অবশেষে স্বস্তি স্বাস্থ্য-পরিষেবায়

আমাদের নতুন সময় : 19/06/2019

কাকলী সাহা, কলকাতা

পশ্চিমবঙ্গের বুকে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা অচলাবস্থা স্বাভাবিক হলো আজ। ক্ষোভ ছিলো বেশ কিছুদিন ধরেই, তবু এবারের ঘটনায় যেন আগুন লাগলো বারুদের স্তূপে। গত সপ্তাহের শুরুতে এনআরএস হাসপাতালে একজন মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় বহিরাগতদের দ্বারা আক্রান্ত হন জুনিয়ার ডাক্তাররা। সেখানে পরিবহ মুখোপাধ্যায় নামে একজন জুনিয়ার ডাক্তার গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়ে আজও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার মাথার স্কাল ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছে, আঘাত গুরুতর। এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সব জুনিয়ার ডাক্তারের মধ্যে। এনআরএসের জুনিয়ার ডাক্তাররা এর পরেই ধর্ণায় বসেন। তাদের একমাত্র দাবি ছিলো ডাঃ পরিবহর চিকিৎসা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা। কিন্তু এক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের অনীহা এবং অনমনীয় আচরণে আন্দোলনের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একে একে পশ্চিমবঙ্গের সব মেডিকেল কলেজেই জুনিয়ার ডাক্তারদের কর্মবিরতি শুরু হয়। কিন্তু খোদ মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে আগুনে ঘি পড়ে। তখন বিভিন্ন হাসপাতালে বহু সিনিয়র ডাক্তারের পদত্যাগের ঢল নামে। এই ব্যাপারে তাদের অবস্থানের সমর্থনে প্রতীকী কর্মবিরতি পালন করেন এইমসসহ ভিন রাজ্যের ডাক্তাররাও। কলকাতার রাস্তায় ঢল নামে ডাক্তারদের। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষও। এরপর রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই আন্দোলনে সংহতি জানাতে তাদের আউটডোর পরিষেবা বন্ধ রাখে। এভাবে রাজ্যের স্বাস্থ্যপরিষেবা একেবারেই ভেঙে পড়ে।

প্রথম থেকেই রাজ্য সরকারের অনমনীয় মনোভাবে তাজ্জব বনে যায় নাগরিক সমাজ এবং চরম অসহায়বোধ করে রোগী ও রোগীর পরিবারবর্গ; এমনকি ভিন রাজ্য ে থকে আসা রোগীরাও। যদিও ধর্ণায় বসা ডাক্তাররাও আউটডোরের বাইরে বসে রোগী দেখছিলেন, এমার্জেন্সি ও ইনডোর খোলা রেখে পরিস্থিতি শামাল দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেটা নগণ্য। তাছাড়া স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর মনোভাব ও শাসকদলের নেতা-কর্মীদের লাগাতার হুমকির সামনে তাদের ধৈর্যে ধরে রাখা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছিলো। তবে বৃহত্তর মানুষের সমর্থন ও বেশকিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তাদের সঙ্গে সংহতি জানাতে বারবার উপস্থিত হয়েছেন ডাক্তারদের অবস্থানে। তারা  মাননীয় রাজ্যপালের কাছে ছুটে গেছেন। তিনিও এ-ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কিন্তু পারস্পরিক দোষারোপ ছাড়া সমস্যার কোনো সমাধানসূত্র বের হয়নি। তবু সমগ্র জুনিয়ার ডাক্তাররা  দলমত নির্বিশেষে একাট্টা থাকায় কোনো ষড়যন্ত্র বা হুমকি তাদের আন্দোলনের পথ থেকে একচুলও পিছু হটাতে পারেনি।

অবশেষে নাগরিকসমাজের চাপে ও ডাক্তারদের লড়াকু মনোভাবে পিছু হটতে হয় সরকারকে। প্রথমে অবশ্য দুএকজন জুনিয়ার ডাক্তারকে নবান্নে ডেকে প্রশাসন বিষয়টায় জল ঢেলে দিতে উদ্যোগী হন। কিন্তু জুনিয়ার ডাক্তাররা দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এনআরএস হাসপাতালে এসে সকল আন্দোলনকারীর সাথে বসতে হবে। কিন্তু এবিষয়ে সরকার একেবারে চুপ থাকলে অবশেষে সাধারণের স্বাস্থ্যপরিষেবা চালু করতে তারা সরকারের দাবি মতো মিডিয়ার লাইভ কভারেজের উপস্থিতিতে নবান্নে তাদের প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়। তাদের এই শুভ উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। প্রথমে রাজ্যপ্রশাসন লাইভ কভারেজের বিষয়টা মানতে না চাইলেও নাগরিক আন্দোলনের চাপে পড়ে অবশেষে বিভিন্ন হাসপাতালের জুনিয়ার ডাক্তারদের আঠাশজন প্রতিনিধি নিয়ে সোমবার বিকেলে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রশাসনের সাথে বৈঠকে বসেন। আপাতত সরকার পক্ষের তরফে জুনিয়ার ডাক্তারদের সব দাবি মেনে নেয়া হয়। তাতে স্বাস্থ্যপরিষেবা পুনরায় চালু হবার আশায়, উভয় তরফে স্বস্তি দেখা দেয়। এবার অদূর ভবিষ্যতই বলে দেবে জুনিয়ার ডাক্তারদের এই নজিরবিহীন আন্দোলনের ফল আসলে কতোটা মিষ্টি হলো? ডাক্তাররা কতোটা নিরাপত্তা পেলেন আর সমগ্র নাগরিক সমাজ কতোটা সুষ্ঠু স্বাস্থ্যপরিষেবা পেলেন?

 

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]