একটি দেশকে গড়ে তুলতে হলে লাগে শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ

আমাদের নতুন সময় : 21/05/2019

কামরুল হাসান মামুন : সিঙ্গাপুর কীভাবে আজকের সিঙ্গাপুর হলো? যেই মালয়েশিয়া একসময় ছোট দ্বীপটিকে বারডেন মনে করেছিলো সেই দ্বীপ কীভাবে এতো ঢ়ৎড়ংঢ়বৎড়ঁং জাতিতে রূপান্তরিত হলো? তার পেছনে একজন মানুষের স্থপতি হিসাবে আবির্ভূত হওয়াতেই আজকের সিঙ্গাপুর হওয়ার গোড়াপত্তন হয়েছিলো। ব্যক্তিটির নাম খবব কঁধহ ণব!ি ইনি লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স থেকে পাস করা। পরবর্তীতে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজউইলিয়াম কলেজ থেকে গ্রাজুয়েট হন। এরপর ব্যারিস্টারি পাস করে কিছুদিন ল প্রাকটিসও করেন। তারপরই আবির্ভূত হন সিঙ্গাপুরকে বদলে দেয়ার কারিগর হিসাবে। শুরুর কালে আবাসন ও শিক্ষায় যবধারষু মনোনিবেশ করেন। ঠিক একই কথা খাটে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে। এখানেও একজন ব্যক্তি চধৎশ ঈযঁহম ঐবব যিনি আজকের দক্ষিণ কোরিয়া সৃষ্টির কারিগর। তিনিও দুটো কাজ দিয়ে শুরু করেছিলেন : ল্যান্ড রিফর্ম আর শিক্ষা। একই কথা খাটে মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে। যেই ব্যক্তিটি আজকের মালয়েশিয়া সৃষ্টির পেছনের কারিগর তিনি হড়হব ড়ঃযবৎ ঃযধহ ড. মহাথির। এর কথাটি না হয় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক নজরুল ইসলামের লেখা থেকেই জানুন।

‘মাহাথির মালয়েশিয়ার রোগ সারার জন্য সর্বাগ্রে নজর দেন শিক্ষার উপর। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রনায়কই তা করেন। কারণ শিক্ষায় যদি রোগ থাকে, গোটা সমাজ রোগাক্রান্ত হয়। শিক্ষাটা ঠিক থাকলে পুরো সমাজের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এশিয়ার জাপান এবং কোরিয়ার দিকে তিনি নজর দিলেন। লুক ইস্ট পলিসির ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে শিক্ষা বিনিময় (এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ) শুরু করলেন। মানে কি? তিনি খুব ভালোভাবে বুঝলেন, মালয়েশিয়ানদের এবং বিশেষ করে মালেদের শিক্ষিত না করতে পারলে কিছুই হবে না (প্লিজ, ভাববেন না, এটা কেবল বিএ, এমএর সার্টিফিকেটমুখী শিক্ষা)। জাপানের সঙ্গে চুক্তি করলেন : মালয়েশিয়ার ছাত্ররা জাপানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সায়েন্স, টেকনোলজি, বিজনেস, হিউম্যানিটিজ, সোশ্যাল সায়েন্স শিখবে। স্কলারশিপ দিয়ে এসব ছাত্রদের জাপানে পাঠালেন। শর্ত দিলেন, তাদের দেশে ফিরে এসে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে জাপান থেকে টেকনোলজিস্ট, শিক্ষক নিয়ে আসলেন মালয়েশিয়ায়। জাপানি এসব শিক্ষকদের মালয়েশিয়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অ্যাটাচড করে দিলেন। মালয়েশিয়ার বাচ্চারা, শিখো। দেশটা তোমাদের। তোমাদেরই তা গঠন করতে হবে। আজকাল দেখি আমাদের সাংবাদিক ভাইয়েরা, বাংলাদেশের সরকার প্রধান চীন বা কোরিয়ায় একবার সফর করলেই নাম দেন ‘লুক ইস্ট পলিসি’। তাজ্জব ব্যাপার! মাহাথিরের লুক ইস্ট পলিসি এতো ঠুনকো ছিলো না।’

