• প্রচ্ছদ » » কে এই গুরু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ?


কে এই গুরু আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ?

আমাদের নতুন সময় : 13/06/2019

মাইনুল ইসলাম

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত জেনারেল শিক্ষিত একজন বুদ্ধিজীবীর মতো আচরণ করেছেন। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। ওই সময়ে বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে হাতে গোনা কিছু লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে। এমএ পাস করেছে। কাজেই এদের মধ্যে তখন থেকেই একটা অহংকার কাজ করতো যে এরা বিশেষ একটা শ্রেণি। তার উপরে তিনি ষাট দশকে সাহিত্য আন্দোলনে সম্পাদক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা এদেশের আধুনিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলনে ভ‚মিকা রেখেছে। এছাড়া তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক এবং ব্যক্তিত্ব। আর সবার উপরে তিনি একজন জনপ্রিয় কলেজ শিক্ষক হিসেবে ঢাকা কলেজে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তার গুণমুগ্ধ ছাত্রের সংখ্যা বিপুল। সবশেষে তিনি ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করে বই পড়াকে একটা আন্দোলনে রূপ দিতে চেয়েছেন। দেশের স্কুল-কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তার এই আন্দোলন ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। কিন্তু এতোকিছু করার পরও তার ওই যে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির অহংকার ও জাত্যাভিমান তা কিন্তু দূর হয়নি। আমি তার সরাসরি ছাত্র ছিলাম। খুব ঘনিষ্ঠভাবে তার সঙ্গে দীর্ঘদিন বই পড়া কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। আমি তাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। তিনি দ্বিতীয় প্রজন্মের শিক্ষিত ছিলেন, তার পিতা ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক ছিলেন এবং কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন, তার পিতা একজন নাট্যকার হিসেবে নাটক চর্চা করতেন। এসব তিনি বেশ গর্ব করে প্রায়ই বলতেন। এছাড়া আমি তাকে রসিকতার ছলে গর্ব করে একথাও বলতে শুনেছি যে, তার রক্তে হয়তো পর্তুগীজ রক্ত থেকে থাকতে পারে, কারণ তার চেহারা-সুরত টিপিক্যাল বাঙালির মতো নয়, তার পৈতৃক অঞ্চল বাগেরহাটে নাকি পর্তুগীজ জলদস্যুদের বেশ প্রভাব ছিলো। এছাড়া আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করতাম যে, তিনি প্রায়ই শিক্ষিত জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে রূপকার্থে ‘ব্রাহ্মণ’ ভাবতেন, বলতেন জ্ঞানী শিক্ষকেরা হলেন ব্রাহ্মণ, তাই বৈশ্য ও শূদ্র তো দূর কি বাত এমনকি ক্ষত্রিয় রাজাও (একথা দিয়ে সমকালীন রাজনীতিবিদদের বোঝাতেন তিনি) তার চাইতে নিচু। এসব কথা রসিকতার ছলে বললেও এর ভেতর দিয়ে তার মনের অবচেতনে লালন করা একটি বর্ণবাদী উঁচু-নিচু স্তরভেদের মানসিকতা তিনি প্রায়ই প্রকাশ করতেন। আর অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর একজন প্রিয় শিষ্য হিসেবে তিনি পোশাকে-আশাকে চলনে-বলনে বেছে নিয়েছিলেন কলকাতার বাঙালির রেনেসাঁর প্রোডাক্ট বাঙালি বাবুর ঢাকাই ভার্শন বাঙালি মিয়ার ফ্যাশন (অর্থাৎ বাঙালি বাবু মাইনাস ধুতি)। এখানেই তার চিরাচরিত এবং সার্বক্ষণিক পোশাক অর্থাৎ ঢোলা পাজামা, হাই কলার পাঞ্জাবি ও ঘিয়ে রঙের কুর্তার মূল উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে। এর সঙ্গে বলিউডের কিংবদন্তি নায়ক রাজ কাপুর স্টাইলে ছেঁটে গোঁফ রাখতেন। তার কাছে প্রায় একমাত্র প্রিয় ও সম্মানীয় ছিলেন এদেশের ডাকসাইটের আমলারা। সিএসপি আমলারা ছিলো তার সব শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের কেন্দ্রবিন্দু। আর বাদবাকি সব ছিলো তার কাছে তুচ্ছ ও পাতে তোলার অযোগ্য। এক্ষেত্রে তার ভেতরে একধরনের ঔপনিবেশিক মানসিকতা কাজ করতে দেখেছি আমি। নিঃসন্দেহে সিভিল সার্ভিসে একধরনের মেধাতন্ত্র ছিলো এবং তারা অনেকেই অনেক যোগ্য। কিন্তু তাই বলে তাদের প্রায় দেবতাতুল্য মনে করা ও বাকিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা একটি জঘন্য ঔপনিবেশিক বর্ণবাদী মনোভাব। তার এই মানসিকতা যে অনেকটা লর্ড ম্যাকলের নেটিভ ‘ব্রাউন সাহিব’ তত্ত¡ বা কিপলিঙের ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ তত্তে¡র সমার্থক সেটি তিনি এই সিএসপিদের লজ্জাহীন পদলেহনের সময় বেমালুম ও বেখেয়াল হয়ে থাকতেন। উত্তরাধুনিক বি-উপনিবেশীকরণের তত্ত¡ ও মাইন্ডসেট তার কখনো ছিলো না। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই ষাটের দশকের নেটিভ ‘ব্রাউন সাহিব’ বা নাক উঁচু ‘ব্রাহ্মণ’ বা ঢাকাই ‘বাঙালি বাবু/মিয়া’ বুদ্ধিজীবীই ছিলেন।
এই ধরনের মানুষ ‘আলোকিত মানুষ চাই’ ¯েøাগান দিয়ে যে আলোর সন্ধান করেন তার মধ্যেই আসলে থেকে যায় অন্ধকার। প্রদীপের শিখার নিচেই যেমন থাকে গাঢ় অন্ধকার। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার যুগ ও শ্রেণি চরিত্রকে অতিক্রম করতে পারেননি। তাই তিনি যখন আমাদের দেশের খেটে খাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে সারক্যাজম করেন আমি তখন অবাক হই না। এর আগে বিদেশে গিয়ে কোনো এক বক্তৃতায় তিনি প্রবাসীদের উপরে স্পেশাল ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন, অন্যথায় তাদের দেশে আসার পথ বন্ধ করে দেবার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কাজেই এটা নতুন কিছু নয়। আমি অবাক হই যে, এতোদিন এসব লোক কি করে তাদের আসল চেহারা লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলো? (ফেসবুক ভাইরাল পোস্ট থেকে সংগৃহীত)




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]