জাহানারা ইমাম : মনে পড়ে

আমাদের নতুন সময় : 22/06/2019

শামীম আজাদ, লন্ডন থেকে

তাঁর এলিফেন্ট রোডের বাসা ‘কণিকা’র সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে রেলিঙ থেকে হাত সরাবার এবং সুশৃঙ্খল বসার স্পেসে পা দেবার আগেই রুমির লাইফ সাইজ ছবির সাথে দেখা হয়ে গেলো। এমন সুদর্শন যুবক আমি দেখিনি। এতো মায়াভরা অথচ কী দীপ্তিময় চাহনি! জামী আমেরিকায়। তিনি পাশের ঘরে। আমার সামনে ভেতরের ফ্যানের হাওয়ায় ঠুলে ওঠা পর্দা উঠছে আর নামছে। ভেতওে রেডিও চলছে। সেখানে কী যেন একটা গান চলছে, এতোদিন পর মনে করতে পারছি না। রুমির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাতে গোছা করে আমার তাঁতের শাড়ি একটু তুলে পা থেকে স্যান্ডেল ছাড়াচ্ছিলাম। হাওয়ার ভেতর থেকে আহব্বান এলো, “শামীম আমি একটু শুয়েছি। এসো মা, ভেতরে এসো।”
আমি কেঁপে উঠলাম, আমি শহীদ রুমির মা’কে দেখবো! আর আমি এক্ষুনি দেখবো, দেড় মিনিট পর। কাকে? যিনি একজন লেখক, প্রাক্তন শিক্ষক, বিচিত্রার দুর্দান্ত টিভি ক্রিটিক, দেশের অন্যতম এক নারী আইকন- জাহানারা ইমাম। স্টাইল, বিদ্যা, বুদ্ধি, সংযম, শিক্ষা, দয়া, আধুনিকতার প্রতীক এই নারী। আর এই সব আমি জেনেছি রুমির সহযোদ্ধা, বন্ধু এবং আমার আমার বন্ধু ফতেহ, বাদল, আলম, শাহাদত চৌধুরী প্রমুখের কাছ থেকে। তাঁরা সবাই এখন জাহানার ইমামের এক একজন রুমি। সবাই তাঁকে মা ডাকে। তাদের স্ত্রীরা- কবিতা, নায়লা, তোহিদা, সেলিনা সবাই তাঁর পুত্রবধূ। সকলেই শাশুড়ীজ্ঞানে আদর ও সেবাদান করেন। আমার জায়গা কোথায়? কিন্তু জায়গা পেলাম বড় স্পেশাল, তার কন্যার।
তিনি হলেন আমার ঈশিতা সজীবের মুক্তিনানী। আমার খালা এবং আজাদের প্রায় শাশুড়ী। সপ্তাহে একদিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজাদের মাকে দেখতে যান। যুদ্ধের সময় তাঁর পাশে দাঁড়ানো বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বলেন। তাঁকে দেখতে আমি তখনও কবি নই, উঠতি গদ্যকার। চিত্রালী ললনায় গল্প লিখি, টিভিতে রেডিওতে উপস্থাপনা ও আবৃত্তি করি। ঈশিতা পাঁচ বছরের প্রজাপতি, সজীব পৃথিবীতে মাত্র এসে ঘন পাপড়ি ভরা চোখ নিয়ে এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছে। আর আজাদ বাংলাদেশ টোব্যাকোর এক গম্ভীর একাউট্যাট। বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত শাহাদত চৌধুরী তখন আমার সদ্য বস হয়েছেন। মাত্র কিছুদিন হল ঢাকার ফাটাফাটি সাপ্তাহিক বিচিত্রায় টিভি রিভিউ লিখছি। আগে জাহানারা ইমাম লিখতেন। হঠাৎ করে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য আমেরিকায় পুত্র জামী ও পুত্রবধূ ফ্রিডার কাছে গেলে তার কলামটি লিখতে শুরু করেছিলাম আমি। বলা বাহুল্য, আমার সেই প্রথমদিককার টিভি জার্নালিজম নিয়ে এখন আমি গর্বিত নই। কারণ আমি নিজেই জানতাম, তাঁর সেই চনমনে হিউমারসমৃদ্ধ কলামের গোড়ায় পড়ে আমার লেখা গোঙাচ্ছে। কিন্তু এমন এক রোল মডেল আইকনের অনুপস্থিতিতে অনাহূত হয়ে আমি তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিলাম। চিকিৎসাশেষে ক্লান্ত খালা ফিরে এসেছেন। আজ তাঁকে দেখবো। এই সেই মেলাঘরের রুমি! ঘরের সবদিকে তাকালে মনে হয়, যেন এইমাত্র কেউ শিল্প ও সংস্কৃতির পালকে পরিষ্কার কওে গেছে এমন করে। নামী শিল্পীর অরিজিনালের পাশে কাঠ ও বেতের আশবাব, বইয়ের র‌্যাক। ডানদিকে তাকিয়ে মনে হলো, ওটা খাবারঘর হবে। আর তার সঙ্গে এই শোবার ঘর প্যারালাল। নিশ্চয়ই তার পাশে সেই