বৃহন্নলা

আমাদের নতুন সময় : 05/07/2019

কঙ্কন সরকার

অবশেষে ক্লান্তিজড়ানো দেহে খুঁজে পেলো সে বাসাটা। অনেকটা ঘরকুনো ভীতু স্বভাবের বাবুর এবারই এই শহরে প্রথম আসা। দূর-সম্পর্কের খালার বাসা। একটা চাকুরি-সংক্রান্ত কাজে এসেছে সে। দূর-সম্পর্কের হলেও খালার আতিথেয়তায় যেন ক্লান্তির ভাবটা নিমেষে দূর হলো। খাওয়া, গল্প, কুশল-বিনিময় হতে হতে বেশ রাত হলে দু’একবার হাই উঠলে ঘুমোতে যায় সে। নতুন বিছানা, সারাদিন ভ্রমণের ধকল, বাসা খুঁজে না পাওয়ার উৎকণ্ঠায় যেন ঘুম আসে, আসে না অবস্থা। হঠাৎ দরোজার খটখট শব্দ করে খালার ডাক। দরজা খুলতেই খালা প্রায় ধাক্কা দিয়ে ধমকের সুরে ঢুকে দিতে দিতে বলে, “এখানেই শোও, যত্তসব…।” বলতে বলতে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে যান উনি। বাবু কী দাঁড়িয়ে আছে? না, নেই! সে বোধ নেই তার। মেয়েমানুষের সাথে একই বিছানায় থাকতে হবে! ঘরে ঢুকেই বোরখা খুলে সে শুয়ে পড়ে বিছানায়। বাবু কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। বড্ড সংকোচে পেয়ে বসেছে তাকে। সে যেন আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে। নড়বার শক্তি হারিয়ে ফেলছে সে। অগত্যা বিছানার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চেয়ারে বসে বই হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে থাকে বাবু। মন! সে কী বইয়ে? কিন্তু উপায়? বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়। “কী, ঘুইমাবেন না?”
তারপর হেসে বলে, “আজকের রাতটুকইু শুধু। তবে ভোরের আগেই চইলে যামো।” একটানে কথাগুলো বলে সে আবারো শুয়ে পড়লো। ও হ্যাঁ হ্যাঁ বলে বাবু বলেÑএই একটুÑ? কিন্তু ওর ভেতরে নতুন এক বিষয় উঁকি দেয়! তা হলো কণ্ঠটি পুরুষালি না মেয়েলি! বই সামনে কিন্তু মন নতুন বিষয়ে…? আবারো কিছুক্ষণ চুপচাপ। এবার সে উঠে বসলো। বললোÑ “তাকান না আমার দিকে। তাকান!” ছ্যাৎ করে উঠল বাবুর বুকের ভেতর। তার ভেতরে সে আবার বলে উঠলোÑ‘তাকান’! Ñকী হইলো, তাকানÑবাবুর শরীর কাঁপছে। সাথে ঘামছেও। কী করবে ভাবতে ভাবতে তাকালো সে। Ñ ‘ভালো কইরে তাকান’ বলে হাসলো সে।Ñ ‘আরে? এ তোÑ’ কিছু বলতে না দিয়ে সে বললÑ‘হ, আমিই সেই।’ ভারী কণ্ঠে বলে সে, “বড় পরিত্যক্ত বাবা-মায়ের কাছে, পরিবারের কাছে, আত্মীয়-স্বজনের কাছে, সমাজের কাছে। কেউ কাছে রাইখতে চায় না। পরিচয় দিতি ভয় পায়! এইড়ে চলতে পছন্দ করে সব্বাই!” চোখ ছলছল করে ওঠে তার। সে আবারো বলে, “জানেন, যখন আমারে এ-অবস্থা বুঝতে পারে (কণ্ঠ আরো ভারী হয়ে ওঠে তার) কাপড় দিয়ে চোখ মুছে বলেÑ“বাবা-মা এইড়ে চলতি শুরু করে। কেমন কেমন আচরণ করতি থাকে।” ঢোক গিলে সে বলে, “এক রাতে আমাকে রেইখে আসে একখানে। জানেন, যেন আমাকে হাইরে ফেলি তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো!” থেমে বলে, “জানেন, আমার জায়গায় অন্য একজনকে দত্তক নেয় এবং এ-বাড়ি ছেইড়ে একটা অজুহাত দেইখে দূরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে কিছুদিন। কেননা অনেকে জেইনে যাবি যে আমি নেই! আর আমিও যেন না আসি এইখানে।” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেÑ“ওমা, একটা বেইজেছে? ঘুমান ঘুমান” বলে সে আবারো শুয়ে পড়লো। শুয়ে শুয়ে সে বললোÑ “থাকবেন কি আমার সাথে?”
কানে পড়তেই বই থেকে চোখ ওঠালো বাবু। কী বলবে ভেবে পায় না সে। ঝিমঝিম করে ওঠে ওর মাথা। সাথে শরীরটা যেন রি-র করে ওঠে। শোওয়ার প্রসঙ্গ পাল্ট সে বললÑ“জানেন? মন মানে না, বাবা-মা তো! তাই তো যখন দেখার জন্য মন প্রচÐ আকুল হয়ে ওঠে, তখন ছুইটে আসি।” আবারো চোখ মোছে সে। মুখে হাসির ভাব আনার চেষ্টা করে বললোÑ“বললাম না ভোর হইলেই চইলে যাবো। কারণ সকাল হলি আবার কেউ দেইখে ফেলার বিপদ! যা হোক বলে সে আবারো বললোÑ“জানেন? ওইখানে যাইয়ে নতুন এক সংগ্রাম। পিতা-মাতা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন ছেইড়ে নতুনকে মেনে নেয়া!” শব্দ করে হাসলো সে। হাসি থামিয়ে বললো, “ওখানকার যে প্রধান, তাকেই মা, তাকেই বাবা বইলে মেইনে নিয়েছি। আমার মতো অন্যদেরও মেইনে নিয়েছি ভাইবোন হিসাবে।” এভাবে চলতে থাকে তার জীবনের কথামালা। কখনো হাসি হাসিভাবে, কখনো কান্নাজড়ানো কণ্ঠে। আবার কখনো দাঁত কটমট করে বিদ্রোহী স্বরে, কখনো হতাশা আর বেদনার স্বরে…!
কখন যে ঘড়ির কাঁটা তিনটা পেরিয়ে গেছে! ওতে চোখ পড়তেই ‘ওমা’ বলে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। বোরখা পড়ে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে বলে, “আসি এইবার।” হাসির ভাব করে বলে, “আপনের ঘুম?”“না থাক থাক” বলে বাবু বলে, “ঘুমের চেয়েও বেশিকিছু পেয়েছি আমি!” তারপর সে বলে, “আপনার বাবা-মার সাথে দেখা করে যাবেন না?” সে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “কইনি, আমরা বড় পরিত্যক্ত!” খানিক দম নিয়ে বলে, “আমাদের পরিচয় কী, জানেন তো?” প্রায় চিৎকার করে বলে ওÑহিজড়াÑবৃহন্নলাÑ! দরজা খুলে চলে যায় সে। স্যান্ডেলের খটখট আওয়াজের মধ্যে বলে সে, “দরোজাটা ভেজিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়–ন।”এদিকে খালার ঘরের দরোজা খোলারও শব্দ পেলো সে।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]