• প্রচ্ছদ » » দেশে কেন একটি শক্তিশালী বিরোধীদল দরকার?


দেশে কেন একটি শক্তিশালী বিরোধীদল দরকার?

আমাদের নতুন সময় : 21/06/2019

বাপ্পাদিত্য বসু

একটা অস্থিরতার কাল পার করছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিন-রাত একাকার করা শ্রমের ফসল খাওয়ার জন্য দেশজুড়ে এক দুর্বৃত্তের দল সৃষ্টি হয়েছে। গত এক দশকের কিছু বেশি সময়ে বাংলাদেশ স্মরণকালের সর্বোচ্চ উন্নয়নের শিখরে এসেছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তির ঢের উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উল্লম্ফন ঘটেছে দেশে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে, দারিদ্র্য কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে, মাতৃমৃত্যু-শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে, নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক রিজার্ভ বেড়েছে, প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশকে মার্কিনীরা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অভিহিত করেছিলো, সেই পশ্চিমারাই আজ বাংলাদেশের স্বর্ণালী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উচ্ছ¡সিত।
এসবই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ অবদানে। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর দূরদর্শী পদক্ষেপের কারণেই বাংলাদেশ আজ এমন অবস্থানে। দেশের উচ্চ জনসংখ্যাকে তিনি জনসম্পদে রূপান্তরের কাজটি করেছেন সফলতার সঙ্গে। তিনি কাজের জন্য একটা চমৎকার টিম সৃজন করতে পেরেছেন। আবার সময়ে সময়ে তার টিমমেটদের পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি কর্মযজ্ঞে আরো গতি আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু এক দশকের এই উন্নয়নের গুড় খেয়ে যাবার লক্ষ্যে দুর্বৃত্তায়নের পিঁপড়ারাও আজ বেশ সক্রিয়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যাচ্ছে কাজের চেয়ে অকাজের লোকের সংখ্যাই বেশি। তারা দুর্নীতি করছে, লুটপাট করছে, সরকারের সুনাম ক্ষুণœ হয় এমন সব ধরনের কাজের মধ্যেই তারা রয়েছে। দুর্নীতিতে বৈশ্বিক চ্যাম্পিয়ানশিপ ঘোচানো গেলেও কার্যত দুর্নীতি কমেনি। চ্যাম্পিয়ানশিপ ঘুচেছে সম্ভবত অন্য দেশগুলোর দুর্নীতি বাড়ার কারণে। আমাদের কি কমেছে?
বরং এই দশ বছরে ব্যাংক লুটের ঘটনা বেড়েছে, শেয়ার বাজার সাফ করে দিয়ে হাজার হাজার মধ্যবিত্তের স্বপ্ন হত্যা করা হয়েছে। এমন ঘটনা নিশ্চয়ই বিশ্বে বিরল যে একটি ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকরাই ব্যাংকটিকে লুটে সাফ করে দিয়েছেন। ফারমার্স ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঘটনাটি এমনই। শেষতক বাধ্য হয়েই ব্যাংকটিকে বাঁচাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাত চালাতে হয়েছে। নতুন নাম নিয়ে আস্থাহীন ব্যাংকটি আবার যাত্রা শুরু করেছে। ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িত হিসেবে যেসব নামগুলো আসছে, তারা আবার মহাক্ষমতাধর। তাদের বিচার করার মতো শক্তিমান হতে পারলো না এখনো বাংলাদেশ। শেয়ার বাজার লুট হয়েছে দশ বছরে বারবার। বিএনপি আমলের এক মহাক্ষমতাধরের সঙ্গে মিলে চলতি আমলের আরেক ক্ষমতাধরের যুগল লুটপাটের অভিযোগ শোনা যায়। হাজার হাজার স্বল্প আয়ের মানুষের স্বল্প পুঁজিগুলো একত্রিত করে লুটে নিয়ে শেষ করে দেয়া হয়েছে। কোনো বিচার নেই। নাকি বিচারের শক্তি অর্জিত হয়নি বাংলাদেশের?
বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও নানা লুটের কাহিনী এখন সামনে আসছে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোতেও দস্যুদের লোলুপ দৃষ্টি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সহ-প্রকল্প আবাসিক ভবনে একেকটি বালিশ তুলতে ৭৬০ টাকা খরচের গল্প তো এখন দেশের চুরি-দুর্নীতির রূপকে পরিণত হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় আরো কতো কতো খাত বানিয়ে নিয়েও দুর্বৃত্তের দল নিত্যনতুন চুরির আয়োজন করে চলেছে মহাসমারোহে। এদেরও বিচার কোথায়? খুন-ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন বেড়েছে স্মরণকালের সর্বাধিক। বাংলাদেশ যেন এখন ধর্ষণের রঙ্গমঞ্চ। উদাহরণ দিয়ে বলার প্রয়োজন নেই, সাম্প্রতিককালের তনু থেকে নুসরাত ঘটনাগুলো সবাই জানি। এখানেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের যোগসাজশ। জামায়াতের সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগ নেতার অপরাধচক্র। সঙ্গে যুক্ত আছে অসৎ পুলিশকর্তারাও। কারাগারের মধ্যেও আজ নিরাপদ নয় কেউ। সম্প্রতি পঞ্চগড় কারাগারে এক আইনজীবীকে আগুনে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম কারাগারেও এক আসামিকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার অপরাধীরা রাষ্ট্রের চেয়েও কি শক্তিশালী যে তাদের বিচার হবে না? দেশে দক্ষিণপন্থি ইসলামী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার নামে আওয়ামী লীগ তাদের আজ কোলে তুলে নিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মতো ভয়ংকর রাষ্ট্রবিরোধী অন্ধকারের শক্তির কাছে আওয়ামী লীগ বারবার নত হয়েছে। এমনকি তাদের দাবি অনুযায়ী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মতো মৌলিক কাঠামোতেও আওয়ামী লীগ ছুরি-কাঁচি চালিয়েছে। আওয়ামী লীগের এই দক্ষিণপন্থি ঝোঁক কেবল তার নিজের জন্যই নয় শুধু, বাংলাদেশের জন্যই এক মহাবিপদ সংকেত। এখন সবাই তো কেবল তেলবাজিতে মত্ত আছে। ভুল ধরিয়ে দেয়া বা সমালোচনার কেউ নেই। ফলে ভুলের ফাঁদে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে সরকারি দলের। কিন্তু বিরোধীদল নেই কেন? সরকার কি তবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিচ্ছে না?
চরম নিপীড়নের পথে কি হাঁটছে শেখ হাসিনার সরকার? বিষয়টি কিন্তু তেমনও নয়। আসলে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিতে এই বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরে এসেও মুক্তিযুদ্ধই রয়ে গেছে এ জাতির সমস্ত চিন্তা, চেতনা, সংস্কৃতি আর অস্তিত্বের শিকড় হিসেবে। এখানে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিই এখন বিরোধীদল। তারা একটা সময় দেশি-বিদেশি নানা শক্তির মদদে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির উপর প্রবল আক্রমণ হেনে তাদের দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছিলো। কিন্তু নানা সংগ্রাম আর চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে গত দশককালজুড়ে দেশ মুক্তিযুদ্ধ-অভিমুখী পুনর্যাত্রা করেছে। যদিও স্বাধীনতাবিরোধী শত্রæ চক্র এখনো প্রচÐ মাত্রায় সক্রিয়। কিন্তু বাংলাদেশে খুব সহজে আর একাত্তরবিরোধী কোনো শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আওয়ামী লীগের বিপরীতে যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এখানে দরকার তা কোনোক্রমেই বিএনপি-জামায়াতের বিকল্প শক্তি নয়, হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের উদার ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক গণতান্ত্রিক শক্তি। মুক্তিযুদ্ধ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, কল্যাণ অর্থনীতি আর সব মানুষের জন্য একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই দানা বাঁধুক নয়া রাজনৈতিক মেরুকরণ। তাতে আওয়ামী লীগের জন্যও ক্ষতি নেই। তার চেয়ে বড় কথা, তাতে লাভ বাংলাদেশেরই। লেখাটি সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত হলো। পুরো লেখাটি পড়তে পারেন চ্যানেল আইন অনলাইনে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]