লেখক-প্রকাশক ও দৌড়ঝাঁপকারীদের দায়

আমাদের নতুন সময় : 08/06/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বাহিনীর উপ-অধিনায়ক গ্রুপ ক্যাপ্টেন (পরে এয়ার ভাইস মার্শাল) এ কে খন্দকার ঈদের আগে সস্ত্রীক সংবাদ সম্মেলন ডেকে ২০১৪ সালে প্রথম প্রকাশিত তার লেখা ‘১৯৭১ : ঘরে বাইরে’ বইয়ের ৩২ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে ‘জয় পাকিস্তান’ কথাটি লেখা তার ঠিক হয়নি বলে উল্লেখ করেছেন। এর জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুর আত্মার প্রতি, দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি উক্ত সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, তিনি তার লেখা ভুলটি সংশোধনের জন্য প্রকাশককে বলেছিলেন, কিন্তু প্রকাশক তা করেননি। সেসময় তাকে নিরুৎসাহিত করার কাজে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন যাদের একজন ‘মূলধারা ’৭১’-এর লেখক মঈদুল হাসান এবং আরেকজন

গণস্বাস্থ্যের জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার বইটি প্রকাশের প্রায় পাঁচ বছরের কাছাকাছি সময়ে অনেকটা আকস্মিকভাবেই তার ভুলের কথা স্বীকারের পাশাপাশি বেশ কিছু ঘটনা ও ব্যক্তির কথা বলেছেন। যা নিয়ে গণমাধ্যমে নানা আলোচনার সূত্রপাত হয়। তবে ঈদের আগ মুহূর্ত হওয়ায় এ নিয়ে আলোচনা বেশিদূর এগোয়নি। জানি না এখন হবে কিনা। তবে ২০১৪ সালে এ কে খন্দকারের লেখা বইটি নিয়ে তুমুল বিতর্ক করেছিলো দেশবাসী। তখন লেখক বা প্রকাশক ভুল সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেননি। এখন লেখক সংবাদ সম্মেলন করার পর পরই প্রকাশনা সংস্থা বইটি বাজার থেকে তুলে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে প্রমাণিত হয় ২০১৪ সালে বইটিতে প্রকাশিত বেশ কিছু তথ্য শুধু ভুলই নয়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও ছিলো। সব মহল থেকে সেসব ভুল তথ্যের কথা বলার পরও লেখক, প্রকাশক এবং দৌড়ঝাঁপ দেয়া কিছু ব্যক্তি তথ্য সংশোধনের কোনো উদ্যোগ নেননি। এখানেই পরিষ্কার হওয়ার মতো যথেষ্ট উপাদান ছিলো বা আছে যে, মহল বিশেষ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে নতুন করে পানি ঢালতে মাঠে নেমেছিলো। সেই পানি ঢালার কাজে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বাহিনীর উপ-অধিনায়ক এ কে খন্দকারের নাম ব্যবহার করে সাধন করা গেলে কেল্লাফতে বললেও কম বলা হবে। বস্তুত ঘটেছে তা-ই। বইটির প্রথম সংস্করনের সব কপি বিক্রি হতে মাত্র চারদিন সময় নিয়েছিলো। এটি বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় লেখক লিখেছেন। এর পর থেকে গত সাড়ে চার বছরে বইটির কতো সংখ্যক কপি বিক্রি হয়েছে তা প্রথমা প্রকাশনী বা লেখক হয়তো জানেন। তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমরা একে খন্দকারের এমন ভুল তথ্য দিয়ে লেখা বইটি প্রকাশের পর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে বইটির ব্যাপারে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখেছি। অথচ এদেশে মুক্তিযুদ্ধের উপর মানসম্মত কোনো বই দু’চার বছরে হাজার কপি বিক্রি হয় এমন ভাগ্যবান লেখকের কথা খুব কমই শুনি। সেদিক থেকে এ কে খন্দকার ভাগ্যবান লেখকের হয়তো শীর্ষ তালিকায় উঠেছেন। তবে তার বই ক্রেতা ও পাঠকদের সিংহভাগই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়া বা জানার পাঠক নন, বিকৃত তথ্য-সেবনকারী, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসে বিশ^াসী নন- এমন দাবি করলেও কম বলা হবে।

