• প্রচ্ছদ » » কানিজ পারিজাতের শিহরন-জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরন’


কানিজ পারিজাতের শিহরন-জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরন’

আমাদের নতুন সময় : 21/06/2019

অঞ্জনা সাহা

কানিজ পারিজাত একজন গল্পকার। কিন্তু তাকে আমি কবি বলেই জানতাম! প্রথম যেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়, সেদিন তার নিজের লেখা কবিতা আওড়াতে শুনেছি! সেসব অসাধারণ পংক্তি আমাকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলো। কিছুদিন পর এক সন্ধ্যায় ডাক পড়লো ২১শের বইমেলায় তার প্রথম বইয়ের মোড়ক-উন্মোচনে। তার প্রিয় দাদা ও বৌদিকে থাকতেই হবে সে-অনুষ্ঠানে। একটু আশীর্বাদ-প্রার্থনায় এই জরুরি তলব। আমার ধারণা ছিলো, কবিতার বই! কিন্তু গল্পের বই শুনে একটু যেন দমে গেলাম। আমার দলের নয় বলে মনে মনে একটু আক্ষেপ হলো! তবে বইয়ের নাম শুনে একটু চমৎকৃত হলামÑ‘মেঘের চিত্রপট’। প্রাণ খুলে নামের প্রশংসা করলাম। এটা ছিলো ২০১৮-এর কথা। সেবার ওর গল্প নিয়ে কিছু লিখবো ভেবেছিলাম। কিন্তু নানা পাকেচক্রে হয়ে ওঠেনি। এবার ২০১৯-এর বইমেলায়ও আমাদের ডাক পড়লো। ফের গল্পের বই ‘জলশিহরন’! শিহরন লাগানোর মতোই নাম। উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করলাম। বইটি হাতে পাওয়ার পর যখন পড়তে শুরু করলাম, তখন প্রতিটি গল্প আমাকে টেনে নিয়ে গেলো শুরু থেকে শেষ-অব্দি। চারপাশের মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা এমন নিবিড় পর্যবেক্ষণে প্রকাশ করার মতো মেধা ও দক্ষতা না থাকলে এ-ধরনের গল্প লেখা অসম্ভব।
কানিজ পারিজাত শুধু কবি হিসেবে নন, গল্পকার হিসেবেও আমাদের হৃদয় জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তার ‘জলশিহরন’ গল্পগ্রন্থে মোট পাঁচটি ভিন্ন স্বাদের গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। পাঁচটি গল্পই যে পাঠকের মনে ভালোলাগার একটি আচ্ছন্ন আবেশ তৈরি করবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তার ‘শেষরাতের জোনাকি’ গল্পে আবহমানকাল ধরে বাংলার নারীরা যে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার সার্থক রূপায়ণ দেখতে পাই। উল্লেখযোগ্য, “মোমেনা যেন শীতল বরফ, হঠাৎ উষ্ণতার স্পর্শে গলতে শুরু করল।” কিংবা “মানুষের গুঞ্জন ছাপিয়ে মোমেনার কানে একটা কথা আছড়ে পড়েÑ‘পাপে ছাড়ে না বাপেরে’। মোমেনা শূন্য দৃষ্টিতে পাপের সন্ধানে খাবি খেতে থাকে।” সবশেষে সে বলে, “ঘর এখন অন্ধকারÑসে ভালোই হয়েছেÑঅন্ধকারেই অন্ধকার যাত্রা। কিন্তু না সে দেখতে পায় আলোর কণিকাÑবাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা জোনাকি ঢুকে পড়েছে ঘরেÑসবুজ মিট-মিট আলো জ্বেলে উড়ে উড়ে নেচে নেচে বেড়াচ্ছে। আহ, কী সুন্দর! জীবন কী সুন্দর!” এখানে মোমেনা চরিত্রে নারীর একটি সুদৃঢ় রূপ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন লেখিকা। শত লাঞ্ছনা সয়েও সে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে!
‘বরফপানি’ গল্পে স্কুলপড়–য়া কিশোরীদের স্কুলজীবনের টুকরো টুকরো ঘটনার সংমিশ্রণে তৈরি গল্পটিতে কানিজ যখন বলেন, “সমাজ ও নৈতিক শিক্ষার ক্লাশ নিতে নতুন ম্যাডাম এলেন। কী চমৎকার কথা বলেন। সবুজ শাড়ির সঙ্গে সবুুজ রঙের ফুলসিøভ বøাউজে ম্যাডাম যেন একটকুরো সবুজ আবেশ।” তখন তার বর্ণনারীতির মোহনীয় অবেশে পাঠকও আবিষ্ট হয়ে পড়েন। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নিয়ে লেখা ‘ফেইসবুক’ গল্পটিতে লেখিকা মানুষের অবক্ষয়ের বাস্তবচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত দক্ষ হাতে। এই অস্থির সময়ের পাঁকে মানুষ কেমন করে অন্ধকারে তলিয়ে যায়, তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ‘ফেইসবুক’ গল্পটি।
গল্পগ্রন্থটির শেষ গল্পের নাম ‘আড়াল’। এখানেও দেখতে পাওয়া যায়, নৈতিক অবক্ষয়ের ছাপকে কী নিবিড় দক্ষতায় তিনি তুলে এনেছেন। কানিজ পারিজাত যে একজন কুশলী গল্পকার হয়ে উঠেছেন, তা তার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরনে’ অধিকতর স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতে কানিজ পাঠকদের আরো গভীর ও পরিণত গল্প উপহার দিতে সক্ষম হবেন, এই গল্পগ্রন্থ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমি তার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]