কবি মহাদেব সাহা : অসহায় বর্তমান!

আমাদের নতুন সময় : 15/05/2019

মানবর্দ্ধন পাল : বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কবি মহাদেব সাহা। বিগত শতকের ষাটের দশকে একজন প্রতিশ্রুতিশীল কবি হিসেবে তাঁর উত্থান। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন-বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে ক’জন কবি কবিতায় এবং রাজপথে, লেখায় এবং মিছিলে অকুতোভয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন, মহাদেব সাহা তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শানিত করার লক্ষ্যে, আইয়ুবীয় বায়বীয় মৌলিক গণতন্ত্র ও ভুয়া ‘উন্নয়ন দশক’-এর মুখোশ উন্মোচন করতে যেসব কবি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মহাদেব সাহা ছিলেন অন্যতম। ‘যদুবংশ ধ্বংসের আগে’ নামক তাঁর বিখ্যাত কবিতাটিতে ‘মহাভারত’-এর রূপকের মাধ্যমে আইয়ুবী স্বৈরশাসনের অনিবার্য ধ্বংসের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

কেবল তা-ই নয় পরবর্তীকাল আমাদের জাতীয় দুর্যোগ-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে বিপথগামী স্বল্পসংখ্যক ঘাতকসেনার হাতে নৃশংসভাবে নিহত হলে মহাদেব সাহা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। শিশু-কিশোর ও বড়দের মিলিয়ে তিনি শতাধিক কবিতা লিখেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। আরও অসংখ্য কবিতায় উপমা-প্রতীক হিসেবে এসেছে বঙ্গবন্ধুর কথা। এ-মুহূর্তে মনে পড়ছে তাঁর ‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম’ কবিতাটির কথা, যে কবিতায় তিনি এক বিদেশি বন্ধুকে বঙ্গবন্ধুর ছবিসংযুক্ত একটি দশ টাকার নোট দেখিয়ে চিনিয়েছিলেন-এই আমার বাংলাদেশ!

পনেরো আগস্টের শোকাবহ রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির কয়েকদিন আগে কবি মহাদেব সাহার পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর পিতৃশোক পালনকালেই ঘটে  উনিশ’শ পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টের ট্র্যাজেডি। কবি তখন একই সঙ্গে দ্বিতীয় পিতার মৃত্যুশোক পালন করেন। এই শোকস্মৃতি, ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যা, শোকের দুঃসহ আঘাতে তাঁর মনোবৈকল্য, শৈশবে স্কুলজীবনে বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দর্শন, তাঁকে নিয়ে তখন কাঁচা হাতে কবিতা লেখা ইত্যাদি ঘটনা নিয়ে তিনি  স্মৃতিকথাও লিখেছেন। মহাদেব সাহা শতাধিক কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা। এখন পর্যন্ত তাঁর কাব্যসমগ্রের ছয়টি খ- ও  চার খ-ে গদ্যসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইংল্যান্ড ভ্রমণের বর্ণনাও বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে!

তবে একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, গ্রন্থের সংখ্যাধিক্য দিয়ে আমি কবি-লেখকের গুরুত্ব বোঝাতে যাচ্ছি! মোটেই তা নয়। বরং একজন কোমল-স্বভাবী অন্তর্মুখী চরিত্রের কবি হয়েও সংকটকালে অনিবার্য সামাজিক দায়িত্ব ও দুঃসাহসী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়  দিয়েছেন কবিতা ও কলাম লিখে।

এই কবি পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারের সম্পূর্ণ টাকা তিনি তুলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির তহবিলে! পিতার একমাত্র সন্তান তিনি। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিষয়-সম্পত্তিও তাঁর কম ছিলো না! কিন্তু  সবই দান করে দিয়েছেন কিংবা হেলাফেলায় গেছে। অনেক সময় চরম উদাসীনতায় তিনি সাধা-লক্ষ্মীও পায়ে ঠেলেছেন। কাব্যলক্ষ্মীর পেছনে ছুটতে গিয়ে কাঞ্চন-লক্ষ্মীকে দুপায়ে দলেছেন। এখন নিঃস্বম্বল, নিরাশ্রয় ও সর্বত্যাগী-সর্বহারা বলতে যা বোঝায়-তিনি এখন অনেকটা তা-ই।

