• প্রচ্ছদ » » এনসিটিবির পাঠ্য বই গাইড বইয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে, এনসিটিবি খবর রাখে কি?


এনসিটিবির পাঠ্য বই গাইড বইয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে, এনসিটিবি খবর রাখে কি?

আমাদের নতুন সময় : 06/07/2019

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যতো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি ততো মনোবেদনা বেড়েই চলছে। এর জন্য আক্ষেপ কার কাছে করবো? সেই আক্ষেপ নিজের লেখালেখির মধ্যেই কমবেশি প্রকাশিত হয়। তবে মনোকষ্ট প্রশমিত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। আজ এনসিটিবির অনুমোদিত পাঠ্য বইয়ের হালচাল নিয়ে যৎসামান্য ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছি।
স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তকে কারিকুলাম প্রণয়ন, বই রচনা ও পুস্তক প্রকাশের দায়িত্ব এনসিটিবি নামক একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান পালন করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম প্রণয়ন ও পুস্তক রচনার সঙ্গে জড়িত থাকার সুযোগ আমার ঘটেছে অনেকবারই। সেই সুবাদে এনসিটিবি কর্তৃক বেশকিছু পাঠ্যপুস্তক লেখা এবং এর কারিকুলাম প্রণয়ন করার সুযোগ আমার ঘটেছে। সব সুযোগই যে সদ্ব্যবহার করতে পেরেছি তা বলতে পারবো না। তারপরও যষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে’র কারিকুলাম প্রণয়ন ও বিষয় রচনার দায়িত্ব পালন করেছি। একাদশ শ্রেণির ইতিহাস বিষয়ক একটি বই আমার ১৯৯৯ থেকে ২০১৪ সাল এবং ২০১৪ সাল থেকে বর্তমানে আরেকটি বই এনসিটিবির অনুমোদিত বই হিসেবে দেশে কলেজ পর্যায়ে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের হাতে রয়েছে। সবক’টি বই লেখার ক্ষেত্রে আমি চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের জানা ও বোঝার বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে ইতিহাসের মতো বিষয়কে পঠন-পাঠনে উপজীব্য করা। এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েক বছর থেকেই একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একাধিক বই অনুমোদন দিয়ে থাকে। এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের মহৎ উদ্দেশ্যে প্রতিফলন ঘটায় তখনই যখন বইগুলো মানসম্মত হয় এবং ছাত্রছাত্রীরা একাধিক বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এনসিটিবির এই সৎ উদ্দেশ্যটি আমাদের দেশে প্রকাশনা জগতের সঙ্গে জড়িত যারা তাদের অনেকেই শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পঠন-পাঠনের বিষয়কে বাদ দিয়ে নিজেদের ‘বাণিজ্য সুবিধা’ পেতে বইগুলোকে এনসিটিবির অনুমোদন ছাড়াই বছর বছর কলেবর বৃদ্ধি করছে। তবে সেই কলেবরটি মোটেও বইয়ের মান, তথ্য, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বৃদ্দি করার জন্য নয়। সম্প্রতি আমার নজরে এনসিটিবি কর্তৃক অনুমোদিত ইতিহাস বিষয়ের বেশ কয়েকটি বই পড়েছে। এই বইগুলো ৪/৫ বছর আগে এনসিটিবি যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে প্রকাশের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা সেগুলো প্রকাশ করেছে। বইগুলোর পেছনে প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংযোজনের পাশাপাশি বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে প্রশ্নপত্রে যেসব সৃজনশীল প্রশ্ন দেয়া থাকে তাতে পরীক্ষার্থীকে ক. জ্ঞানমূলক, খ. অনুধাবন মূলক, গ. সৃজনশীল এবং ঘ. উচ্চতর দক্ষতামূলক উত্তর লিখতে হয় হয়। দেখা যাচ্ছে এনসিটিবি কর্তৃক অনুমোদিত প্রায় সব বই-ই প্রতিবছর শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র এবং সেগুলোর সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর তুলে দিচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মূল বইয়ের ভেতরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ছে না। শিক্ষার্থীরা গাইড বইয়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর পড়েই যেমন পরীক্ষায় লিখে