• প্রচ্ছদ » » স্বাধীনতার জন্য একা থাকাটা শিখতে হয় সবার আগে একা থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, নিজের উপর শ্রদ্ধা বাড়ে


স্বাধীনতার জন্য একা থাকাটা শিখতে হয় সবার আগে একা থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, নিজের উপর শ্রদ্ধা বাড়ে

আমাদের নতুন সময় : 13/05/2019

সাদিয়া নাসরিন

কিছু বিষয়ে আমার ইগো সংকট প্রকট। স্বামীর বা বাবার টাকাকে আমি কখনোই আমার ভাবতে পারিনি। পারি না এটা দাও, ওটা চাই বলতে। এই না পারাগুলোর জন্য আমাদের যৌথ জীবনে বারবার আঘাত এসেছে। আমার স্বামী নিজেকে ঠিক ‘পুরুষ’ ভাবতে পারেনি, ইনফিরিওর মনে করেছে, সম্পর্কে সংকট তৈরি হয়েছে, তার আর আমার সঙ্গী হয়ে উঠা হয়নি। আব্বা আমাকে অহংকারী, ঔদ্ধত্য মনে করেছেন, আমাদের দূরত্ব বেড়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বামী, প্রেমিক, বাবা কিংবা ভাই, কারো বাড়িকেই আমি নিজের মনে করতে পারি না। তাই কোনো সংকটময় সময়ে বা সংসারে কলহ বিবাদের পরও রাগ করে আমি কোনোদিন বাবার বাড়ি উঠতে পারিনি। উনিশ বছর বয়সে যেদিন ভাগ্য নামের জিনিসটাকে চ্যালেঞ্জ করে জীবনের পথ পরিবর্তন করবো বলে একদম অচেনা পথে নেমে এসেছিলাম, সেদিনও নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে বাবার বাড়ি গিয়ে দাঁড়াইনি। আমার মনে হয়, বাবার বাড়ি বা বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়া যায়, মন খারাপ হলে যাওয়া যায়, এমনকি মন ভালো হলেও যাওয়া যায়। কিন্তু নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে কারো বাড়ি যাওয়া মানে নিজের ঠিকানাহীনতাকেই প্রকট করা, নিজেকে ক্ষুদ্র করা। আমি এটা পারি না। কখনোই পারি না। সারাজীবন আমি তাই নিজের একটা ঘর চেয়েছি। ভার্জিনিয়া উলফ যে ঘরের কথা বলেছেন বারবার। বাবার নয়, স্বামীর নয়, ছেলের নয়, ভাইয়ের নয়, একান্ত নিজের একটি ঘর। সংসার নামক হাঁড়ি-পাতিলের খেলাঘর নয়, কন্ট্রিবিউশনের যৌথ ঘরও সেটি নয়, পরিবার নামক সুখ সুখ খেলার নিশ্চিন্ত গৃহকোণ নয়। যে ঘর একান্তই আমার একলার ঘর, আমার নিজের একটি চাবি।
২০০৯ এর শেষের দিকে যখন আমার নিজের অফিস হলো, সেই অফিসে আমি আমার জন্য একটি ঘর সাজিয়ে রাখতাম। টানা বারান্দা, একটি পড়ার টেবিল, কিছু বই, এয়ার কন্ডিশন, টেলিভিশন দিয়ে ফুল ইকুইপট একটি ঘর। আমি অফিস করার সময় আমার বাচ্চারা সে ঘরে থাকতো। সংসারে রাগারাগি হলে কিংবা মন খারাপ হলে অথবা সাফোকেশন হলে বা একা থাকতে ইচ্ছে হলে আমি সে ঘরে গিয়ে উঠতাম। পুরুষের জগতের স্বাভাবিক নিয়মেই আমার স্বামী, আমার পিতা কেউই আমার এই ছোট্ট ঘরটাকে মেনে নিতে পারেননি। আমার একটি নিজস্ব ঘর থাকা, আলাদা স্পেস থাকাটা আমার স্বামীকে ইনসিকিউর করেছে, বাবাকে বিব্রত করেছে। দু’বছর আগে অনেক রোমান্সের ফুলঝুরি ছড়িয়ে, আদর যতেœর নহর বইয়ে দিয়ে আমার স্বামী আমার সেই একচিলতে ঘরটুকু ছাড়িয়ে দিয়ে আমাকে একেবারে তার কলিজার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি হয়তো মনে করেছেন, সেই ঘরটুকু না থাকলেই আমি আর রাগ করে কোথাও যেতে পারবো না। এতোগুলো বছর আমার সঙ্গে কাটিয়েও তিনি জানতে পারেননি, ঘরটি