স্মার্ট কিচেন। ফ্রিজের হাতল সুন্দর কাপড়ে ঢাকা। সিংকের কাছে হাঁড়ি ধরার ছোট ছোট বালিশ! আর বাঁদিক দিয়ে ছাদে উঠে গেলেই দেখতে পাবো পৃথিবীর সবচেয়ে সুগন্ধী বেলি। তা হাতে তুলে নিলে অর্ধেক করতল ভরে যাবে। কণিকার ছাদের চিলেকোঠা পৃথিবীর তাবৎ সুন্দর বইয়ের তাকে ঠাসা। সেখানে একটা ছোট চৌকি আর চেয়ারের পাশে চেয়ার! এ সবই দেখেছি আরো পরে। “শামীম এসো এসো, ভেতরে! আমি প্রবেশ করলাম শহিদ জননীর ঘরে। এই সেই এক মহাব্যক্তিত্বেও শোবার ঘর। সবই অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু কেমন যেন পয়মন্ত ও পরিষ্কার। প্রবেশ করতেই পাখার শব্দ বড় হয়ে গেলো। নদীর মাঝখানে যেমন নৌকা, তেমনি ঘরের ঠিক মধ্যিখানে তাঁর বিছানা। মাথার কাছে তাকভর্তি সাইড বোর্ড। বই, কলমদানি, লেখার জন্য ছোট ছোট চিরকূট, একটা চা-কাপ, সাদা লেসের ঢাকনা দেয়া পানির গøাস। লেসের প্রান্তের পুঁতিগুলো হাওয়ায়রিন করছে। নাকি সে শব্দ আমার মনে বেজেছিলো! আজ আর তাঁর স্মৃতি থেকে সেই রিন রিন শব্দ থেকে তাঁকে আর আলাদা করতে পারি না। ওমা! বিছানায় যে নরম তাঁতের শাড়ি পরা নারী, বহুযুগের অহংকার নিয়ে বালিশে লেপ্টে আছেন-তাঁকে যে দেখতে একদম আমার মা’র মতোই লাগছে। যেন কতো দেখেছি, কতো চেনা! আমাকে লক্ষ করে একটু উঠে বসলেন। মনে হলো পুরো ঘর ফুটে উঠলো। পরের মাসগুলোয় চারপাশ দেখেছিলাম তা তাঁর একাত্তরের ডায়েরী। লেখার টেবিল। কলম কেস। বসার চেয়ার। ঝাঁকড়া চুলের গাজী ভাই তখন সে সময়ের অন্যতম সাহিত্যসাপ্তাহিক ‘সচিত্র সন্ধানী’র সম্পাদক ও সন্ধানী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। তিনি এসে লেখা নিয়ে যাচ্ছেন নিয়মিত।
দেখলাম চিকিৎসার পর ক্লান্তির পাশে তাঁর অবয়বে লেখার অনন্য প্রত্যয়। সন্ধানীর লেখাটা নিয়ে কথা উঠাতেই উঠে বাঁদিকের লেখার টেবিলের ওপর থেকে ডায়েরী নিলেন। যে কোনো স্থানে খুললেন। তারপর তার সাংকেতিক নোটগুলো থেকে গল্প করতে শুরু করলেন। এখনকার দিনে আমরা যাকে বুলেট পয়েন্ট বলি, সেরকমই। তারিখের নীচে আকারে-ইঙ্গিতে লেখা, যাতে সে সময় আর্মির হাতে ধরা পড়লেও তাদের বাবার সাধ্য নেই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর দৈনন্দিন ও টাটকা ে যাগাযোগ বোঝে! আমরা দুজন হেঁটে রান্নাঘওে গেলাম। গ্যাসের বা ইলেকট্রিকের সাদা চুলো। কেটলিটার হাতলটা এলিয়ে পড়ে আছে। কিচেন ওয়ার্কিং স্পেস। বাইশ বা চব্বিশ ইঞ্চি উঁচু হবে। তারই মধ্যে রুপালি সিংক। চুলোর উলটো দিকে সেই কাপড়ে ঢাকা ফুলতোলা হাতলের বিশাল ফ্রিজ। কী আধুনিক! অথচ কতো আগে তাঁর ইঞ্জিনিয়ার স্বামী শরীফ খালুর করা। এতোক্ষণে মনে হলো, তিনি একটু টেনে কথা বলছেন। হয়তো ক্লান্তি, হয়তো স্মৃতিকাতরতা, হয়তো মন খারাপ দেশের কথা ভেবে। তবু কী সুন্দরীরে বাবা! রাহমান ভাই, হুমায়ূন ভাই ওঁরা তাঁকে সেই জ্বালাময়ী অবস্থায় দেখেছেন। ততোক্ষণে তিনি কবার আমাকে কাছে টেনে নিচ্ছেন। এ টানা শুধু মায়ের নয়। আমি তাঁর সুগন্ধ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, যেন আমার কোন্ জনমের সখি। তাঁর ত্বকের লাবণ্যে অবাক হয়ে বলি, এতো তারুণ্য? কী মাখেন? এবার কিশোরীর মতো কল কল করে বলেন, শুধু গিøসারিন আর গোলাপজল। সেই ছিলো আমার সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের প্রথম রোজ ওয়াটার। তারপর তারই সঙ্কেত ও সাহায্যে আমি গড়ে উঠতে থাকি। থাকি, এই বিলেতে চাকরি করতে আসার আগপর্যন্ত।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]