উন্নয়নের রোলমডেল ও বৈষম্যের স্টিমরোলার

আমাদের নতুন সময় : 15/05/2019

ভূঁইয়া সফিকুল ইসলাম : জাতীয় উন্নয়ন কে না চায়? কিন্তু তা কি হবে সাম্যকে মাড়িয়ে? প্রবৃদ্ধির নিরিখে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু সামাজিক সাম্যের বিচারে? বিশ্বে এতো দ্রুততম হারে ধনী বৃদ্ধির নজির কোথাও নেই। পাশাপাশি লাখ লাখ শ্রমিক কৃষকের জীবন এখানে দুর্বহ। শ্রমিক আন্দোলন করে, রক্ত ঝরিয়ে কিছু বেতন বাড়াতে সক্ষম হয় মাঝে মাঝে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তা প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির কোনো বিজয় নয়। আর কৃষক? গরুর সঙ্গে যাদের হাজার বছরের জীবন বাঁধা, তারা গরুর মতোই বোবা, ভাষাহীন, আন্দোলন জানে না, তাদের কোনো মুখপাত্রও নেই। ধীরে ধীরে নিঃশ্বায়নের নিঠুর নিয়তি যেন তার ললাটে লেখা।

ধান উৎপাদনের খরচ তুলতে পারছে না কৃষক। যেখানে প্রতি কেজির উৎপাদন খরচ প্রায় ১৫ টাকা, সেখানে কৃষক বিক্রয়মূল্য পাচ্ছে ১২ টাকা। চাল ব্যবসায়ী ফড়িয়া, মিল মালিকদের অবশ্য পোয়াবারো। তারা প্রতি কেজি বেচতে পারছেন ৪০ টাকায়। টাঙ্গাইলের যে কৃষক ধান কাটার খরচ যোগাড় করতে না পেরে পাকা ধানের ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন, সে কৃষক আমাদের উন্নয়নের রোল মডেলের বিরুদ্ধে নিঃস্ব, বিচ্ছিন্ন হাজারো কৃষকের ক্ষোভেরই প্রতিবাদ।

কৃষকের ছেলে আজ ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে। কি বার্তা দিচ্ছে এই মৃত্যু? এই যে দুদিন আগে লিবিয়ার উপকূলে ৬০ অভিভাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু হলো, এর মধ্যে মাত্র ২০ জন, যুদ্ধধ্বস্ত সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন অঞ্চলের। জীবনের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে তারা ইউরোপে পাড়ি জমাতে চেয়েছে। কিন্তু তাদের সংখ্যার দ্বিগুণ বাংলাদেশির কি দায় পড়েছিলো ডুবে মরে যেতে? কোনো যুদ্ধ তো এখানে নেই?  না, দৃশ্যমান কোনো যুদ্ধ এখানে নেই। তবে অসাম্য এদেশে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই যুবারা লাশ হচ্ছে সমুদ্র-মরু-তুষার নদীতে। এক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য এ ব্যাপারে অবশ্য এক দুর্ভাগ্যজনক একপেশে বিশ্লেষণ দিয়েছেন ১৪ মে ‘আমাদের নতুন সময়ে’। তিনি বলেছেন ‘লোভ’, এই আদম সন্তানগুলো দুর্দন্ত লোভী বলেই মরছে। বেশি রোজগারের আশায় অবৈধ পথে তারা বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। তার এ অপবাদ যে ঠিক নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের মাটিতে নিশ্চিত দুটো ডাল-ভাত খেতে পারার মতো একটি কাজের নিশ্চয়তা পেলে ওরা মরতে যেতো না। ওরা যদি এটুকু নিশ্চয়তাও পেতো সরকার সাম্যের ভিত্তিতে চাকরি দেয়, সরকার ভালো, তাহলেও এতো দ্রুত ক্রদ্ধ সাগরজলে ডুবতে যেতো না। ওরা জানে দলীয় দুর্বৃত্তের খপ্পরে চলে গেছে চাকরি-ব্যবসা। পুলিশের চাকরি পেতেও তাদের হাতে তুলে দিতে হয় আট-দশ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠেও মেধার ভিত্তিতে কোনো নিয়োগ নেই। অসাম্য করে চাকরি দিতে উপাচার্যদেরও হাত কাঁপে না এখানে। কি আশায় তারা বুক বেঁধে থাকবে এ উন্নয়নের রোল মডেলের দেশে?

কেউ যদি উন্নয়নের রোল মডেলের দেশে অসাম্যের স্টিমরোলারটা থামাতে পারতো তাহলে আমাদের হতভাগ্য প্রিয় ছেলেমেয়েদের এভাবে সাগরজলে ডুবে মরতে হতো না।

লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]