গন্ধ, বৃষ্টি তাতানো

আমাদের নতুন সময় : 03/06/2019

ইকবাল আনোয়ার

সেবার বেশ কিছুদিন একটানা বৃষ্টি হলো। পূর্বের দরজার বেড়ার জানালাটা টানলে থক থক শব্দে খোলে যায়। বৃষ্টির ছিটা গতরে সে দেখে দিব্বি সারাটা পুকুর। ফুসকুড়ি তোলে বৃষ্টি পুকুরের ডেকচিতে কি যেন ভাতের মতো রাঁধছে। ভাত হলে একটা গরম ভাত… গন্ধ নাকে আসতো, এখানে যে গন্ধটা তা হলো ঠাÐা আর পাতা পচা, শামুক পচা, ছেতো পরা মরা ডালের ভিজে যাওয়া, কুকিজ বিস্কুটের মতো বাঁকানো পথটার শেওলার গন্ধ মেশানো ওলটকমল ডলা গন্ধের মতো। তাহলে রান্নাটা কিসের! ভারি মজার একটা কিছু হবে।
তার নাক আজকাল বেশ খবরদারি করে। কেবল গন্ধ শোকার তালে থাকে। সব কিছুতেই গন্ধ খোঁজে। গাইয়ের গতরের গন্ধ, খড়ের গন্ধ, নতুন টাকার গন্ধ, হারিকেনের ভেন্টিলেটার থেকে ছড়ানো বাষ্প গন্ধ, ঘামের ত্যাজ গন্ধ, তার নতুন সইয়ের গন্ধ, এমনকি নিজের গন্ধ নিজের নাকে। মন খারাপ হলো তার। সইয়ের সনে কতোদিন গলা জড়িয়ে কথা হয় না। এ বৃষ্টি বুঝি থামবে না। ঘরের তোশক বালিশ উদা হয়ে যাচ্ছে। বাইরে বেরুতে মায়ের মানা। পথের সবজে বেগুনী শেওলা ফুলেফেঁপে কেরাম বোর্ডের মতো পিছলা হয়ে আছে। একবার চিৎপটাং হয়ে হাত ভেঙেছে তার। গর্তহারা পানকের ভয়ও আছে। গেলোবার তো ঘরে সাপ ঢুকেই গিয়েছিলো। তার মন খারাপ হলো, আমড়া গাছে শালিক পরিবারের লেজেগোবরে দশা দেখে। শালিকের বাচ্চা দুটি ভিজে না খাওয়া শরীরে বেলুনের মতো কাঁপছে। রাতে বৃষ্টির শব্দ টিনের চালে, মাচং এ ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি, বাইরে ভুতুড়ে পেঁচার ডাক, ঘরের পালায় বাসা হাঁড়িয়ে পিপড়াদের হা হুতাশ চলাচল, সবই মন খারাপ করা। ঘরে জমা অনাজ পাতি ময়মসলা চাল-ডাল শেষ হয়ে গেছে প্রায়। ‘লেটকা’ খিচুড়ি রুচে বারবার। মা বলেন, নে খেয়ে নে, কাল বৃষ্টি থেমে যাবে। তোর বাবাকে বলবো ঘি এনে দিতে। পোলাও রেঁধে দিবো। পোলাওয়ের লোভে বলা আর হয় না তার, লেটকা খিচুড়ি কিন্তু জবর টেস্ট হচ্ছে। এতো সব মন খারাপ আর মন ভালোর মধ্যে ব্যাঙদের কথা ভিন্ন। তাদের আনন্দ দিন আনন্দ রাত, নানা শব্দের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। তারপর একদিন, সত্যি দিন, সই-দিন, বৃষ্টি গেলো থেমে। লুকিয়ে বের হলো সে সইয়ের সন্ধানে।
জবার ঝোপে অপেক্ষা, টিনের চাল বেয়ে পড়া বৃষ্টির গর্তভরা আঁধার কোণে দাঁড়িয়ে সে একটা রক্তজবা ছিঁড়ে ঘষে তার গন্ধ শুকতে থাকে। সিঁদুর রং তাহার হাতের আঙুলে। জবার তাজা গন্ধ তার দেহজুড়ে। মনজুড়ে। আনমনা। একটা অদ্ভুত শব্দ করে কে যেন তার দু’চোখ ঠাÐা হাত দিয়ে ধরে কবুতরের বাচ্চার মতো কাঁপছে। সই নিশ্চয়ই। গন্ধই তো বলে দিচ্ছে! কি আশ্চর্য। জোড়া চোখ চেপে ধরা জোড়া হাতের তালুতেও জবা ফুল ডলা গন্ধ। এসব গন্ধ ফেলে যাওয়া বৃষ্টির গন্ধের সঙ্গে মিলেমিশে এক ক্লোরোফিল যেন ভালোবাসার, ভালো লাগার। নেশায় নেতিয়ে গেলো তারা। বিগত বৃষ্টির কারসাজিতে। সেবার অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হয়েছিলো বলে!




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]