এবার কৃষকের ঈদ আনন্দে নয় কেটেছে বিষাদে, তিন মণ ধান বিক্রি করে কিনেছেন থ্রি পিস

আমাদের নতুন সময় : 10/06/2019

ওমর ফারুক : বিশ্ব মুসলিম জাহানের সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসব ঈদুল ফিতর। প্রতি বছরই খুশির বার্তা নিয়ে ঈদের আনন্দ-উৎসবের আগমন ঘটে। এ উৎসব উদযাপনে সব মুসলমানের সমান অধিকার আছে। তাই বিশ্বের সব দেশের ও সব পেশার মুসলমানেরা ঈদ উদযাপন করে থাকেন। নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্য ঈদের আনন্দ সীমাবদ্ধ নয়। ঈদের আনন্দ সবার জন্যই অবারিত। ধনীর অট্টালিকায় আর দরিদ্রের জীর্ণ কুটিরেও ঈদের আনন্দ প্রবাহিত। তবে আমাদের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ কৃষক। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষিজীবী। কৃষির ওপর নির্ভরশীলের সংখ্যা আরো বেশি। আর কৃষকদের প্রায় সবাই মুসলিম। তাই বাংলাদেশে ঈদের সাথে কৃষি ও কৃষকের গভীর সম্পর্ক থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ঈদের উৎসবে বেশির ভাগ কৃষক ছিলেন নিরানন্দ। ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকের মনে আনন্দ ছিলো না। সে কারণে এবার তাঁদের পরিবারেও ‘ঈদ’ নেই। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো দেশের কয়েকটি জেলার কৃষকদের ঈদ উদযাপনের খবর নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন।
নেত্রকোনা থেকে দিলওয়ার খান জানান : ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় নেত্রকোনা জেলার কৃষকদের ছিল না তেমন ঈদের আনন্দ।
নেত্রকোনা জেলার হাওরাঞ্চলে গত বছর আগাম বন্যায় তাদের একমাত্র বোরো ফসল সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে যায়। গত বছর ধান ও মাছ হারিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষকের অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙ্গে যায়।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা ঘুরে ধারানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যাংক, মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ এবং আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার দেনা করে হাওরাঞ্চলের একমাত্র ফসল বোরো আবাদ করে। কিন্তু এবার আগাম বন্যায় ধানের ক্ষতি না হলেও সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সময়মতো সরাসরি ধান ক্রয় না করায় কৃষকরা বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ছিলনা কৃষকের আনন্দ।
খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের কৃষক হারুন-অর-রশিদ জানান, গত বছর আগাম বন্যায় ফসল হারিয়েছি। এ বছর ধানের ন্যায্য মূল্য নেই। পরিবার পরিজন নিয়ে সেমাই চিনি কিনারই সাহস পায়নি বাচ্চাদের কাপড় ছোপরত দুরের কথা।
শালদিঘা স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র রাসেল জানান, ঈদে আমি বাবার কাছে শার্ট প্যান্ট কিনে দেয়ার কথা বলেছি কিন্তু এক টা হাফ র্শাট কিতে লাগে ৮০০/১০০০ টাকা দুই মণ ধান বিক্রি করেও সম্ভব না আমার র্শাট কিনা। নেত্রকোণা সদর উপজেলার বামনমোহা গ্রামের আব্দুল হেকিম বলেন, এই ঈদে আমার সংসারে কোন কেনা কাটা নেই পুরাতন কাপড় দিয়েই ছেলে মেয়ে নিয়ে ঈদ করছি ।
লেপসিয়া গ্রামের হাসেম জানান, আমি তিন মণ ধান বেচে আমার মেয়ের জন্য ১২শ টাকা দিয়ে থ্রি-পিস কিনে দিয়েছি। বল্লী গ্রামের সালাম জানান, মহাজনের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছিলাম, সেই ঋণ দিতেই সব শেষ হয়ে গেছে
আমানীপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনলেও কৃষকরা ধান দিতে পারছেনা। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে মনের আনন্দে ঈদ উদযাপন করতে পারেনি।
লালমনিরহাট থেকে লাভলু শেখ জানান : এবারে ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকরা ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। লালমনিরহাট জেলার একাধিক কৃষক জানান, এবার অনেক টাকা খরচ করে আর হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। কিন্তু ফলন ভাল হলেও দাম না পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসির বদলে মাথায় হাত তারা লোকসানের হিসাব গুনছেন। কৃষকরা জানান, বর্তমান বাজারে ৪২০ থেকে ৫০০ টাকা প্রতি মণ ধান বিক্রি করছেন। এহিসাবে মতে প্রতি বিঘায় ৬হাজার টাকা লোকসান গুনতে হবে। লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি ইরি বোরো মৌসুমে ৪৮ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা ছাড়িয়ে ৩হাজার হেক্টর জমিতে ধান বেশি চাষাবাদ হয়েছে।
জামালপুর থেকে খাদেমুল বাবুল জানান : জামালপুরে বিষাদে কেটেছে ধানচাষীদের ঈদ আনন্দ। কৃষকের কষ্টে অর্জিত ধানের ন্যায্য মূল্যহীন বাজার, কৃষিপ্রদান এ জেলার প্রান্তিক চাষিদের ঈদ আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে।
