কেন এ জুতা প্রদর্শন?

আমাদের নতুন সময় : 14/05/2019

ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম : সোনাগাজির মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহানকে পুড়িয়ে হত্যার মামলাকে আত্মহত্যা বলে চালাতে চেয়েছিলো স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। ওসিসহ দোষী তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে ইতোমধ্যে তিন জনকে সাসপেন্ড করে ফেনীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় পুলিশদপ্তরে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ওসির সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে রংপুরে। এ দিকে এই সংযুক্তির প্রতিবাদে নেমেছে রংপুরের বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ডাকে মানববন্ধন ওই ওসি (মোয়াজ্জেম হোসেন)-কে উদ্দেশ্য করে জুতা প্রদর্শন করা হয়েছে। প্রতিবাদ হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফোরামের ডাকা এ প্রতিবাদে বলা হয়েছে নারীমুক্তির অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার পুণ্যভূমিতে ওই নারীনির্যাতনকারী ওসির কোনো ঠাঁই নেই। প্রতিবাদ দেশের অন্যত্রও হয়েছে।

রংপুরের প্রতিবাদকারীদের জুতাপ্রদর্শন একটু বাড়াবাড়ি বলেই মনে হচ্ছে। বিভাগীয় ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ওই ওসিকে তো সংযুক্তি দিতে হবে কোথাও। তা হলে রংপুরে সমস্যা কিন্তু  বেগম রোকেয়ার পুণ্যভূমি বলে? এটা কোনো যুক্তির কথা হতে পারে না। দেশে নারী নির্যাতন সর্বত্র হচ্ছে। রংপুরও তার ব্যতিক্রম নয়। রংপুরের একজন কুসন্তান দেশে সামরিক শাসন জারি করে, গণতন্ত্রকে যে ভাবে ধর্ষণ করেছে, আর নারীকে যে-ভাবে ভোগের সামগ্রী করেছে, তা কি রংপুরবাসীর অজ্ঞাত? শুধু বিদিশার বইটি পড়লেই ওই দুর্বৃত্ত লম্পটের দিকে জুতা নিক্ষেপ করতে ইচ্ছা করে। রংপুরবাসী কি পড়েনি ‘শত্রুর সাথে বসবাস’ নামক সেই অসাধারণ বইটি? বইটিকে অসাধারণ বলছি এ জন্য যে মনে-প্রাণে পিতৃতান্ত্রিক এক ভোগবাদী সামরিক ডিকটেটরের মুখোশ উন্মোচন করেছে তা বিশ্বস্ততার সাথে। আমি তো মনে করি, আজ দেশে যে বর্বর পুরুষতান্ত্রিকতা, দুঃশাসন, ভোটের নামে প্রহসনের বংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এরশাদের নিদারুণ নির্মম ভূমিকা রয়েছে। মধ্যযুগের গির্জাশাসিত পশ্চাদপদ ইউরোপ, তথা পশ্চিমা সভ্যতার আজ যে বিকাশ তা তো সম্ভব হয়েছে ধর্মের জায়গায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি করার জন্য। ধর্মতন্ত্রের জায়গায় প্রজাতন্ত্র করার জন্য। ধর্মরাজ্যের সময় মেয়েদেরই কঠিন দুরাবস্থা ছিলো ইউরোপে। তাদের ভোটাধিকার ছিলো না, জীবন-জীবিকার স্বাধীনতা ছিলো না, আজকের মুসলিম মেয়েরা আর কতোটুকু পর্দা করে, তার চেয়ে ঘোর পর্দাপ্রথা মেনে চলতে হতো নারীদের। তারপরেও রেহাই ছিল না। প্রতিভাময়ী কোনো মেয়ে একটু স্বাধীন চিন্তা করলেই বা গির্জার পাদ্রিদের খায়েশ মেটাতে কার্পণ্য করলেই, তাদের ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হতো। রংপুরবাসীর মনে রাখতে হবে, আধুনিক ইউরোপীয় শক্তি ক্ষমতায় ছিলো বলেই বেগম রোকেয়া সমাজে পুরুষতন্ত্রের শত নির্যাতনের মধ্যেও ‘বেগম রোকেয়া’ হতে পেরেছেন। তা না হলে তার ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘অবরোধবাসিনী’ বা ‘ভিশন অব দি পাস্ট’ কোনো দিন আলোর মুখ দেখতো না।

নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে এরশাদ পিতৃতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে। ইসলাম তো এ ভূ-খ-ের রাষ্ট্রধর্ম ছিলোই। পকিস্তান কি আমরা ভুলে গেছি? ধর্মের নামে নির্যাতন-শোষণ-নারীধর্ষণের লীলাক্ষেত্র হয়ে পড়েছিল পাকিস্তান। এরশাদ কি তা জানে না? বাংলাদেশের জন্মলগ্নের রক্ত কি এরশাদ দেখে নাই?

সারা দেশ এরশাদের বিরুদ্ধে মুখ ফিরিয়ে নিলেও রংপুর এরশাদকে ভোট দেয়। ওদের ভোটেই এরশাদ দাপটের সাথে টিকে আছে। সব সুনীতিধর্ষক এরশাদকে টিকিয়ে রাখা রংপুরে যখন একটি মেয়ে ধর্ষকদের রক্ষাচেষ্টায় ভূমিকা  সোনাগাজীর ওসিকে জুতা দেখায় আর বলে, রংপুরের মাটি তোর জন্য হারাম, তখন ঠিক মিলাতে পারি না। কোনো আমলা যদি গর্তে পড়ে, ইঁদুরেও হাতির বল দেখায়, তাকে লাথি মারে। ওসির অবস্থা হয়েছে এখন তাই। আর যে রাজনীতি লুটপাটতন্ত্র আর পিতৃতান্ত্রিক ভোগতন্ত্র কায়েম করতে এ ধরনের ওসি বা আমলাতন্ত্র কায়েম করছে, সে রাজনীতির বিরুদ্ধে তারা টু-শব্দ করে না। এলাকার লম্পট নেতাকে দেখলে তারা মুখের হাসিকে আকর্ণ বিস্তার করে একটা গদগদ সালাম ঠোকে।

আমরা চাই গণজুতা সব অপরাধীর বিরুদ্ধেই উদ্ধত হোক।

লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]