শুধু আমার রাগ করে বেরিয়ে যাবার জায়গাই ছিলো না, বরং নিজের সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর জায়গা ছিলো, আমার ব্রিদিং স্পেস ছিলো। তাই সেই ঘরটি তিনি ছেলেভোলানো ভালোবাসার মোয়া দিয়ে কেড়ে নিয়েছেন। এখন সেই একটি রুম, টানা বারান্দা আর মেঝের বিছানা আমার নেই। এই যে, ২৫০০ স্কয়ারফিটের বিশাল ঘরটিতে আমি এবং আমরা এখন সংসার যাপন করি তার সবটাই আমার। না, ‘তার সবই তো আমার’ টাইপ ফালতু অথর্ব ন্যাকামোর ঘর নয়। সম্পূর্ণ নিজের নামে, নিজের টাকায় চালানো ঘর। এই চাবি আমারই। তবু এটিও আমার সেই ঘর নয়, যে ঘর আমি খুঁজছি।
এখন এই বিশ্বব্রহ্মাÐে আমার আর হারিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমার একা থাকতে ইচ্ছে হলে কোথাও যাওয়ার নেই। নেই, নেই, নেই… এই না থাকা আমাকে ক্ষুদ্র করে, একটি ঘরের অভাব আমাকে ভীষণ একলা করে দেয়, আমাকে জেদী করে। আমি তাই বিশ্বলোকের ইথারে বিতারে নিজের ঘর খুঁজতে বের হয়ে যাই। নিজের মতো করে নিজের সঙ্গে সঙ্গ করে শান্ত হয়ে ফিরে আসি। নিজের একটি ঠিকানা তৈরি করার মতো কোমরের জোর, মন, মানিব্যাগ সব জোরই আমার আছে। তবুও আমি নিজের সেই ঘর বানাতে পারিনি। পুরুষের পৃথিবীতে নারীর নিজের ঘর হয় না। বাবার বাড়ি, স্বামীর বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি, ছেলের বাড়ি ইত্যাদি নানা পুরুষের ঠিকানা ছাড়া নারীর নিজের ঠিকানা হবে এটা পুরুষরা মানতে পারেন না।
ভার্জিনিয়া উলফ বারবার নিজের ঘরের কথা বলেছেন নারীর জন্য। বলেছেন, ‘নারীকে স্বীকৃতি পেতে হলে অবশ্যই পুরুষশাসিত সমাজের শক্তিশালী শোষণ অর্থনৈতিক স্বার্থপরতা ও নিয়ন্ত্রণের মতো দুর্বার বাধাগুলোকে অতিক্রম করতে হবে। ন্যূনতম পক্ষে নিজস্ব একটা ঘর শুধু এই অবস্থা থেকে নারীকে মুক্ত করতে হবে। তাই সব কিছুর আগে একটি ঘরের ঠিকানা তৈরি করতে হবে মেয়েদের। এই ঘরের চাবিটা তার নিজের হাতেই থাকবে এবং এই ঘরে নারী থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন’।
আমি জানি একদিন আমার নিজস্ব সেই ঘর হবে। কেউ সেই ঘর কেড়ে নিতে পারবে না। সংসার, সন্তান, দায়িত্ব, কোলাহল, সব কিছুর শেষে আমি যেখানে শুধুই আমার। আমার মুক্তির আকাশ, আমার ভেন্টিলেশন। আমার ক্লান্ত শরীর এলানো ঠাÐা মেঝে। আমার শ্রান্ত নির্জন দ্বীপ। আমার নিজের চাবি। আমার মেয়েকে আমি সবসময় বলি, নিজের একটি ঘরের কথা ভাবো এখন থেকেই। নিজের সব প্রিয় জিনিস দিয়ে স্বামীর বাড়ি সাজাবার চিন্তা অথবা স্বামী-সন্তানের কাছ থেকে কষ্ট পেয়ে বাবার বাড়ি গিয়ে উঠার চিন্তা বাদ দিয়ে, নিজের একটা ঘরের কথা ভাবতে হবে ছোটবেলা থেকেই। যেদিন মেয়েরা নিজের একটি নিজস্ব ঘরের মূল্য বুঝতে পারবে, নিজস্ব আকাশে একলা উড়তে পারবে, সেদিনই স্বাধীন হবে।
স্বাধীনতার জন্য একা থাকাটা শিখতে হয় সবার আগে। একা থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, নিজের উপর শ্রদ্ধা বাড়ে। একা থাকলে জীবনের আগাগোড়া পড়া যায়, উপভোগ করা যায়। জীবনকে একলা যাপন করার ক্ষমতার নামই স্বাধীনতা। এই সংসার, দায়িত্ব, সামাজিকতা আর কোলাহলের শেষে মানুষ কিন্তু একাই। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]