কৃষক মনিরুল ইসলাম জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে ছিলাম। কামলা ও প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেশি থাকায় প্রতিমণ ধান ফলাতে এক হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বেচতে গেলে মাত্র ৫০০ টাকা দাম হয়। তাই ঈদে বৌ-পোলাপানের জন্য কিছুই কিনি নাই। কৃষক আ: ওয়াহব বলেন, শুনেছি সরকার না কি ধান কিনছে। কই আমাগো ধান তো সরকার নেয় না। ধান বেচতে না পাইয়ে ঈদে নতুন কাপড় চোহে দেহি নাই। বর্গচাষী কাদির আলী বলেন, অন্যের জমি চাষ করে কিছু ধান পাইছি। দাম কম, বেচতে গেলে গায়েক নাই। তাই ঈদের বাজারও অয় নাই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র জানায়, এ বছর জেলায় ৮ লাখ ৯ হাজার ৮১৪ মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হয়েছে। সূত্র জানায়, সমগ্র জেলায় সরকারি ভাবে মাত্র তিন হাজার ৮৮৭ মেট্রিকটন ধান ক্রয় করার কথা রয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, উদ্বোধনীর দিন কিছু ধান ক্রয় করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষমাত্রা মোতাবেক সরকারি ভাবে ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা না হলে কৃষকরা ধান চাষের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এব্যপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান খানের মুঠোফোনে একাধিক বার ফোন করে তাকে পাওয়া যায় নি।তবে ইসলামপুর সরকারি খাদ্য গোদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফর রহমানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ৪৯৮ মেট্রিকটন ধান বরাদ্দের মধ্যে ছয় মেট্রিকটন ক্রয়করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাকাওয়াত হোসেন জানান, এ উপজেলায় এ বছর ৯২ হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হয়েছে।
কুড়িগ্রাম থেকে শাহনাজ পারভীন জানান : সংগ্রামে জয়ী কুড়িগ্রামের কৃষকরা যেন অন্য ধরনের কৃষক। এ কৃষকের চোখে ক্ষুধা জয়ের ধ্যান, দিন পাল্টে দেয়ার প্রত্যায়। এবারে বোরো ধানের তেমন মূল্য না পেলেও ঈদ আনন্দ থেমে যায়নি তাদের। সল্প পরিসরে হলেও পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ উপভোগ করেছে ঈদের আনন্দ।
কুড়িগ্রামের সব্যসাচী লেখক কবি সৈয়দ শামসুল হকের বিভিন্ন লেখায় উঠে আসা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, উলিপুর, রাজারহাট, চিলমারীসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকরা এবারে ঈদ আনন্দে মেতে ছিল। আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রামের মাধ্যমে ঈদ আনন্দ উপভোগ না করলেও এখুশিতে পরিবারের সদস্যদের জন্য ঈদ পোশাকসহ সমস্ত সামগ্রী কেনা-কাটা, আত্মীয়স্বজনদের আমন্ত্রন করা সবগুলোই করেছে তারা। কৃষকরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে আত্মীয়সজনদের বাড়ীতে যাওয়া আসা, সেই সাথে জেলার ধরলা ব্রীজ, শেখ হাসিনা ব্রীজসহ বিভিন্ন ভ্রমনস্থলে গিয়ে ঈদ আনন্দ উপভোগ করেন।
কৃষক সবুজ, জলিল, কাশেম, হোসেন, সোলজার, নোলা মিয়াসহ অনেকে বলেন, এবারে ঈদ-উল-ফিতরের আগে আমাদের ঘরে বোরো ধান আসে। ধানের যে মূল্য ছিল তা খরচ মিটিয়ে লাভের মুখ চোখে পড়ে না। ঈদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়লেও পরিবারের সদস্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে গেছি। ছোট করে হলেও এ আনন্দ থেকে বিরত রাখিনি পরিবারকে।
মৌলভীবাজারের হাওর এলাকা থেকে স্বপন দেব জানান : হাকালুকি হাওরপাড়ের কৃষকদের মনে নানা শঙ্কার পর গোলায় ধান ওঠলেও এবারের ঈদ কেটেছে অনেকটা নিরানন্দে। অনেক কষ্টে পাওয়া ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় তাদের বুকে চাপা কষ্ট। যতটা আনন্দে ঈদের দিনটা কাটানোর কথা ছিল তেমনটা কাটাতে পারেননি হাকালুকি হাওর পাড়ের কৃষকরা। মৌলভীবাজার জেলার হাওর এলাকার গ্রামগুলোর প্রায় সবারই পেশা কৃষি ও মাছ ধরা। কিন্ত এবারে বোরো ধানের ফলন ভালো হলেও দাম কম থাকায় লোকসানের মুখে পড়েছেন অধিকাংশ কৃষক। যার কারণে ঈদের আনন্দ ছিলো না তাদের মাঝে। চিলারকান্দি গ্রামের ফরিদ মিয়ার স্ত্রী আমেনা খাতুন বলেন, এক মণ ধান বেচার টাকা দিয়ে একটি শাড়ি কেনা যায় না। নিজের জন্য কিনব নাকি চার সন্তানকে বছরের একটা ঈদে নুতন কাপড় কিনে দিব? অন্য কৃষক আলমাছ মিয়ার স্ত্রী জরিনা খাতুন বলেন, এবারের মতো ধানের দাম এতো কম আর কখনও ছিল না। জুড়ি উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের একই গ্রামের কৃষক বশির মিয়া বলেন, এবার ৭ কেয়ার জমিতে ধান করেছিলাম। জমি করতে ১৭ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। ধান পেয়েছি ৬০ মণ। দেনা পরিশোধ করতে ২০ মণ ধান অনেকটা পানির দামে বিক্রি করে দেনা মিটিয়েছি। হাওর বাঁচাও, আন্দোলনের জেলা সভাপতি সিরাজ উদ্দিন আহমেদ বাদশা বলেন, সরকারি গুদামে ধান কেনা শুরু হলেও স্থানীয় বাজারগুলোতে এর প্রভাব পড়েনি। তাই কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকার ধানের দাম বাড়িয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান না কিনলে কৃষকরা লাভ করা দূরের কথা, ধান চাষের খরচ তুলতে পারবেন না। যা সকলের জন্যই অশনি সংকেত।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]