পদ্মা সেতু নিয়ে শিশু বলিদানের গুজব : নতুন ষড়যন্ত্র?

আমাদের নতুন সময় : 25/05/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : বাংলাদেশে কখন যে কি নিয়ে ভয়ানক গুজব ছড়িয়ে এমন সব অপকর্ম সংগঠিত করা যায় তা আগে থেকে ভাবা খুব কঠিন। নিকট অতীতে এমন গুজব ছড়িয়ে দেশে মানুষ হত্যার নানা রকম পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিলো। তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশকিছু মানুষের জীবন ও সম্পদের হানি ঘটেছিলো। এসব ঘটনার পেছনে গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে চম্পট দেয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ এবং আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা। গত কয়েকদিন একটি মহল বেশ সুপরিকল্পিতভাবে গ্রামে-গঞ্জে পদ্মা সেতু নিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধারে নেমেছে। বিভিন্ন জায়গায় এরা প্রচার করছে যে, বর্তমানে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগেই যদি পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশু বলিদান সম্পন্ন করা না হয় তাহলে সেতুটি কার্যকর করা যাবে না, সেতুটি শিশুর রক্ত ছাড়া মানুষ পারাপার করতে দেবে না! মনে হয় যেন সেতুটির প্রাণ আছে, সেটিই কারো কাছে শিশুর প্রাণ বলিদানের দাবি করেছে! এ ধরনের বিশ্বাসগুলো খুবই সেকেলে। আগে মানুষ বড় কিছু দেখলেই এমন একটি কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতো। এর কারণ হচ্ছে মানুষ কোনো বড় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার পর এর প্রতিষ্ঠা নিয়ে বাস্তব কোনো জ্ঞানগত ধারণা জানতো না।

আমাদের দেশে অনেক আগে আমরাও শুনতাম অমুক ব্রিজ চালু করতে হলে শিশুদের বলি দিতে হবে। ব্রিজটি ১০১টি শিশুর মাথা চেয়েছে! এমন প্রচারটি স্বপ্নজাত বলে দাবি করা হতো। তবে আদৌ শিশু বলিদান হতো কিনা সেটি কেউ জানতো না। কিন্তু কিছু কিছু শিশু এই ফাঁকে অপহৃত হতো। সেটিকে চালিয়ে দেয়া হতো সেতুটির সন্তুষ্টির জন্য শিশুর জীবন উৎসর্গের বিষয় হিসাবে। আসলে এর মাধ্যমে অপহৃত শিশুর ব্যাপারে অভিভাবকরা যেন তালাশ না করে কিংবা থানা পুলিশ না দৌড়ায়। অভিভাবকরা বিষয়টিকে যেন একটি প্রকৃতির বিধান হিসাবে বিশ্বাস করে নেয়, মেনে নেয়। আসলে এ ধরনের বিশ্বাস আদিম মানব সমাজে পরিলক্ষিত হতো। প্রায় প্রতিটি গোত্র এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন সভ্যতায় দেব-দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য যুদ্ধবন্দিদের হত্যা করা হতো, আবার অনেকে নিজের রক্ত ও জীবন উৎসর্গ করে দেবতার পরিতুষ্টি লাভের কথা বিশ্বাস করতো। বিষয়গুলো একেবারেই কুসংস্কারের আচার বলে বিবেচিত হলেও পরবর্তী দীর্ঘ সময়েও মানুষের মন থেকে প্রাচীন এসব বলি প্রথার অন্তর্নিহিত রহস্যের অনন্মোচিত বিশ্বাস চলে এসেছে। আমরা আধুনিক যুগে বসবাস করলেও কুসংস্কারের অন্ধবিশ্বাস থেকে অনেক মানুষেই মুক্ত হতে পারিনি। যারা পারেনি তারা অতীত ইতিহাসের নানা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কার্যকারণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং এগুলোর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে খুব বেশি আধুনিক জ্ঞানও তাত্ত্বিক ধারণা লাভ করতে পারেন না। সে কারণেই আমাদের এই সমাজেও অনেক বড় বড় তথাগতিত শিক্ষিত মানুষ ‘ন্যাংটা ফকির’ কিংবা ‘শিশু ফকির’ কিংবা ‘স্বপ্নজাত ফকিরে’র কেরামতি বিশ্বাস করে দলে দলে তার কাছ থেকে দাওয়ান্তে এসি গাড়ি করে অজপাড়াগায়ে চলে যায়! এ ধরনের আরো অসংখ্য বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অথচ এগুলোর পেছনে থাকে কোনো না কোনো মহলের অর্থ আদায়ের নানা কৌশল, প্রাপ্তির নানা আঁকাবাঁকা পথ।

