• প্রচ্ছদ » » ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির জয়জয়কার দেখে প্রমাণিত হয় সংবিধানে থাকলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যায় না


ভারতের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এবং সেই রাজনীতির জয়জয়কার দেখে প্রমাণিত হয় সংবিধানে থাকলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যায় না

আমাদের নতুন সময় : 25/05/2019

কামরুল হাসান মামুন

ভারতে সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনের ফলাফল শেষে নির্বাচনে জেতাদের ভারতজুড়ে যে উল্লাস দেখছি তার সঙ্গে বাংলাদেশের গত নির্বাচনের শেষে জয়ীদের মেলালে কেন জানি মিল পাচ্ছি না। জয়ের আনন্দ তখনই যখন জয়টা চ্যালেঞ্জিং হয়, যখন জয়টা কষ্ট করে পাওয়া হয়, যখন জয়টা কলুষমুক্ত হয়। যাহোক ভারতের নির্বাচনের কথা বলছিলাম। ভারতের সংবিধানে আছে, ভারত রাষ্ট্র হলো সেক্যুলার বা ধর্মনিরেপেক্ষ রাষ্ট্র। সেই ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি আর সেই রাজনীতির জয়জয়কার দেখে প্রমাণিত হয় সংবিধানে থাকলেই সব কিছু ঠিক হয়ে যায় না। ব্রিটেনের তো ওরকমভাবে কোনো লিখিত সংবিধানই নেই। আর আমাদের বাংলাদেশের সংবিধান দেখলে মনে হয় এটা না ধর্মীয় রাষ্ট্র, না ধর্মনিরেপক্ষ রাষ্ট্র, না গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, না সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যদিও ‘না স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ এটাও ওই বাক্যে যোগ করতে পারলে ভালো লাগতো। যোগ করতে গিয়েও কেন জানি সন্দেহ হলো তাই আলাদা করে লিখলাম। দেখুন তো আবারো বাংলাদেশের প্রসঙ্গে চলে গেছি।
এতো বড় একটি গণতান্ত্রিক দেশ যার অর্থনীতি এতো বিকাশমান সেই দেশটির মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামির এই জয়জয়াকার সত্যিই আশ্চর্যের। একটি দেশ এবং দেশের মানুষ যতো উন্নত হয় ততোই তারা নানা ধর্মের ও নানা বর্ণের মানুষজন একসঙ্গে পাশাপাশি থাকতে শিখে এবং তার সৌন্দর্য এপ্রিসিয়েট করতে শিখে। আমার ধারণা ভারতের একটি গোষ্ঠী শিক্ষা, দীক্ষা ও টাকা-পয়সায় ভীষণ উন্নতি করেছে এবং সেই উন্নতির কিছুটা ছিটেফোঁটা সাধারণ যাদের আমরা ‘গণ’ বলি তারা পেয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে তাদের চিন্তার উৎকর্ষতা ঘটেনি এবং বিপত্তিটা এখানেই।
এই বিজয়টা হয়েছে আসলে সেই ‘গণ’দের। চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের একটি বক্তব্যের কথা মনে পড়েছে। ‘তথাকথিত ‘গণ’ কখনো কোনো কিছুকেই তলিয়ে ভাবে না। যখন তারা ঠিক করে না তখন তো জানেই না কোনটা আসলে ঠিক আবার যখন ঠিক করে তখনো সে জানে না সে কেন ঠিক করছে, এখানেই মূল বিপদ, গণ যে সবসময় ভুল বলছে তা নয়, সবসময় ঠিক তো বলছেই না, কিন্তু ঠিক বলুক বা ভুল বলুক, না জেনে, না বুঝে, না ভেবে বলছে বা করছে’। তিনি আরো বলেছেন ‘বানরকে প্লেন চালাতে দিলে কখনো কখনো ঠিক বাটন টিপে দেবে, কিন্তু তাই বলে বানরকে প্লেন চালাতে দিলে তো সর্বনাশের মাথায় বাড়ি’।
