ভারতের আলোড়ন জাগানো শব্দ এনআরসি

আমাদের নতুন সময় : 25/05/2019

কলকাতা থেকে অনিন্দ্র মাঝি ও রুমা ব্যানার্জী’র সহযোগিতায় অসীম সাহা

বর্তমান ভারতে সব থেকে আলোড়ন জাগানো শব্দ হলো এনআরসি। ন্যাশনাল রেজিস্টার্ড সিটিজেন। এটারঅনেকের কাছেই একটা প্রশ্নচিহ্নের মতো। তাই বলে রাখা ভালো, এটা ভারতীয় নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় পঞ্জী, আরো ভালো করে বললে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা প্রকাশিত নাগরিকত্ব নিয়মাবীল-২০০৩। নিয়ম মতে এটি এমন একটি পঞ্জী যেখানে ভারত ও ভারতের বাইরে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের বিশদ বিবরণ থাকবে।

একজন ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় কী?

ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন অনুসারে, একজন ব্যক্তি একজন ভারতীয় নাগরিক, যদি তিনি ২৬ নভেম্বর, ১৯৪৯ সালে সংবিধান পরিষদের সংবিধান গ্রহণ করেন বা সে তারিখ পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে ভারতবর্ষে থাকেন।

সংবিধান গ্রহণের পর জন্মগ্রহণকারীদের জন্য, ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ জন্ম তারিখের ওপর ভিত্তি করে নাগরিকত্ব প্রদান করে :

(র) ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ এবং ১ জুলাই ১৯৮৭-এর মধ্যে জন্মগ্রহণকারী যে কোনো নাগরিক দ্বারা জন্ম হয়;

(রর) ১ জুলাই ১৯৮৭ পথকে ৩ ডিসেম্বর ২০০৪-এর মধ্যে জন্মগ্রহণকারী একজন ব্যক্তি, যদি তার বাবা-মা কোনো নাগরিক হন, তবে সে জন্মের মাধ্যমে নাগরিক হয়;

(ররর) ৩ ডিসেম্বার ২০০৪-এ বা তারপরে জন্মগ্রহণকারীরা একজন নাগরিক, যদি উভয় বাবা-মা সেই সময়ে ভারতের নাগরিক হন অথবা একজন বাবা-মা নাগরিক হন এবং অন্যকোনো অবৈধ অভিবাসী (বিদেশি যিনি বৈধ না হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন) নথি, বা অনুমোদিত সময়ের বাইরে থাকেন।)।

এখন প্রশ্ন হলো ভারতবর্ষের এনআরসির প্রয়োজনীয়তা কোথায়?

কারণ

এক-জনবিস্ফোরণের ভয়।

দুই-আদি অধিবাসী ও অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে আর্থিক ভারসাম্যহীনতা।

তিন-অনুপ্রবেশকারীর ছদ্মবেশে জঙ্গি অনুপ্রবেশ ঠেকানো।

চার-বর্তমান ভারতীয় অধিবাসীদের (অনুপ্রবেশকারী বাদে) কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটানো।

এনআরসি কিছুদিন আগেই আসামে আপডেট করা হয়েছে, যারা সেই ব্যক্তি বা তাদের বংশধর, যারা ১৯৫৫ সালে এনআরসি অথবা ২৪মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যরাত পর্যন্ত নির্বাচনী নিয়মে বা তার আগে ভারতের আসামে বা ভারতের ে কানো অংশে তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করতে পেরেছেন।

এনআরসি আপডেটের উদ্দেশ্য ২৪মার্চ ১৯৭১-এর মধ্যরাতে ভারতীয় অঞ্চলগুেিলাতে প্রবেশকারী উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করা।

অবৈধ অভিবাসীদের ধারাবাহিক বৃদ্ধির ব্যাপারে গুরুত্বের বিষয়টি বিবেচনা করে, ভারত সরকার অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) আইন, ১৯৫০ প্রণয়ন করতে শুরু করে।

এদিকে আসামরাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশের ব্যাপারটিও ভয়াবহ ।

১৯৪৮ থেকে ১৯৭১-এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আসামে বড় আকারের স্থানান্তর ঘটেছিলো। বাংলাদেশ থেকে আসামে অবৈধ অভিবাসীদের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ফলে ১৯৭৯ সালে ছাত্রনেতারা অসম থেকে অবৈধ অভিবাসীদের আটক, বিতাড়িতকরণ এবং নির্বাসনের দাবিতে প্রচ- বিক্ষোভের সম্মুখীন হন।

১ জানুয়ারি ১৯৬৬ নির্ধারিত তারিখ থেকে নির্ধারিত ছিলো, যার ভিত্তিতে আসামের অবৈধ অভিবাসীদের আটক ও মুছে ফেলা হবে। তবে, অ্যাকর্ডটি স্থানান্তরিত হওয়ার এবং স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেও অভিবাসীদের শনাক্তকরণ ও বহিষ্কারের প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো ঘটেনি।

