• প্রচ্ছদ » » প্রতিমুহূর্ত হেরে গিয়ে আমাকে জিতিয়ে দেয়া বাবার জন্য আমি আরেকটা পরাজয়


প্রতিমুহূর্ত হেরে গিয়ে আমাকে জিতিয়ে দেয়া বাবার জন্য আমি আরেকটা পরাজয়

আমাদের নতুন সময় : 18/06/2019

বীথি শপ্তর্ষি

বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা শীতল। শেষ কবে আমাদের কথা হয়েছে মনেও নেই। কোনোরকম আবেগের কচকচানি নাই, আদর-যতœ নাই, ভালোবাসাবাসি দেখানোও নাই। বাবার সাথে যখন নিয়মিত কথা হতো, তখনো কাজের কথাই হতো। কখনো ৮ সেকেন্ড তো কখনো ১২ সেকেন্ড। একদিন সর্বোচ্চ কথা হয়েছিলো ৩৮ সেকেন্ড।
এই যে বাবার সাথে ভিত্তি-যতœহীন একটা নাই নাই টাইপ শক্ত বায়বীয় সম্পর্ক, এটা বেশ স্বস্তির। বাবার যা জানা দরকার তা হলো, আমি বেঁচে আছি কিনা আর ঠিকমতো খাচ্ছি কিনা। এই দুটো জিনিস বাবা জেনে নেয়। কখনো মা কথা বললে ফোনে কান লাগিয়ে, কখনো ভাই কথা বললে ফোনে কান লাগিয়ে বা কখনো কেউ ফোন না দিলেও কারো কাছে ফোন দিয়ে। এই সম্পর্কটা একটা অদ্ভুত আজব কিসিমের। এরকম সম্পর্ক বাবা ভিন্ন অন্য কারো সাথে আমার আর কোনোদিন হয়নি। দুতিন দিন কথা না বললেই বাকি সম্পর্ক ভেঙে খান খান হয়ে যায়। কিন্তু বাবার সাথে কোনোদিন কথা না বললেও বাবার কোনো ভাবান্তর হয় না। আমি কি করছি, কোথায় যাচ্ছি, কার সাথে মিশছি এসবও বাবার কাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। ফলে না পাওয়ার শূন্যতায় ডুবতে ভাসতে বাঁচতে বাঁচতে জেনেছি, বাবা আসলে কোথাও না থেকে একটা পুরো পৃথিবীকেই আমার করে দিয়েছেন। যেখানে আর কেউ না থাকলেও আমার কারো দরকার হবে না।
এই যে আমি জানি, আমার প্রচ- ক্রাইসিস, হেরে যাওয়া, বিষণœতায় বাবার হাতটা ধরতে পারবো না বা বাবা ধরতে দেবে না। আমি তাই এসব ক্রাইসিস, হার-জিত, বিষণœতাকে একান্ত আপনার করে হাতব্যাগটায় পুরে রেখেছি। আমি বুঝতে শিখেছি, ‘মায়া-সন্ত্রাস’ আসলেই সন্তানের জন্য ভালো কিছু আনে না। আদর-যতœ, অফুরন্ত বায়না পূরণ আর আবেগ মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে। পায়ে কেটে বসা রঙিন চিকন সুতো পায়ে নিয়ে খোলা আকাশে উড়তে হয়। আমার পায়ে, গায়ে এমন কোন রং বা সুতো কিছুই নেই। আমার ওড়াউড়ি অফুরান।
বাবা একজন জীবনযোদ্ধা, আজীবন যুদ্ধ করেও যে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য বা অন্য কারো জন্য কিছুই করতে পারেনি। কিন্তু নিজের এই না পারাকে শক্তি বানিয়ে তিনি এখনো অন্তত একটা যুদ্ধে জেতার স্বপ্ন দেখতে পারেন। অথচ এইটুকু বয়সেই আমার মনে হয়, ক্লান্ত হয়ে পড়ছি বোধ হয়। আমার তখন নির্লিপ্ত বাবার কথা মনে হয়, বাবার নির্লিপ্ততার মতো অর্থবহ কোনোকিছু আর খুঁজে পাই না সহসা। অনেক বছর ধরে বুকের ভেতর চোরা কাঁটার মতো গেঁথে থাকা ঝাঁকড়া চুলের সেই পুরুষের ছবিটা পার্স থেকে বের করি। বাতাসে কমে আসা অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে যায়। আমি আবার নিশ্বাস নিই। বাবার দরাজ গলায় শুনতে পাইÑ ‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত/যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না’
ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ জোড়াকে বড্ড সতেজ মনে হয়। জানি, এইসব ক্লান্তি, অভিমান, না থাকার মধ্যেই বাবা সবচেয়ে বেশি প্রকট। দূরত্বটা ঘুচে গেলে এই সম্পর্কটাও ছোট হয়ে আসবে। আমাদের সম্পর্কটা শূন্যের মতো। আমরা কেউই সারাক্ষণ ভরে থাকার স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু দুজনের কাছেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার, ভরসার বিশ্বাসের জায়গাটা আমরাই। যার জন্য প্রতি মুহূর্ত বেঁচে থাকা, তার জন্য দিবস টিবসের দরকার নাই। তবু দুচার লাইন লেখার উপলক্ষ তো লাগেই। এইসব দিনে অন্তত অভিমানের ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে কিছু লেখা যায়। সেটাই বা মন্দ কি! প্রতিমুহূর্ত হেরে গিয়ে আমাকে জিতিয়ে দেওয়া বাবার জন্য আমি আরেকটা পরাজয়। অভিমানেই এই পরাজিতের ভালবাসা বেঁচে থাকবে বাবা। আমি জানি, তুমি আছো। থেকেও না থাকার মতো। আমার এতেই স্বস্তি। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]