কবি মহাদেব সাহার দুই পুত্র-তীর্থ ও সৌধ। বড়টি সপরিবার কানাডার অভিবাসী আর সৌধ দেশেই একটি বেসরকারি কোম্পানির চাকুরে। বছর চারেক আগে সত্তরোর্ধ বয়সে তিনি ছেলের কাছে কানাডায় গেলেন এবং আর ফিরবেন না বলেই সিদ্ধান্ত নিলেন। আজীবনই থেকেছেন পরের জায়গা, পরের জমিতে। তাই পিছুটান তো আর তেমন নেই! যা আছে, তা হলো, সারা জীবন ধরে সংগ্রহ-করা কয়েক হাজার বই। তৃতীয় সন্তানের মতোই তিনি সারাজীবন এগুলো লালন করেছেন। কিন্তু  জীবনের  একটি বড় ভুল সিদ্ধান্তে তিনি জীবনের এই পরম সম্পদ সাহিত্য একাডেমি, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বাংলা একাডেমিকে দান করে যান। কিন্তু বছর তিনেক পরই তিনি সস্ত্রীক কানাডা থকে চলে আসতে বাধ্য হন। তা অবশ্য সন্তানের স্বেচ্ছাকৃত ত্রুটিতে নয়- পরিবেশ, পরিস্থিতি ও আবহাওয়ার বিরোধ-বৈপরীত্যের জন্যেই। ফিরে এসেছেন তিনি আবার সেই পরের জায়গা, পরের জমিতেই। এখন কবি মহাদেব সাহার বয়স পঁচাত্তর। স্ত্রী নীলা সাহা এবং কবি-দুজনেই এখন চরম অসুস্থ। তাঁদের   দেখভাল করার মতো, একটু সেবা-শুশ্রƒষা দেবার মতো এখন কেউ আর তাঁদের পাশে নেই। এই মুহূর্তে তাঁদের জন্যে প্রয়োজন অন্তত একজন নার্স, সেবিকা কিংবা নিদেনপক্ষে একজন সাহায্যদানকারী কাজের মানুষ—যিনি সময়মত ঔষধ-পথ্যটুকু দেবেন এবং অন্যান্য সাহায্য করবেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যার সাহায্য-সহযোগিতা-করুণা পেয়ে কতো জনই তো কতভাবে উৎরে গেল-একথা অনেকেরই জানা। চাকরি-বাকরি, পদপদবি, পুরস্কার-সম্মাননা, চিকিৎসাসেবা, আর্থিক অনুদান-কতোজনই কতোকিছু পেলেন! এমন জরাগ্রস্ত বার্ধক্যক্লিষ্ট জীবনে এখন কবি মহাদেব সাহা কি রাষ্ট্র বা বর্তমান সরকারের কাছ থেকে ন্যূনতম সহযোগিতা পেতে পারেন না! আমি মনে করি, এজন্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টিদানেরও প্রয়োজন নেই। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক একজন সেবিকা নিয়োগদান করতে কি খুব উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের দরকার?

আমার এসব আবেদন-নিবেদন মাননীয় মন্ত্রীবর্গ দূরের কথা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার চোখেও হয়তো পড়বে না! যদিও প্রশাসনসহ সুধী পাঠকমহলে মহাদেব সাহার অনুরাগী ভক্তপাঠকের সংখ্যা কম নয়! কবি মহাদেব সাহার বর্তমান দুরবস্থার কথা হয়তো অনেকেই জানেন না! বিষয়টি জাতিকে বিস্তারিত জানানোও বোধকরি এখন একটি বড় কাজ। তাই আমি আশা করবো এবং অনুরোধ জানাবো ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্মানিত সাংবাদিক বন্ধুদের প্রতি : তাঁরা যেন  উত্তরায় গিয়ে কবি মহাদেব সাহার খোঁজ-খবর নেন এবং বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন তাদের মিডিয়ায় প্রকাশ করেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]