গণতন্ত্রহরণে ইভিএম!

আমাদের নতুন সময় : 08/06/2019

কাকলী সাহা, কলকাতা

২০১৪ সাল থেকে বিজেপির ক্রমবর্ধমান ভোটব্যাংকের সাথে সাথে যে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, তা হলো ইভিএম হ্যাকিং বা ইভিএম দুর্নীতি। ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ইভিএম হ্যাকিং-এর বিষয়টি আর কেবল বিতর্কের বিষয় নয়, এটি এখন প্রমাণিত সত্য। এমনকি প্রস্তুতকারী সংস্থা ইউএসএ কোম্পানি ‘মাইক্রোক্লিপ’ ও জাপানের মাইক্রো কনট্রোলারস ম্যানুফ্যাকচারড বাই রেনেসাঁস’ কোম্পানিও এ-ব্যাপারটি অস্বীকার করেনি। অধুনা মার্কিন বিজ্ঞানীও প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ইভিএম হ্যাকিং অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। কিছুদিন আগে আপ-বিধায়ক ইঞ্জিনিয়ার সৌরভ ভরদ্বাজ ইভিএম হ্যাক করার পাঁচটি পদ্ধতির ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, একটি ‘গুপ্ত কোডৎ ইভিএম কন্ট্রোল করতে পারে। আর একটি সাধারণ কোড ব্যবহার করেই মাদারবোর্ডে পরিবর্তন এনে অনায়াসেই রেজাল্টের হেরফের ঘটানো সম্ভব। এমনকি ভোট প্রক্রিয়া চলাকালীনও কোনো ইভিএমকে রিসেট করা সম্ভব। বর্তমানে যে দুটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে হইচই হচ্ছে, তা হলো, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা গেলো, ৩৭৩ সিটে ভোট পোলিং এবং ইভিএম  গণনায় বড় রকম হেরফের। তার একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। তামিলনাড়ুর কাঞ্চিপুরম আসনে ভোট পড়েছিলো-১২,১৪,০৮৬, ইভিএম গণনায় ভোট দেখা যায় ১২,৩২,৪১৭টি। অর্থাৎ ব্যবধান ১৮,৩৩১টি ভোটের। যখন তামিলনাড়ুর ধর্মপুরীতে ভোট পড়েছিলো-১১,৯৪,৪৪০টি, আর গননায় সেই ভোট দাঁড়ায়-১০,৯৮,১১২। এখানে ব্যবধান-১৭,৮৭১টি ভোটের। একইভাবে ঐ রাজ্যের পেরামবুদুরে ভোট পোলিং-১৩,৮৮,৬৬৬, আর গণনায় সেটি হয়-১৪,০৩,১৭৮টি, এখানে ব্যবধান ৯,৯০৬টি ভোটের। এছাড়া উত্তর প্রদেশ নিয়ে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, তা প্রমাণ করে ঐ রাজ্যের মথুরাতে ভোট পোলিং হয়েছে-১০,৮৮,২০৬ এবং গণনাতে তা গিয়ে হয়েছে-১০,৯৮,১১২, অর্থাৎ এক্ষেত্রেও ৯৯০৬-এর বড় ব্যবধান রয়েছে। অথচ এ-বিষয়ে নির্বাচন কমিশন তো মুখে কুলুপ এঁটেছেই আর একের পর এক অভিযোগ ওঠায় তারা কমিশনের ওয়েব সাইট থেকে সব রেকর্ড তুলে নিয়েছে। আর এখানেই উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য না দিলে পুরো বিষয়টি নিয়ে কমিশনের বাল্যখিল্যতার বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে উঠবে না। তা হলো কর্নাটকের নির্বাচন। গোটা দেশের সাথে কংগ্রেসশাসিত কর্ণাটকেও লোকসভার ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং গত ২৩শে এপ্রিল গণনাতে সেখানে ২৮টি আসনের মধ্যে ২৫টি আসন বিজেপি অধিকার করে কংগ্রেসকে জোর ধাক্কা মেরেছে। বিজেপির এই জয় গোটা দেশের নিরিখে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মোদী সরকারের ক্যারিশমা হিসেবেই চিহ্নিত হয়। কিন্তু এর অব্যবহিত পরেই অনুষ্ঠিত হয় কর্ণাটক নগর নিগম নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের অনুমতানুসারে এই ভোটদান-প্রক্রিয়া ব্যালটেই হয়েছে, যার ফলাফল ঘোষণা হয়েছে গত ৩০শে মে, অর্থাৎ লোকসভা ভোটের সপ্তাহখানেক পর। আর এই ফলাফল গোটা দেশের হৃদ্স্পন্দন থামিয়ে দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এই নির্বাচনে কংগ্রেস পায় ৬০০টি আসন, বিজেপি ২৫০টি আসন এবং জেডিএস ২০০টি আসন। ইভিএম বাবার জয়ধ্বনি করে মোদী সরকারের জনপ্রিয়তার ফানুস মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে একেবারে চুপসে গেল!

এবারের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পূর্বেই ২২টি বিরোধীদল ইভিএম-এর সাথে সবকটি ভিভিপ্যাট গণনারও দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সময়ের অজুহাতে সে দাবি নস্যাৎ করেছে। এমনকি ৩৭৩টি সিটে গণনায় কারচুপির অভিযোগ উঠলেও নির্বাচন কমিশন সেবিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। একই সঙ্গে ব্যালটে ভোটদানে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ফলাফল প্রমাণ করেছে ইভিএম মানুষের নিরপেক্ষ মতামত প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বাধিক প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। নির্বাচনের পূর্বেও বিশ লাখ ইভিএম গায়েব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দিকে আঙুল উঠেছে, আর নির্বাচনোত্তর এই ফলাফল নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে কলুষিত করবার হীন চক্রান্ত ধীরে ধীরে সামনে আসছে। এনিয়ে বিরোধীদের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। প্রশাসন হয়তো রক্তচক্ষু দেখিয়ে সংখ্যাতত্ত্বের জোরে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করবে। কিন্তু গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এ-ঘটনা যে কতোটা কলঙ্কময় অধ্যায়রূপে চিহ্নিত হবে, তা ভাবলেই আঁৎকে উঠতে হয়। আর নির্বাচন কমিশন কিছুতেই এর দায় অস্বীকার করতে পারে না!




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]