট দিয়ে দেয়া ভালো।
আমাদের হুজুরেরা, আমাদের মা-বোনেরা, আমারা দেশবাসীও পুলিশ ভাইদের সঙ্গেই হয়তো একমত। আমি নিজেও আইন, বিচার ব্যবস্থা, অপরাধপ্রবণতা, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি ভারি ভারি তত্ত¡ দিয়ে এসব সামান্য খুন-খারাবি মেনে নিয়ে সুখী-খুশি থাকতে চাই, কিন্তু থেকে থেকে কেবলই কেন যেন মনে আসে, ওদেরও কি সন্তান আছে, আমার বাচ্চাদের মতো ছেলেমেয়ে? মারামারি করার মতো একটা বউ? এরাও কি শৈশবে কখনো মায়ের সঙ্গে প্রথম রোজার সেহেরি খেয়েছিলো? বাচ্চার মুখে চুমু খেয়েছে কোনোদিন? এসব বিশ্রী কথা আর ওই মেয়েটার ‘আব্বু তুমি কানতিছো কেন…?
গ. কয়েকদিন আগে আমার গ্রাম থেকে একটা গরিব মেয়েকে নিয়ে এসেছে তার মা-বাবা অ্যাম্বুলেন্সে করে। বছরখানেক আগে বিয়ে হয়েছে, বাপ আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলছে কাকু ৮ মাসের ‘গর্ববতী’, ছোট একটা মেয়ে প্রেগন্যান্ট, কিন্তু সমস্যা সেটা নয়, স্থানীয় ডাক্তার আমায় ফোনে বলেছে ‘কলোনস্কপি’ করা দরকার ছিলো, কিন্তু এ অবস্থায় আমরা করতে পারছি না আর ‘এফএনএসি’ করার ব্যবস্থা এখানে নেই তাই আপনার কাছে পাঠালাম কোথাও ভর্তি করে করিয়ে নেবেন। বছর দুয়েকের মধ্যে আমি রীতিমতো ক্যান্সার এক্সপার্ট হয়ে উঠেছি। গত ২ বছরে শুধু আমার গ্রাম থেকে ২৫ বছরের কম বয়সের তিনটি ছেলে বিভিন্ন প্রকার ক্যান্সারে মারা গেছে, আর একজন ভুগছিলো, সম্প্রতি পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম, মানে আর একজন যুক্ত হলো।
গত ২ বছরে শুধু আমাদের এলাকার সংগঠনের পঞ্চাশোর্ধ্ব কিন্তু কোনোভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যুর বয়স হয়নি, অন্তত এমন তিনজন গুরুত্বপুর্ণ বন্ধু ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেছেন। এদের একজন আমাদের জেলে আন্দোলনের শহীদ সঞ্জীব দাসের পিতা বিজয় রাজ দাস, জেলে আন্দোলনে সঞ্জীবের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে ছিলেন, আমরা বলতাম মৃত্যুঞ্জয়ী খগেন্দ্র চন্দ্র দাস আর অতি সম্প্রতি বিদায় নিলো আমাদের অত্যন্ত আদরের রকিব পারভেজ। ঙ. সব কিছু এমনভাবে চেপে ধরে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, সবগুলো মৃত্যুর কারণ আমার জানা, এর সবগুলোই খুন, নৃশংস হত্যাকাÐ, রাষ্ট্রের কাঠামোগত খুন। এর সমাধানও জানি, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার। কিন্তু করতে পারছি না। এমন পরিস্থিতিতে বিষণœতা ছাড়া আর কি থাকে? ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]