আসলে ‘গণ’ মানে হলো গড় মানুষ। একটি দেশকে উন্নত করতে হলে গণতন্ত্রকে উন্নত করতে হলে এই গড়ের উন্নতি সাধন করতে হবে। আর না হয় গণরা গড্ডালিকার ¯্রােতে চলবে বা ঝাঁকে চলবে। গড্ডালিকায় বা ঝাঁকে যারা চলে তারা দূরের চিন্তা করতে জানে না। তারা কিছু দেখে না। তারা কেবল তার নিজের এবং একদম নিজের আশপাশ দেখে। সেজন্য রিয়ালিটি শো গণের ভোটে কে সেরা গায়ক সেটা নির্বাচন করলে সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ তারা হয়তো চেহারার সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দেবে অথবা গরিবের সন্তান বলে সিম্প্যাথিকে বেশি গুরুত্ব দেবে। তাই গণ নিয়ে আমার সবসময়ই সন্দেহ ছিলো বা আছে। তবে এই ত্রæটিকে সরানো যায়। গণ যেহেতু গড় মানুষ সেহেতু আমরা যদি এই গড়ের উন্নতি ঘটাতে পারি গণতন্ত্র কেবল সেখানেই কার্যকর হবে। সত্যিকার গণতন্ত্রের জন্য আমাদের উপমহাদেশের দেশগুলো এখনো তৈরিই হয়নি। গড়ের মানকে উপরে উঠাতে হবে। অর্থাৎ গড় মানুষদের শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত না করলে গণতন্ত্র চলবে না। কারণ অল্প শিক্ষিত গণরা প্রবৃত্তি দিয়ে চলে মাথা খাটিয়ে নয়। মাথা খাটাতে হলে মাথা তো থাকতে হবে। তাই ভালো মানের শিক্ষায় শিক্ষিত ছাড়া একটা দেশ প্রকৃত উন্নত হতে পারে না।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফলাফলে। যেখানে একসময় বামরা রাজত্ব করেছে সেখানে মাত্র এক-দেড় দশকের ব্যবধানে এদের ধস আর ধর্মীয় উগ্রবাদের জয়জয়াকার। ভারতের অন্য যেকোনো রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে কলকাতার শিক্ষিত মানুষরা সর্বদাই একটু উদার বামঘেঁষা ছিলেন। এদের এতোই প্রভাব ছিলো যে, এরাই গণদের আচার-আচরণ নির্ধারণ করতেন বা গণরা এদের অবচেতন মনেই তাদের অনুসরণ করতো। কিন্তু আমার ধারণা ওই শিক্ষিত উচ্চবিত্ত শ্রেণিটা এখন গণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। তারা হয়তো বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে ফলে অন্যান্য রাজ্যের মতো গণরা এখন সত্যিকারের গণ হয়ে উঠেছেন।
এই বিশ্লেষণ আমাদের বাংলাদেশেও প্রযোজ্য। আমাদের বাংলাদেশেও যারা রাজনীতি করেন তারা এখন আসলে গণবিচ্ছিন্ন। গণের কল্যাণে রাজনীতি করেন না। বর্তমান কৃষকদের কথা চিন্তা করলেই বোঝা যায়। আমাদের রাজনীতিবিদরা কি জানতেন না যে, চাল আমাদের যথেষ্ট আছে? তারা কি জানতেন না আমাদের চাল আমদানি করা ঠিক নয়? সবকিছু জেনেবুঝেই করে কৃষকের সর্বনাশ করতে উদ্যত হয়েছে। এখন যখন দেখছে সর্বনাশের মাথায় বাড়ি। কৃষকরা তো জেগেছে! তাই কয়েকদিন আগে সংসদীয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় চাল আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে। কেন আগে করেননি? কারণ গণকে আপনারা তোয়াক্কা করেন না। ভয় হয় ভারতের মতো এতো বড় একটি বিশাল দেশে এই ধর্মীয় উন্মাদনার ঢেউ আমাদেরও লাগে কিনা। আসলে লেগেছে তো আগেই। বিজেপির এতো বড় উত্থান দেখেই আমাদের সরকার বুঝতে পেরেছে এই ধর্মীয় উন্মাদনার লাভটা অন্য কোনো ধর্মীয় ডান দল নেয়ার আগে নিজেরাই একটু শিফট হয়ে নিজের ঘরে উঠাই। বর্তমান আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নেই। সেটা স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের কাররিকুলাম দেখলেই আঁচ করা যায়। তাছাড়া বিজেপির স্ট্র্যাটেজি ‘সবকা সাথ… সবকা বিকাশ’! অর্থাৎ উন্নয়ন যেটা আমাদের সরকারও একই ¯েøাগান ব্যবহার করেছে। গণমানুষদের যদি সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ ভাবতো তাহলে এ রকমের চিপ ¯েøাগান ব্যবহার করতো না। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]