মিলিয়ন বছরের ঘুমন্ত জীবের পুনরুত্থান

আমাদের নতুন সময় : 27/05/2019

এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ কতো বছরই বা বাঁচতে পারে? গড়ে ৬০-৬৫ বছর। কিছু প্রাণী এর থেকেও কম সময় বাঁচে। আবার নীল তিমি প্রায় পাঁচশো বছর বাঁচে। সেখানে কোনো জীব মিলিয়ন বছর বাঁচতে পারে, এটা সাধারণের কল্পনার বাইরে। তবে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় কল্পনার বাইরের এসব তথ্যই বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে।
ড. রাউল কানো একজন আমেরিকান মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন স্বনামধন্য প্রফেসর। প্রাচীন নমুনা থেকে অণুজীবের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে গবেষণা করা, তা থেকে জীবনের রহস্য বের করা ও অন্যান্য জীবের সঙ্গে পারস্পরিক কি কি বৈশিষ্ট্যগত মিল আছে, তা নিয়ে গবেষণা করাই তার নেশা। একবার তিনি মেক্সিকো ও ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে কয়েকটি অ্যাম্বার সংগ্রহ করলেন গবেষণার জন্য।
অ্যাম্বার হলো গাছের রেজিন (আঠা জাতীয় পদার্থ)। প্রায় চল্লিশ লাখ বছর আগে হুলবিহীন একপ্রকার মৌমাছি (এখন বিলুপ্ত) মৌচাক তৈরির জন্য এসব রেজিন সংগ্রহ করতো। রেজিনগুলো পরবর্তীতে শক্ত হয়ে গিয়ে অ্যাম্বারের ক্রিস্টালে পরিণত হতো। ফলে মৌমাছি তার ভেতর আটকা পড়ে যেতো। মৌমাছির পেটে স্বভাবতই এক প্রকার অণুজীব থাকে। এদের নাম ইধপরষষঁং ংঢ়যধবৎরপঁং, এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া। মৌমাছি হাবিজাবি যা খায় তা পরিপাকে এরা সাহায্য করে। পাশাপাশি মৌমাছির কাছে আশ্রয় পায় ও অতিরিক্ত পুষ্টি, যা মৌমাছির লাগে না, তা এরা গ্রহণ করে। অর্থাৎ উভয়ই উপকৃত হয়। এদের এই ভালোবাসাকে বলে মিথোজীবিতা।
তিনি প্রথমে এর বয়স মাপলেন। ২৫-৪০ মিলিয়ন বছরের কাছাকাছি কোনো একসময়ের অ্যাম্বার ছিলো এটা। তিনি এটা ছিদ্র করে দেখলেন, ভেতরে মরা মৌমাছি। তাও তিনি থামলেন না। মৌমাছির পেট কেটে, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে অন্ত্র পর্যবেক্ষণ করলেন। দেখলেন গোল গোল স্থির কি জানি দেখা যায়। তিনি এগুলো আলাদা করলেন, তারপর এগুলো একটি কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। পরবর্তীতে তিনি অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলেন ওগুলো স্থির নেই, নড়ছে। কাহিনী কি? তারপর আরো কয়েকটি অ্যাম্বার ছিদ্র করে তিনি একই কাজ করলেন, ফলাফল একই। এরপর আরেকটি অ্যাম্বার নিলেন, এতে মৌমাছি বা গোল কিছু নেই। এর নমুনা কালচার প্লেটে নিয়ে রাখলেন। কিছুই কিলবিল করলো না।
পরে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি জানতে পারলেন, কিলবিল করা জীবগুলোর সঙ্গে বর্তমান সময়ের ইধপরষষঁং ংঢ়যধবৎরপঁং এর ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে, শুধু ডিএনএ-এর গঠনে সামান্য পার্থক্য আছে। আর গোল গোল বস্তুগুলো তার স্পোর। কোনো অণুজীব যেখানে থাকে, সেখানে যদি প্রচÐ প্রতিক‚ল পরিবেশের উদ্ভব হয়, তখন বেশিরভাগ অণুজীবই নিজেদের মোটা প্রোটিন আবরণ দিয়ে ঢেকে ফেলে। তার সব শারীরিক কার্যকলাপ তখন বন্ধ করে দেয়। একে স্পোর বলে। এভাবে তারা শত বছর থাকতে পারে। তবে একটা সময়ে তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ প্রভৃতি কারণে স্পোর নষ্ট হয়ে যায়। আর অণুজীবও মারা যায়।