কিছুদিন পর অনেকেই ওইসব ফকিরের দাওয়ার সুফল না পেয়ে সে পথ আর মাড়ান না। কিন্তু ততোদিনে ওই ফকির এবং তার চারপাশের স্বার্থ উদ্ধারকারীরা ভালোই অর্থ উপার্জন করে নেন। এমন অন্ধবিশ্বাসের পেছনে যে প্রতারণা জড়িত আছে তা জানা সত্ত্বেও অনেকেই নতুন কোনো প্রচারে পা দিতে মোটেও দ্বিধা করেন না। আসলে আমরা আধুনিক যুগে বসবাস করলেও বিচার-বিশ্লেষণে আমরা এমন আদিম যুগের কুসংস্কার, প্রথা ও বিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে এখনও খুব একটা মুক্ত হতে পারেনি। এর অসংখ্য নজির থাকার পরও পদ্মা সেতুকে নিয়ে এমন এক কল্পকাহিনী দেশের গ্রামে-গঞ্জে গত কয়েকদিনে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যা নিয়ে রীতিমতো অভিভাবকদের অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেছেন। এই অপপ্রচারের কয়েকটি লক্ষ্য স্বার্থান্বেষী মহলের রয়েছে বলে আমাদের মনে হয়। প্রথমত, পদ্মা সেতু নিয়ে একটি মহলের অসন্তুষ্টি রয়েছে। তারা কিছুতেই এমন একটি মেগা প্রকল্প বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার বাস্তবায়ন করুক এটি মেনে নিতে পারছে না বলে মনে হয়। মূলত এমন মানসিকতাকে পরশ্রীকাতরতা এবং তাদের মনোবৈকল্যের বিষয় বলেই মনোবিজ্ঞানীরা অভিহিত করবেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা মোটেও কম নয়। তারা পদ্মা সেতু প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেও গ্রামে-গঞ্জে প্রচার করে বেড়িয়েছিলো যে, এই সেতু থেকে অমুকে-তমুকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ফেলেছে।

শেষ পর্যন্ত এই সেতু বাংলাদেশ কোনোদিনই দেখবে না। কারণ টাকা-পয়সা দেশে-বিদেশে সব বণ্টন হয়ে গেছে। মনে হয় যেন তারা সবকিছু দেখেশুনেই এমনভাবে টাকা-পয়সার অঙ্কের হিসাব মানুষের কাছে বলে বেড়াচ্ছিলেন। সেটি তো শেষ পর্যন্ত বোঝা গেলো যে, এমন একটি সেতু বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের হাত দিয়ে হোক তা যারা মানসিকভাবে গ্রহণ করতে পারছিলো না তারা বা তাদের সমর্থকরা দেশব্যাপী প্রচারে নেমেছিলো। তারা মানুষের মধ্যে একটি ভয়ানক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির লক্ষ্যেই অপপ্রচারটি করেছিলো। সেটি সফল হয়নি। এখন পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আর কয়েকমাস পরেই বোঝা যাবে এর উদ্বোধনের দীনক্ষণ। সুতরাং এমন একটি সময়ের আগে পদ্মা সেতু শিশুদের জীবনের বিনিময়ে কার্যকর হবে এমন প্রচারণা যদি দেশে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে সাধারণ মানুষ পদ্মাসেতুর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠতে পারে। সরকারের বিরুদ্ধেও জনমত তৈরি হতে পারে। বিষয়টি এমন, ‘কোথাকার কোন পদ্মা সেতু, এর জন্য আমার সন্তানের জীবন দিতে হবে, তার চেয়ে পদ্মা সেতুর আমার দরকার নেই, আমার সন্তান নিয়ে আমি হাভাতে থাকি’। দ্বিতীয় কারণটি হলো এমন একটি প্রচারণা চালিয়ে স্বার্থোদ্ধারকারীরা শিশু অপহরণে নেমে পড়তে পারে, মুক্তিপণ দাবি করতে পারে, মানুষের কাছ থেকে টাকা-পয়সা নানাভাবে হাতিয়ে নিতে পারে। অনেকেই তার সন্তানকে সেতুর হাত থেকে রক্ষার জন্য এখানে-সেখানে টাকা দেয়ার মানত করতে পারে। এমনসব স্বার্থোদ্ধারের পরিকল্পনা এঁটেই বিশেষ বিশেষ মহল এমন প্রচারে গ্রামাঞ্চলে নেমেছে বলে মনে হয়। একইসঙ্গে তারা এই শিশুদের অপহরণে মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গাদের নামও ব্যবহার করছে। দেখা যায় এখানে এক ঢিলে বুহু পাখি মারার অপকৌশল, ফন্দিফিকির আর উদ্ভট কুসংস্কারের প্রচার-প্রচারণা।

সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এসব স্বার্থান্বেষী মহলের বিরুদ্ধে এখনই দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করলে বিষয়টি নিয়ে দেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং তাদের উচিত এসব অপশক্তির অপকর্ম শুরুতেই বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া।

লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]