নজরুল ইসলাম আরো লিখেন ‘তিনি কি করলেন? একটা আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করলেন। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া বা সংক্ষেপে আইআইইউএম (১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত)। উল্লেখ করার বিষয়, তিনি বিদেশের (বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকার) নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অধ্যাপক, গবেষকদের নিয়ে আসলেন। মালয়েশিয়ার ছাত্র-ছাত্রীদের স্কলারশিপ দিয়ে বিদেশে তো পাঠালেনই, যারা বিদেশে যেতে পারেনি, তাদের বিদেশি নামকরা প্রফেসরদের দিয়ে দেশেই পড়ানোর ব্যবস্থা করলেন। মালয়েশিয়ায় একটা প্রবাদ আছে, ‘মালেজ আর বর্ন উইথ স্কলারশিপ’ (মালেরা বৃত্তি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে)। মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশি, বিদেশি এই অধ্যাপকেরা আজকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া এখন একটা নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়। ধর্মকে সঙ্গে নিয়েই যে উন্নয়ন করা যায় (ইন ফ্যাক্ট, যে সমাজে অধিকাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করে, সেখানে আপনি তাদের চিন্তা ও বিশ্বাসকে এক্সক্লুড করে ভালো কিছু করাটা কেবল ইম্প্রাক্টিক্যালই নয়, ইম্পসিবল), মাহাথির তার বলিষ্ঠ প্রমাণ।’

এতোক্ষণ পড়ে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন একটি দেশকে গড়ে তুলতে হলে কি লাগে? আমার দেশে কি এসব পরিবর্তনের কোনো ছিটেফোঁটাও দেখছেন? এখনও আমাদের নেতারা বক্তৃতার ৭৫ শতাংশ ব্যয় করে অন্য দলকে গালিগালাজ করে। এখনও নেতারা ডিভাইড এন্ড রুলের ভিত্তিতে দেশ শাসন করছে। শিক্ষার মান একদম ধসেখসে পড়ার উপক্রম। কিন্তু সেটা যেন জনগণ বুঝতে না পারে তারজন্য জিকিরের ব্যবস্থা করেছেন। মানুষকে একধরনের জিকিরে ব্যস্ত রেখে আরেক দল হায়েনাদের দেদারছে লুটপাটের সুবিধা করে দিচ্ছেন। উন্নয়নের পেছনে কোনো মহাপরিকল্পনা নেই, কোনো ভিশন নেই। আমরা এই যে বিরাট জনসংখ্যা নিয়ে ছোট একটি দেশে কীভাবে বাস করবো তার জন্য যে প্রথম দরকার ল্যান্ড রিফর্ম আর এই রিফর্ম বোঝার জন্য চাই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। আমাদের এই মুহূর্তে দরকার ল্যান্ড রিফর্ম আর বড় আকারে শিক্ষায় বিনিয়োগ। শুধু বিনিয়োগ করলেই হবে না সেটা সুষ্ঠুভাবে ব্যয় হচ্ছে কিনা সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

চীনের উন্নতির পেছনেও সেই শিক্ষায় যবধারষু বিনিয়োগই দায়ী। ক’টা উদাহরণ দিলে পরে বুঝবেন শিক্ষাই হলো শেষ কথা। এইটা ঠিক না হলে দেশ অমানুষে ভরে যাবে। অমানুষ দিয়ে মানুষের বাসযোগ্য দেশ বানানো সম্ভব নয়। সামনে বাজেট আসছে। জনগণকে এখনই আওয়াজ তুলতে হবে শিক্ষায় যেন জিডিপির ন্যূনতম ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়। এটাই আমাদের পরিবর্তনের সূচনা করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এই বরাদ্দের একটি অংশ দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি এক্সপার্ট উচ্চমানের শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের দেশে বসেই বিশ্বমানের শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করুন। এর ফলে আমাদের মধ্যেও একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ দেবে যার ফলে আমরাও নিজেদের আরো ভালো হওয়ার ড্রাইভ অনুভব করবো। শিক্ষায় উন্নতি না করলে শিক্ষিত ভালো মানের মানুষ পাবো না। ভালো মানের শিক্ষিত মানুষ কেবল দেশ বদলের সুফল বোঝার দূরদৃষ্টি তৈরি হবে। বর্তমানের পচা গান্ধা শিক্ষক দিয়ে আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে কোনোদিন পৌঁছতে পারবো না। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]