এখানে বিজ্ঞানী রাউল কানো শত বছর নয়, মিলিয়ন বছরের পুরাতন অণুজীবকে পুনরুজ্জীবিত করে ফেলেছেন। তার এ কাজকে গাঁজাখুরি গল্প বলে অনেক বিজ্ঞানী উড়িয়ে দিলেন। তাদের যুক্তি ছিলো, ইধপরষষঁং ংঢ়যধবৎরপঁং কেবল মৌমাছির পেটেই নয়, মাটি, বাতাস, সবখানেই এরা থাকে। তাদের মতে, গবেষণাটি ড. কানো যথাযথ ঝঃবৎরষব (জীবাণুমুক্ত) পদ্ধতিতে করতে পারেননি। তাই তিনি ফলাফল হিসাবে যা পেয়েছেন, সেগুলো পরিবেশে থাকা এখনকার ইধপরষষঁং ংঢ়যধবৎরপঁং। তবে ড. কানোর পক্ষেও অনেক বিজ্ঞানী সুর মিলিয়েছেন।
তাকে সমর্থনকারী বিজ্ঞানী ড. পাবো দেখিয়েছেন জীব জীবিত থাকলে অ্যামাইনো এসিডগুলো খ-ধসরহড় ধপরফ হিসেবে থাকে। আর মারা গেলে তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খ-ধসরহড় ধপরফ ও উ-ধসরহড় ধপরফ এর রেসিমিক মিশ্রণে পরিণত হতে থাকে।
কোনো যৌগ যদি তল সমাবর্তিত আলোর দিক পরিবর্তন করতে পারে তবে তাকে আলোক সক্রিয় যৌগ বলে। যদি যৌগটির একটি সমাণু ঘড়ির কাঁটার দিকে তল সমাবর্তিত আলো ঘুরিয়ে দেয় তবে তা ফবীঃৎড়ৎড়ঃধঃড়ৎু (উ) সমাণু। আর যদি অপর সমাণু ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দেয় তবে তা ষবাড়ৎড়ঃধঃড়ৎু (খ) সমাণু। রেসেমিক মিশ্রণ হলো একটি যৌগের ফবীঃৎড়ৎড়ঃধঃড়ৎু ও ষবাড়ৎড়ঃধঃড়ৎু সমাণুর মিশ্রণ। ড. পাবো অণুজীবকে মেরে দ্রæত অ্যাম্বারে ঢুকিয়ে অনেকদিন পর বের করে দেখলেন খ-ধসরহড় ধপরফ এখনও অপরিবর্তিত আছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, অ্যাম্বার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রোটেক্টিভ শিল্ড, যা কোনো জৈব রাসায়নিক বস্তুকে পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিক‚লতা, তাপ, চাপ, রাসায়নিক পদার্থ, বিকিরণ, ঢ়য পরিবর্তন, অন্য জীবের আক্রমণ ইত্যাদি থেকে রক্ষা করে বছরের পর বছর।
ড. কানো দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে করেছেন, যার ফলে এ নিয়ে সমালোচনার কোনো সুযোগ নেই। অণুজীবগুলো আসলেই ২৫-৪০ লাখ বছরের পুরাতন। আর ডিএনএ-র গঠনে যে পার্থক্য দেখা গেছে তার কারণ অ্যাম্বারের বাইরের মৌমাছিরা মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে গেছে, তাই তারা আলাদা। কিন্তু ওই বেচারা অ্যাম্বারে আটকে গিয়ে জাগতিক সবকিছু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাই তার বিবর্তন হয়নি।
তিনি তার আবিষ্কার নিয়ে এতোই আত্মবিশ্বাসী যে, কারো সমালোচনায় কান না দিয়ে তিনি এ আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে ঔষধ তৈরি শুরু করে দিলেন, ঔষধ ফ্যাক্টরির নাম দিলেন অসনবৎমবহব ঈড়ৎঢ়ড়ৎধঃরড়হ। তার মতে, বর্তমানে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবগুলো প্রচলিত ঔষধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, অভিযোজিত হয়ে উঠছে। কিন্তু আদিম ব্যাকটেরিয়াদের দিয়ে তৈরি ঔষধ তাদের জ্ঞানের বাইরের বস্তু হবে, ফলে এ ঔষধ দিয়ে তাদের ধ্বংস করা যাবে। পাশাপাশি অনেক মারাত্মক রোগের ঔষধও আদিম ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যেই ফ্যাক্টরিটি তিন ধরনের ঔষধ তৈরি করে প্যাটেন্টের জন্য আবেদন করেছে। বিজ্ঞান টুয়েন্টি ফোর




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]