জনাব এ কে খন্দকার এবং তার স্ত্রীও মঈদুল হাসান এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম উল্লেখ করেছিলেন। মঈদুল হাসান কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। তবে ডা. জাফরুল্লাহ টিভি চ্যানেলে বলেছেন যে, ২০১৪ সালে তার বইয়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে তিনি তখন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার ভাষায় এটি নাকি লেখকের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় তিনি তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রশ্ন দাঁড়ায় ডা. জাফুরুল্লাহ তখন একে খন্দকারের বিকৃত তথ্য সংবলিত বইয়ের পক্ষে দাঁড়াতে তার পাশে গেলেন, এখন লেখক যখন সেই সময়ের লেখাকে ভুল বলছেন, ক্ষমা চাইছেন তখন তিনি লেখক একে খন্দকারকে অভিনন্দন জানাতে গেলেন না কেন? এখানেই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের দৌড়ঝাঁপের আসল উদ্দেশ্য ও রাজনৈতিক চরিত্র উন্মোচিত হয়। ডা. জাফরুল্লাহ একজন ডাক্তার মানুষ। তাকে তার পেশাতেই মানায় ভালো। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে যখন তিনি মনগড়া কথা বলেন তখন বুঝতেই হবে তিনি বা তার মতো মানুষদের কারণেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি এতো সহজে হতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি ১৯৭১ মালেই অবিকৃতভাবে রেকর্ড করা হয়েছিলো। ১৬ খ-ের দলিলের দ্বিতীয় খ-ে লিখিত রূপ প্রকাশিত হয়েছে। এমন তথ্যসূত্র থাকার পর আর কারো অনুমান করে কিছু লেখা ও বলার কোনো সুযোগ থাকে না। ইতিহাস কোনো অবস্থাতেই সূত্র ছাড়া লেখা যায় না। যারা ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রকে বাদ দিয়ে ওই ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লেখেন- তারা লেখার সেই স্বাধীনতা সংরক্ষণ করেন না। ইতিহাস লেখার এমন বিধি-বিধান, পদ্ধতি না মেনে বাংলাদেশে অনেকেই ইতিহাস লেখেন-যা কোনো অবস্থাতেই ইতিহাস হতে পারে না। অথচ কেউ কেউ দাবি করেন এটি নাকি ‘লেখার স্বাধীনতা’। তথ্যসূত্রের বাইরে গিয়ে ইতিহাস লেখার স্বাধীনতা কোনো ইতিহাসবিদের নেই। সে কারণেই ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ ইতিহাসে যারা প্রয়োগ করতে সচেষ্ট হন তাদের বিনীতভাবে বলবো ইতিহাসতত্ত্ব নিয়ে একটু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানসমৃদ্ধ বইপুস্তক পড়ে কথা বলতে শিখুন। ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে এমন অনুরোধই আমি সবাইকে করবো। এ কে খন্দকারের বইটি এখন বিকৃত তথ্যের কারণে বাজার থেকে তুলে নিতে প্রকাশক বাধ্য হলেন। অথচ তারা যদি এ ধরনের বই প্রকাশের আগে দু,জন রিভ্যুয়ারের মতামত নিয়ে করতেন তাহলে আজ তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে হতো না। এতেই বোঝা যায় আমরা একটি ঐতিহাসিক বই লেখা, প্রকাশ করার ন্যূনতম বিধি-বিধান ও পদ্ধতিতত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান ধারণেই এখনো কতোটা পিছিয়ে আছি। মুক্তিযুদ্ধের মতো এমন জাতীয় আবেগ ও ইতিহাসের মতো বিষয়কে নিয়ে বই লেখা ও প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আমাদের এমন আনাড়িপনার সুযোগ বেশি নিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিরাই। এর প্রমাণ এই বইটির বেচাকেনার পরিসংখ্যান থেকেও স্পষ্ট হবে। আরও স্পষ্ট হবে কে, কখন, কি উদ্দেশ্যে এসব বই লেখেন, লেখান, প্রকাশ করেন, কারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতর আড়ালে বিকৃত ইতিহাস লেখা ও প্রচারে সহযোগিতা করেন। তাদের অনেকেই নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের একজন বলে দাবিও করেন। যারা ১৯৭১-এ প্রাণ দিয়েছেন- তাদের আত্মত্যাগের এমন অপমান নিয়েই আমাদের বোধহয় আরো অনেকদিন চলতে হবে।  লেখক : শিক্ষাবিদ




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]