২০১৩ সালে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি রঞ্জন গগৈ এবং বিচারপতি রোহিন্তান ফালি নরিমানের বেঞ্চের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারকে নাগরিকত্ব আইন, ১৯৫৫-এর অনুসরণে তা বাস্তবায়নের জন্য এনআরসি আপডেটের নির্দেশ   দন।

এখন জাতীয় নির্বাচন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি এবং তার ফলে এনআরসি দ্বারা প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের রেকর্ড করতে এবং অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করতে ইচ্ছুক।

সীমান্তবর্তী বেশিরভাগ অঞ্চল, প্রাথমিকভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের সমস্যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বর্তমানে আসামেই শুধুমাত্র এনআরসি প্রয়োগ করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের ফলে জনসংখ্যা পরিবর্তিত হয়েছে।

ভারতের জনসংখ্যার আকার বিবেচনা করে, এনআরসি বাস্তবায়ন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জিংয়ের কাজ এবং এর সম্মুখীন হওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর বিশদ বিশ্লেষণ দাবি করে।

কূটনৈতিক ও সীমান্তব্যবস্থাপনা প্রচষ্টার মতো প্রতিষ্ঠিত পদক্ষেপ কোনো ফলাফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

এর জন্য দুটি প্রধান কারণ হলেঅ :

১) বাংলাদেশ তার ভূখ- থেকে ভারতকে যে কোনো অনুপ্রবেশের স্থান গ্রহণ করতে দিতে পারে না;

২) ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পার্শ্ববর্তী সীমান্ত কার্যকর সীমানাব্যবস্থাপনা বাধা দেয়। বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঘটাতে বিকল্প সমাধান দরকার। তাই এনআরসি একা কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে কিনা, সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে।

এনআরসির সমালোচনা এবং এত বড়সংখ্যক অনুপ্রবেকারী মানুষের ক্ষোভের ফলে এনআরসির বাস্তবায়ন আজ ধাক্কা খেয়েছে।

অনুপ্রবেশকারী মানুষদের নামের তালিকা পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, তারা ভয়ানক হতে পারে এই ভয় থেকে।

উদ্বেগজনক এটাও যে, তাদের ভাগ্য নির্ধারণে কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বিব্রতকর, বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ নাগরিক হলে  সেই লোকদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া উচিত। কতার জন্যে সংশ্লিষ্ট দেশের সহযোগিতার দরকার হবে। ঢাকা অনুপ্রবেশের ব্যাপারে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে তারা ফিরিয়ে নিতে রাজি হতে পারে না, যা অফ রেকর্ডেড। কারণ সেটা করলে বাংলাদেশকেও একইভাবে বিপুল জনতার বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে।

ধাক্কা-প্রতিরোধের বিকল্পটি ভ্রমণ-প্রতিরোধে সহায়ক বা সহায়ক নয়। পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা দিকনির্দেশ করে যে,  রেকর্ড করা লোকদের ধাক্কা দেওয়া হয়েছিলো এবং তারা কয়েকদিনের মধ্যে আবার ফিরেও এসেছিলো।

এই ব্যাপারে ভারসাম্যহীনতা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উভয় প্রতিবেশীই এই আপাতক্ষতিকে এড়িয়ে চলতে চায়।

এতো বড়সংখ্যক মানুষের ক্ষোভের ফলে এনআরসির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে। অনেক দল ও নেতার প্রতিবাদ সত্ত্বেও, বিজেপি ঘোষণা করেছে, তারা সীমান্তবর্তী জেলাতেই এনআরসি বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর।

তবে, এনআরসি জাতীয়ভাবে বাস্তবায়ন করার সময়, ভারতীয় নাগরিকত্বের কাট-অফ তারিখটি চূড়ান্ত করার জন্য সতর্ক আত্মনিরোধ প্রয়োজন। আসামের ক্ষেত্রে, নাগরিকত্বগুলো ২৫মার্চ থেকে বাস্তবায়ন করা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থীরা আসামে আসেন এবং ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পরেও আসেন। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বিপুলসংখ্যক হিন্দু এসেছিলো, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা অঞ্চলে। বিভিন্ন অঞ্চলে। উদ্বেগের ব্যাপার এই যে, আসামের মতো একটা প্রদেশের সাথে সাথে বাকি দেশের জন্যও এনআরসির আবেদন করা যেতে পারে কিনা?

সিএবি’র ওপর বিতর্কবিন্দুতে একটি মামলা। কারণ কেউ কেউ মনে করেন, এনআরসি প্রবর্তনের ভয় গুরুতর আইন-শৃঙ্খলা সমস্যাস তৈরি করতে পারে।

এনআরসির সাফল্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাবিকাঠি হবে। রাজ্য সরকারগুলোর সমর্থন অতীব গুরুত্বপূর্ণ, আর এনআরসি-তে একমত হওয়া একটি চ্যালেঞ্জ হবে। ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্য সরকার এই বিষয়ে বিরূপতা প্রকাশ করেছে। চলমান নির্বাচনে বিজেপির নির্বাচনীভাগ্য দেশজুড়ে এনআরসি বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]