মিয়ানমারের ইরাবতী

আমাদের নতুন সময় : 13/06/2019

শেখ রোকন

ইরাবতী নদী, মিয়ানমার। অবশেষে যাচ্ছিলাম ইরাবতীর কাছে। ২০১৫ সালের মার্চে মিয়ানমারে সীমিত ভ্রমণের দিনক্ষণ চ‚ড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই ঠিক করেছিলাম, ইরাবতীতে যেতেই হবে। দিল্লি গিয়ে তাজমহল না দেখা যেমন, আমার কাছে মিয়ানমার গিয়ে ইরাবতী না দেখা তার চেয়েও বেশি। ঠাসা কর্মসূচি, ইরাবতী রেঙ্গুন থেকে অন্তত ৮০ কিলোমিটার দূরে তাতে কি? ইয়াঙ্গুন থেকে সকাল সকাল রওনা হলাম আমরা। লেখক বন্ধু সাদিয়া মাহজাবিন ইমাম, মিয়ানমারে আমার বন্ধু তাজেন ও তার সহধর্মিণী থিরি। আর গাড়ি চালক উ তান, আমাদের ‘আকো’ বা বড় ভাই। আমাদের গন্তব্য ‘নিয়াঙ ডন’ শহর। এর পাশ ঘেঁষে বয়ে চলছে ইরাবতী। মিয়ানমারের লোকজন বলে ‘ইরাওয়াদ্দি’। গোটা মিয়ানমারে ইরাবতীর প্রভাব এড়ানো কঠিন। উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে আন্দামান সাগর পর্যন্ত গোটা মিয়ানমারকে দু’ভাগে ভাগ করে প্রবাহিত এই নদী। অনেকটা আমাদের ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-মেঘনার মতো। এর উপনদী শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে রয়েছে মিয়ানমারের বহুলাংশজুড়ে। প্রচলিত রয়েছে ইরাবতী নদীর জল-জাল বেয়ে মিয়ানমারের যেকোনো অংশে যাওয়া সম্ভব। যে কারণে ইংরেজ কবি রডিয়ার্ড কিপলিং তার বিখ্যাত কবিতায় ইরাবতীকে বর্ণনা করেছিলেন ‘দ্য রোড টু মান্দালয়’ হিসেবে। বাণিজ্য ও অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ বলেই অন্তত ষষ্ঠ শতক থেকে মিয়ানমারের প্রাচীন শাসকরা তো বটেই, পরবর্তীতে ব্রিটিশ, জাপানি বা চীনাদের মতো বিদেশীয় আগ্রাসনকারীরাও যথাসম্ভব ইরাবতীকে নিজের দখলে রাখতে চেয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ বা বৃহত্তর বাংলার মিয়ানমারের সঙ্গে প্রাচীন যোগাযোগ আসলে ইরাবতী সূত্রেই। মিয়ানমারের পটভ‚মিতে লেখা অমিতাভ ঘোষের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য গøাাস প্যালেস’ শুরুই হয়েছে ইরাবতীর নাম। লাইং নদী পার হয়ে পাথেইন সড়ক ধরে ইরাবতীর দিকে যেতে যেতে চোখে পড়ছিলো ‘আসল মিয়ানমার’। অবারিত মাঠ, রাস্তার পাশে কচু, কলমি শাক, বিষকাটালি ও নলখাগড়ার ঝোপ। বাংলার সমতলভ‚মির মতোই। তবে গ্রামগুলো আমাদের মতো ঘনিষ্ঠ নয়, ছাড়া ছাড়া বাড়ি। চারপাশে পর্যাপ্ত পতিত জমি, ঝোপ-জঙ্গলে ছেয়ে আছে। লাইং নদী পার হলেই কেবল ভ‚দৃশ্য নয়, মানুষও পাল্টে যায়। ইয়াঙ্গুনে যেমন পশ্চিমা পোশাকের মিশ্রণ, এখানে শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা লোকজন, বাস, লেগুনায় চড়ে, মোটরসাইকেল, সাইকেল চালিয়ে চলছে। মাঝে মধ্যে কিশোর ভিক্ষুরা সারি বেঁধে গেরুয়া সামলাতে সামলাতে গুরুর পেছনে হাঁটছে। হঠাৎ সড়কের উপর বিশাল গেট, তাতে মিয়ানমার ভাষায় কিছু লেখা। তাজেন বললেন… ‘ইরাওয়াদ্দি মা চো জো ভা-ই’। ইরাবতীতে আপনাকে স্বাগতম।
আরও আধা ঘণ্টা পেরিয়ে মহাসড়ক থেকে কিছুদূর নেমে ইরাবতীর দেখা পেলাম। ততোক্ষণে সূর্য অনেক উপরে উঠে গেছে। চকচক করছে সবুজাভ পানি। জেলেদের ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর, শুঁটকির মাচাভরা শহর রক্ষা বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে ডান পাশে চোখে পড়লো ইরাবতী ও লাইং নদীর সংযোগস্থল। বাম পাশে দূরে আবছা দেখা যায় দেশের বৃহত্তম ইরাবতী সেতু। ইয়াঙ্গুন থেকে নিয়াঙ ডন পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার পথে শতাধিক প্যাগোডার চ‚ড়া চোখে পড়েছিলো। নদীর অপর পাড়েও রোদে চকচক করছে একটি প্যাগোডার সোনালি চ‚ড়া। বাঁধের নিচেই এক ফালি হাঁটুজল পেরিয়ে বেশ বড় একটি চর। কাশবনে ছাওয়া সেই চরের এক প্রান্ত ফাঁকা। সেখানে রীতিমতো হাট বসেছে। লোকজন বালিতে ও পানিতে নেমে খেলছে, স্নান করছে। এই পর্যটন স্পষ্ট ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান, বসার জায়গা, লাইফবয়, নৌকায় ঘোরার বন্দোবস্ত। মনে হলো বাংলাদেশের বড় বড় নদীতীরে এমন শত শত চর রয়েছে। আমরা তো সেগুলোকে পর্যটনস্থল বানাতে পারিনি। কিছুক্ষণ ঘুরেফিরে আমরাও একটি নৌকায় উঠে পড়লাম। মাঝির নাম চ্য নাই উ। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইরাবতী তীরেই। আগে মাছ ধরতেন, এখন পর্যটন নৌকাতেই লাভ বেশি। বললেন ইরাবতী মাছের জন্য বিখ্যাত। বিচেও দেখে এসেছি বেশকিছু দোকান। তাজা মাছ শিকের উপর ভেজে বিক্রি হচ্ছে। মিয়ানমার মাছের দেশ। মাছের এতো বৈচিত্র্য আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় আর কোথাও দেখিনি। নৌকায় সংযোগস্থল থেকে কিছুটা দূরে ঘুরে ফেরার পথে হাঁটু পানিতে নামলাম। আজলাভরে তুলে নিলাম ইরাবতীর পানি। শীতল, স্বচ্ছ পানি। এই পানিতে মিশে আছে মিয়ানমারের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি। মিয়ানমারের হাজার বছরের হাসি-কান্না নিয়ে বয়ে চলছে এই ইরাবতী। এই ইরাবতী সাক্ষী হয়ে আছে প্রাচীন বাংলা ও বার্মার বৈরিতা কিংবা বন্ধুতার। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]