• প্রচ্ছদ » » মিসরের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির জন্য শোক করা কি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও প্রগতিশীল মানুষের শোভা পায়?


মিসরের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির জন্য শোক করা কি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও প্রগতিশীল মানুষের শোভা পায়?

আমাদের নতুন সময় : 21/06/2019

ফারুক ওয়াসিফ

মিসরের একমাত্র নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির জন্য শোক করা কি গণতান্ত্রিক, মানবিক, প্রগতিশীল মানুষের শোভা পায়? অনেকেই মুখে না বললেও নীরব থেকে বুঝিয়ে দেন ‘নেভার’ ‘নেভার’? তাহলে কি খুশি হওয়া যায়? ইসরাইল-সৌদি-মার্কিনীদের ভাইবেরাদর ছাড়া অবশ্য অন্যদের খুশি হতে অস্বস্তিই হবে। কিন্তু এই বিপক্ষীয় নীরবতা অথবা অস্বস্তিকর শান্তি কি আসলে নিরীহ? ভেবে দেখা যাক।
মুরসির প্রায় এক বছরের প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময় তিনি মিসরের প্রগতিশীলদের হতাশ করেছেন। তারা ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারী স্বাধীনতা এবং সেক্যুলারিজমের নিক্তিতে মুরসিকে খারাপ পেয়েছেন। কথা সত্য। ওই এক বছরে মুরসি তুমুল স্বৈরাচারী কিছু করেননি। ফিলিস্তিনি জনগণ এবং হামাসের প্রতি সহানুভ‚তি দেখিয়েছেন, মিসরের ডিপ স্টেট সেনাতন্ত্রের গায়ে আঁচর কাটতে চেয়েছেন। ইসরাইল-সৌদি আরব আর পশ্চিমা জোটের চোখের বালি থেকে গলার কাঁটা হতে চেয়েছেন। সুতরাং প্রগতিশীল ও নারীবাদী চোখে তিনি সমস্যা, ইসরাইল-সৌদি-মার্কিন (ত্রিফলা শক্তি) আগ্রাসীদের কাছে তিনি শত্রæ। তার মৃত্যুতে খুশি হওয়া মুক্তচিন্তাবাদী আর তার খুনি সা¤্রাজ্যবাদী ত্রিফলা শক্তি আদর্শিকভাবে আলাদা হলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ধ্বংস করে হলেও মুরসি বিরোধিতায় তারা এক। মনে পড়ছে চিলির আলেন্দে হত্যার সময়ও এমন বিচিত্র শিবিরের লোক একই আনন্দের কাতারে শামিল হয়েছিলো। কারো আদর্শ ইসলাম, কারো কমিউনিজম, কারো জাতীয়তাবাদ হলেও কর্মসূচির দিক থেকে এরা অনেকটা কাছাকাছি। কিছুটা জাতীয়তাবাদী, বিপক্ষের প্রতি কড়া এবং নিম্নবিত্তের প্রতি কিছুটা দরদী। সা¤্রাজ্যবাদের সাঁড়াশি আর অবাধ পুঁজিবাদী লুণ্ঠনের কামড় এরা কিছুটা আলগা করতে গিয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণভাবে মাঝারিমাত্রার অসহিষ্ণুতা এদের রাজনীতির অঙ্গ হলেও প্রতিপক্ষের তুলনায় এরা একটা বিকল্প হিসেবে এসেছিলেন। কিন্তু আদর্শিকভাবে ইসলামী বা মতবাদিকভাবে বামপন্থী হলে ঘৃণা করার যে রাজনীতি, তারা অপর আদর্শের বিরোধিতার খেয়ালে নিজেরাও আদর্শিক হিংসাই প্রকাশ করেন। এদের এই ভ‚মিকা শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের জাতীয় শত্রæ ইমপিরিকো-মিলিটারি-কর্পোরেটতন্ত্র তথা সা¤্রাজ্যবাদ ও দেশীয় দস্যুদের পক্ষেই যায়। এরা ভুলে যায়, মুরসির সঙ্গে লড়া সম্ভব, কিন্তু জায়নবাদ-সা¤্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদের সঙ্গে লড়ার একমাত্র উপায় ব্যাপক আকারের সশস্ত্র প্রতিরোধ। এটা না বুঝেই প্রগতিশীলতার নামে একদল লোক স্থানীয় স্বৈরাচার এবং আন্তর্জাতিক আগ্রাসী শক্তির হয়ে ধূ¤্রজাল বা স্মোকস্ক্রিনের কাজ করে। ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া একইভাবে মৃত্যুর টানেলে দিন গুনছেন। একজন মধ্যবাম, অন্যজন মধ্যডান এবং দু’জনই দুর্নীতির দায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত। এদের ব্যাপারে ডান ও বামের মতবাদীরা কি করবেন তা অনুমান করা যায়। কিন্তু তারা বোধহয় জানেন না, মোদী কিংবা নেতানিয়াহুরা তাদের জন্যও ভয়ংকর।
আদর্শবাদ মধ্যবিত্তকে বিভ্রান্ত করে, কেননা খাওয়া-পরা-ইজ্জতের আরামে তাদের চেতনা অবশ হয়ে যায়। তারা জনস্বার্থের চাইতে সাংস্কৃতিক শুচিবায়ুতার সেবা বেশি করে থাকে। প্রভুর সংস্কৃতিকেই এরা জনসংস্কৃতির উপাদানের চাইতে বেশি উপাদেয় ভাবে। চিরায়ত মানবতা, ন্যায়বিচার ও অধিকারের মানদÐের চাইতে মতাদর্শের মানদÐকে চ‚ড়ান্ত করলে কি হয় তা বাংলাদেশের মিসরীয় মডেল বাস্তবায়নের যাত্রায় পরিষ্কার। মিসরে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রেখেছে তাদের সেনা-বুর্জোয়া শক্তি। মুরসির মৃত্যুর মধ্যে ইসরাইলি ঘাতকদের বিজয়ই সত্য। এই ঘাতকদের নিশানায় আমাদের মতো সব দেশের জনগণ এবং তাদের মধ্যমাপের নেতারাও আছে এবং হোসনি মোবারক আর এরশাদ টিকে আছেন। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইসলামী রাজনীতির ব্যর্থতাও উন্মোচিত হয়। ধর্ম-জাত-সম্প্রদায় না দেখে বৃহত্তর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী হওয়া এবং মধ্যপন্থার কৌশলে টেকসই হওয়ার বদলে এরাও তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতো আগে জনতাকে নিজেদের তৈরি করা মূল্যবোধের চাদরে-হিজাবে-শরিয়ায় ঢেকে দিতে গিয়ে নিজেদের পায়েই কুড়াল মারে। ঠিক যেমন বামেরাও বৈষম্য-বঞ্চনা দূর করার চাইতে আগে জোর দেয় তথাকথিত প্রগতিশীলতার উপর। উভয়েই মরে নিজেদের কামড়াকামড়িতে। যেমন ব্রাদারহুডকে ঠেকাতে গিয়ে মিসরের প্রগতিশীলরা জাতীয় শত্রæদের বশ হয়েছে। যারা সালভাদর আলেন্দের জন্য শোক করেন তাদের মুরসির মৃত্যুকেও গণতন্ত্রের সম্ভাবনা হত্যা হিসেবে দেখতে পারেন। মতবাদের চেয়ে দেশ, জাতি, মানুষ বড়। সেই বড়কে চিনতে হলে সংখ্যাগুরুকে সঙ্গে নিয়ে সংখ্যালঘুকে সামনে রেখে চলতে হয়। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]