• প্রচ্ছদ » » দলদাসত্ব, সত্যবিমুখতা ও সমকালীন বাংলা সাহিত্য


দলদাসত্ব, সত্যবিমুখতা ও সমকালীন বাংলা সাহিত্য

আমাদের নতুন সময় : 12/06/2019

আবু হাসান শাহরিয়ার

শাক দিয়ে মাছ ঢাকলে লেখক হওয়া যায় না। লেখককে সত্যের প্রহরী হতে হয়। সত্য ও সুন্দরের পরিচর্যাই লেখালিখির মৌলকথা। লেখক কোনও রাজনৈতিক দলের কট্টর সমর্থক হলে লেখালিখিতে বিস্তর সত্য গোপন করেন। নিজের দলের ভালোই শুধু দেখেন, মন্দে চোখে ঠুলি পরেন। তাতে গণমানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। লেখক যখন ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোজনের আশায় দলদাসে পরিণত হয় তখন আরো বেশি জনদুর্গতির শিকার হয় মানুষ। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে দলদাস লেখকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। পদ, পদোন্নতি, আবাসন প্লটপ্রাপ্তি, রাষ্ট্রীয় টাকায় বিদেশ সফর ইত্যাদি উৎকোচ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যে দেশের অধিকাংশ লব্ধপ্রতিষ্ঠ কবি-লেখক-সাংবাদিক ক্ষমতা ও বিত্তের কাছে মাথানত করে, সেই দেশে জনমনস্পর্শী মহার্ঘ সাহিত্য সামান্যই চর্চিত হয়। বাংলা সাহিত্য এখন এই সংকটকালই পাড়ি দিচ্ছে। শুধু বলতেই নয়, সত্য শুনতেও ভয় পায় অনেকে। সত্যভাষীকে এড়িয়ে চলে। সমকালীন বাংলা সাহিত্য জনবিচ্ছিন্ন হয়েছে কবি-লেখকদের লোভের কারণে। সামান্য চিকিৎসার ক্ষেত্রেও তারা রাষ্ট্রের আনুক‚ল্য আশা করে। একজন কৃষকের চেয়ে কবি-লেখকের অবদান সমাজে বেশি নয়। একজন শ্রমিকের চেয়েও নয়। রাষ্ট্রের কাছে তাদের এমন কোনও প্রত্যাশা থাকতে নেই, যা আর দশজন পায় না। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট খেয়ে ক্ষমতার স্তুতি গাইবার জন্য সামন্তযুগে রাজকবিদের জন্য এসব প্রথা চালু হয়েছিলো, উৎপাটনের সময় এসেছে। নইলে যোগ্যের সম্মান অযোগ্যের ভাঁড়ারে ওঠে। কবি-লেখকের আত্মসম্মানও ক্ষুণœ হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অযোগ্য ভক্তি’ শীর্ষক গদ্য থেকে প্রাসঙ্গিক একটি কথা উদ্ধার করছি :‘যে ক্ষমতার কাছে মস্তক নত করিলে মস্তকের অপমান হয়, যেমন টাকা, পদবি, গায়ের জোর এবং অমূলক প্রথা যাহাকে ভক্তি করিলে ভক্তি নিষ্ফলা হয়, অর্থাৎ চিত্তবৃত্তির প্রসার না ঘটিয়া কেবল সংকোচ ঘটে, তাহার দুর্দান্ত শাসন হইতে মনকে স্বাধীন ও ভক্তিকে মুক্ত করা মনুষ্যত্ব রক্ষার প্রধান সাধনা।’
নিজের নোবেল পুরস্কারের টাকায় বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠাসহ বহুবিধ জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এমন কথা তার মুখেই শোভা পায়। ক্ষমতা ও বিত্তের আনুক‚ল্যপ্রত্যাশীরা কোনোদিনই সেসব সত্য উচ্চারণ করতে পারেন না, যা উচ্চারিত হলে গণমানুষের কল্যাণ সাধিত হয়। লেখকের কাজ চিত্তকে নিয়ে। শিল্প-সাহিত্য চিত্তের প্রসাদ। বিত্তশালী নয়, কবি-শিল্পী-লেখককে সর্বার্থে চিত্তশালী হতে হয়। অকপটে সত্য বলার সাহসই একজন লেখককে চিত্তশালী করে। ক্ষমতাসীনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কুণ্ঠিত হন, তারা তৃতীয় শ্রেণির লেখক। নষ্ট সমাজে অন্যায়ের সাফাই গাইতেও অনেকে লেখালিখি করেন। তারা কোনো শ্রেণিতেই পড়েন না।
ভাষার জন্ম যোগাযোগের জন্য। সাহিত্যের মতো সাংবাদিকতাও ভাষাবাহিত ভাবনামাধ্যম। তার কাজ বৃহত্তর পরিসরে খবর পরিবেশন। পরিসর যতো বড়, দায়ও ততো বেশি। ‘সাংবাদিকতা’সহ গণমাধ্যম নিয়ে একাধিক বইয়ের রচয়িতা আর. রাজী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় শিক্ষকতা করার আগে পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। তিনি তর্জনী উঠিয়ে যেসব সত্য উচ্চারণ করেন, যাপিত জীবনেও সেসব চর্চা করে থাকেন। এজন্য একাধিকবার ক্ষমতাসীনদের কোপানলেও পড়তে হয়েছে তাকে। ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে আর. রাজীর একটি মহার্ঘ কথা উদ্ধার করা যাক : ‘যদি দেখি কোনও ‘সাংবাদিক’ কোনও ইস্যুতে সাংবাদিকতা না করে কোনও ক্ষমতাসীন ব্যক্তির ভাবমূর্তি রক্ষায় কলম ধরেছে, বুঝতে পারি, সেই ক্ষমতায় আসীন ব্যক্তি কেবল ভয়ংকর নয়, শয়তানের দোসর। আর যদি দেখি, কোনও ‘সাংবাদিক’ কোনও ইস্যুতে সাংবাদিকতা না করে ক্ষমতাহীন ব্যক্তির ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে নেমেছে, জানি সে সাংবাদিক নয়, সাক্ষাৎ শয়তান।’ একই কথা দলাকানা, দলান্ধ ও দলদাস কবি-লেখকদের সম্পর্কেও প্রযোজ্য। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ শিল্প-সাহিত্যের তাবৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে বসানো হয় ‘সাক্ষাৎ শয়তান’দের। শিল্প-সাহিত্যের পরিচর্যা নয়, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট কুড়ানোই এদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ঘটনাচক্রে যোগ্য কেউ ওইসব পদে আসীন হলেও তাকে নুলা করে রাখা হয়। কাজের কাজ করতে না পারলে তখনো কেন পদ ও সুবিধা আঁকড়ে থাকা, সেটাও একটি প্রশ্ন বৈকি।
আড়াই হাজার বছর আগে প্লেটো বলে গেছেন, ‘সত্যভাষীকে তার সমকাল পছন্দ করে না।’ তারপরও জীবনভর তিনি সত্যে অবিচল থেকেছেন। সক্রেটিসকে সত্যভাষের জন্য দÐিত হতে হয়েছে দেখেও সত্যের চর্চা থেকে সরে আসেননি প্লেটো। পৃথিবী সক্রেটিস- প্লেটোকে মনে রেখেছে, মিথাশ্রয়ীদের নয়। গৌতম বুদ্ধের পর্যবেক্ষণ ছিলো তিনটি বিষয়কে লুকিয়ে রাখা যায় না ১. সূর্য, ২. চন্দ্র ও ৩. সত্য। জীবনের প্রান্তিকে লেখা ‘রূপ-নারানের ক‚লে’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথও বলেছেন ‘সত্য যে কঠিন,/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম;/সে কখনো করে না বঞ্চনা।’ সারাজীবন সত্যের পূজারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘সত্য’ শিরোনামের এক গদ্যে লিখেছেন
‘যাহারা সহজেই সত্য বলিতে পারে তাহাদের সে কি অসাধারণ ক্ষমতা! যাহারা হিসাব করিয়া পরম পারিপাট্যের সহিত সত্য রচনা করিতে থাকে, সত্য তাহাদের মুখে বাঁধিয়া যায়, তাহারা ভরসা করিয়া পরিপূর্ণ সত্য বলিতে পারে না।’
আমরা ‘পরম পারিপাট্যের সহিত সত্য রচনা’ করি বলে বাংলা সাহিত্যে এখন দানার পরিবর্তে খোসার পরিমাণ বেশি। এমত মাৎস্যন্যায়ে রুদ্ধ হয় সুন্দরের বিকাশ। সত্যকে সুন্দরের সমার্থক জানতেন ইংরেজ কবি কিটস। তার ভাষ্যে ‘ইবধঁঃু রং ঃৎঁঃয, ঃৎঁঃয নবধঁঃু’। তার মানে এই যে, সত্যের চর্চায় ভাটা পড়লে সমাজে অসুন্দর মাথাচাড়া দেয়। কবি-লেখকদের দাঢ্যের অভাবে লেখালেখিতে সত্য উঠে আসছে না বলেই আমাদের সমাজে অসুন্দরের ছড়াছড়ি।
ঢাকার ধানমÐির গুÐামাস্তানি আর কলকাতার সল্ট লেকের গুÐামাস্তানিতে পার্থক্য আছে। ভয়ে গুÐামাস্তানদের কথা এড়িয়ে গেলে দুই জনপদের দু’রকম দুটি জীবনাখ্যান থেকে বঞ্চিত করা হয় পাঠককে। ঢাকার জনদুর্ভোগ আর কলকাতার জনদুর্ভোগও ভিন্ন। পৌরকর্তাদের অসন্তোষের আশঙ্কায় সত্য গোপন করলে আরো দুটি আখ্যান অলিখিত থাকে। বাংলাদেশের শাসক আর পশ্চিমবঙ্গের শাসকও এক নয়। শাসকশ্রেণিকে চটাতে না চাইলেও অনেক মাছ শাকে ঢাকা পড়ে। এভাবে অগণন সত্য থেকে পাঠককে বঞ্চিত করলে সাহিত্যের আর থাকেটা কি? সত্যবিমুখতাই আজকের বাংলা সাহিত্যের বড় সংকট। ঢাকার নিমতলী আর কলকাতার ধর্মতলায় বসে দুই বাঙালি লেখক একই চর্বিতচর্বণ করলে পাঠক তা পড়তে যাবেন কেন? প্রযুক্তির কল্যাণে বিভাষার মহার্ঘ সব বই এখন তার হাতের মুঠোয়। চিত্তবিনোদনের বহুবিধ মাধ্যমও নাগালে।
দলদাসত্বে সত্যবিমুখতার বিস্তার। মূঢ়দের সমাজে দলদাসরাই বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা কুড়ায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘অযোগ্য ভক্তি’। পদবির জোরে প্রাপ্ত ভক্তি পদেই ফুরোয়। আর চিরকালের সত্য এই যে, সত্যবিমুখ লেখক কোনও লেখক নন। তার হাত ধরেই সুন্দর এই পৃথিবীতে যতো অসুন্দরের বিস্তার। তাকে প্রতিহত করাও লেখালিখির কাজ। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]