আসে এখানেও এনসিটিবি কর্তৃক অনুমোদিত পাঠ্যবইগুলো একই চরিত্রের হয়ে উঠেছে। এনসিটিবি যখন বইগুলো অনুমোদন দিয়েছিলো তখন প্রতিটি বিষয়ে বইয়ের নির্ধারিত পৃষ্ঠার বাধ্যবাধকতা ছিলো। সেই বইগুলোই প্রকাশকরা প্রতিবছর প্রশ্নপত্র এবং সেগুলোর উত্তর মিলিয়ে যেভাবে কলেবর বৃদ্ধি করেছে তাতে কোনো কোনো ২০০ পৃষ্ঠার বই এখন ৫০০ পৃষ্ঠায় গিয়ে ঠেকেছে। অদূর ভবিষ্যতে বইয়ের সেই স্বাস্থ্য বৃদ্ধি আরও ঘটতে থাকবে। কিন্তু এর ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বই পড়ার সামান্যতম অভ্যাস করার প্রয়োজনীয়তা মনে করবে না। অথচ লেখাপড়ার প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে পাঠ্য বইয়ের আদ্যপান্ত জেনেই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তর লিখবে। কিন্তু আমাদের এনসিটিবি কর্তৃক অনুমোদিত ও প্রকাশিত পাঠ্য বই এভাবে যে পাঠ্য বইয়ের চরিত্র হারিয়ে গাইড বইয়ে পরিণত হয়েছে সেই খবর কি এনসিটিবির জানা আছে? আমার জানামতে, এনসিটিবি কর্তৃক অনুমোদিত বইয়ের সংযোজন ও বিয়োজনে বিষয়টি এনসিটিবির অনুমোদনেই কেবল হতে হয়। আরও মজার বিষয় হলো কোনো কোনো পাঠ্য বইয়ে বিষয়বস্তুতে নির্ধারিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে লেখক বা প্রকাশক মনগড়া তথ্য দিয়ে অধ্যায়ের বিষয়বস্তুকে শুধু খর্বই করেননি ভুলভাবে ধারণা তৈরিতে ন্যক্কারজনক ভ‚মিকাও রাখছেন… এমন অভিযোগ করলে আশা করি কর্তৃপক্ষ বিব্রতবোধ করবেন না। আমার জানামতে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস দুই পত্রের (আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস) নবম অধ্যায়টির শিরোনাম হচ্ছে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। এই অধ্যায়ের লেখক কোন কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেবেন তা কারিকুলাম কর্তৃক নির্ধারিত যেমন এক্ষেত্রে বর্ণবাদের ধারণা, বর্ণবাদের আইনগত সংজ্ঞা, বর্ণবাদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বর্ণবাদী গণহত্যা, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব (মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ডেসমন্ড টুটু)। আমার জানামতে অনুমোদিত একটি পাঠ্য বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম যুক্ত করে যা লেখা হয়েছে তার সঙ্গে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের চাইতে বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের ধারণাই দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এটি কী করে সম্ভব হলো। বঙ্গবন্ধুকে এর মাধ্যমে জানার সুযোগ করে দেয়া হলো নাকি নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য লেখক প্রকাশক হীন এই কাজটি করলো। আমার কাছে এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আছে যে লেখকরা বিষয়বস্তু সম্পর্কে তেমন কিছু না জেনেই বইপুস্তক লিখছেন এবং বাজারে সেসব বই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশে কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা জীবনে কখনো না পড়েও অনেকেই ‘বাজারে চাহিদা আছে’ এমন লাভের আশায় যা খুশি তা লিখে বই ছেড়ে দিচ্ছে। সেগুলো কলেজের ছাত্রছাত্রীরা কতোটুকু পড়ছে জানি না তবে পরীক্ষায় সেসব বইয়ের প্রতিফলন ঘটছে। কথা হচ্ছে এসব বইয়ের কারা অনুমোদন দিচ্ছে, কারা নিয়ন্ত্রণ করছেন, কারা দেখভাল করছেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা আদৌ কিছু শিখছে কিনা, নাকি তাদের কিছুই না শিখিয়ে কীভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে শিক্ষা জীবনে উচ্চতর সনদ লাভের আয়োজন করতে বিনা বাধায় কাজ করে যাচ্ছে। এই অপকর্মের জবাব কে দেবেন? এসব বইপুস্তক প্রণেতা ও প্রকাশকদের আইনের আওতায় কে আনবে? যদি তা না করা যায় তাহলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আর কোনো এনসিটিবি নামক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন থাকে বলে মনে হয় না।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]