শুভ জন্মদিন ফ্রিদা কাহলো

আমাদের নতুন সময় : 06/07/2019

বাবলু ভট্টাচার্য : প্রতিধ্বনি যেভাবে ধ্বনিকে খোঁজে সেভাবেই ফ্রিদা খুঁজেছিলেন শরীরকে। তার স্ব-চিত্রগুলোর পরতে পরতে ঝর্ণার জলের নিচে অভ্রের ছুরির মতো ঝকঝক করে ওঠে তাঁর শরীর— ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত, যন্ত্রণাদীর্ণ, রক্তমাংসের স্তব্ধ, স্থির, হিমস্রোত— তার ফেটিশ, তার পৃথিবী। নিজের শরীর যে ফেটিশ বা পবিত্র প্রতীক হয়ে ওঠে তার কাছে— সংগত কারণ আছে তার। অসম্ভব অজাগতিক বিশাল এক জীবনব্যাপী যন্ত্রণার উৎস তার রক্তমাংস।
ফ্রিদা কাহলো মেক্সিকোর চিত্রশিল্পী। সৃজনশীল জগতের এক বিস্ময়। আজীবন বৈরী প্রতিবেশের মাঝে থেকেও নির্মাণ করে গেছেন আশাবাদের শৃঙ্গ। বলা যেতে পারে, তিনি একজন আত্মজৈবনিক চিত্রশিল্পী। কৈশোরের দুর্ঘটনা, মা হতে না-পারার অতৃপ্তি, জন্ম-মৃত্যুকেন্দ্রিক ভাবনা, ডিয়াগোর সঙ্গে ব্যক্তিজীবনের দ্বন্দ্বমুখর সম্পর্ক আর সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে উদ্ভূত কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ— এসবই তার ক্যানভাসের বিষয়, ব্যক্তি থেকে সমগ্রের কুলুজি সন্ধানের এক নিরন্তর অভিযাত্রা।
১৯১৩ সাল। ফ্রিদা কাহলো, ৬ বছরের শিশু। পোলিওতে সরু হয়ে গেল তার ডান পা, বেঁকে গেল পায়ের পাতা। খুঁতটুকু ঢাকা দিতে ছেলেদের মতো ট্রাউজার পরা শুরু করলেন, আর একটু বড় হয়ে পা ঢাকা মেক্সিকান পোশাক। যখন মেক্সিকো সিটিতে জার্মান কলেজের ছাত্রী, ফ্রিদা হয়ে উঠলেন এক দুর্দান্ত টমবয়। শৈশবের সেই ক্ষতকে তিনি বিজয়ী হতে দেননি।
১৯২২ সালে ফ্রিদা কাহালো প্রিপারেটোরিয়া প্রিমিয়ার স্কুলে ভর্তি হন। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। শিল্পী হওয়ার বাসনা তার ছিলো না। এ সময় মেক্সিকান ম্যুরাল মুভমেন্ট শুরু হয়। সরকার চার্চ, স্কুল, লাইব্রেরি ও সরকারি দালানে ম্যুরাল অঙ্কনে পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকে। এই সময়ই ফ্রিদা ডিয়াগো রিভেরা সম্পর্কে জানতে পারেন। ডিয়াগো তখন স্কুলের লেকচার হলে ‘ক্রিয়েশন’ ম্যুরাল অঙ্কনে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঈশ্বর নির্বাচিত করলেন ফ্রিদাকে চিত্রশিল্পী হিসেবে। বৃষ্টির দিনে মেক্সিকো সিটি থেকে কোরোকান যাওয়ার পথে; সঙ্গে বন্ধু আলেকজান্দ্রো গোমেজ— দ্রুতগামী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা খেল বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা ইলেকট্রিক ট্রলির সঙ্গে। চিৎকার, কান্না, রক্তস্রোত। একটা মোটা লোহার পাত ফ্রিদার শিরদাঁড়া চূর্ণ করে, তলপেট জনন অঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে বেরিয়ে এসেছে রক্ত ক্লেদ মাংস মাখামাখি হয়ে। পরে দেখা গেল এ ছাড়া ফ্রিদার কাঁধ, পাঁজরের দুটো হাড় ভেঙেছে। এগারো টুকরো হয়ে গেছে ডান পায়ের হাড়, পায়ের পাতা ভেঙে দুমড়ে গেছে। ঈশ্বরের নির্বাচন প্রাথমিকভাবে শেষ হলো।
ক্রুশ কাঠের মতোই এক যন্ত্রণাময় শক্ত ফ্রেমে তিন মাস আটকে থাকলেন ফ্রিদা। অসাধারণ মনের জোরে বেঁচে উঠলেন, হাঁটাচলার শক্তিও অল্প অল্প ফিরে এলো। প্রায় অলৌকিক যেন তাঁর এই ভস্ম থেকে ফের পাখির শরীর নিয়ে উড়ে আসা। কিন্তু তীব্র সর্বাত্মক, দুমড়ে-মুচড়ে পাগল করে দেওয়া যন্ত্রণা, ক্লান্তি, দুর্বলতা সারাজীবন আর মুক্তি দিল না তাকে। পরের ঊনত্রিশ বছরে বত্রিশবার অপারেশন সহ্য করতে হয়েছে তাকে, যার বেশিরভাগই মেরুদ-ে, পেলভিসে আর ডান পায়ে। এই সময় বাবা গুইলেরমো রঙের বাক্স এবং তুলি তুলে দেন ফ্রিদার হাতে। ছবি আঁকতে উদ্ভুদ্ধ করেন তাকে।
নবাগত শিল্পী হিসেবে তিনি প্রিয় শিল্পী ডিয়াগো রিভেরার কাছে যান এবং নিজের শিল্প বিষয়ে জানতে চান। রিভেরা প্রথমেই ফ্রিদার প্রতিভা স্পর্শ করতে পারে। ফ্রিদার চিত্রের চমৎকার প্রকাশভঙ্গি, বিশেষভাবে দুর্লভ মেক্সিকীয় রীতির কাজ রিভেরাকে টানে। রিভেরা ফ্রিদাকে উৎসাহ জোগান। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে হৃদ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯২৯ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন ফ্রিদার বয়স ২২ আর রিভেরার ৪২। ফ্রিদার বাবা মেনে নিলেও মা এ সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি।
তাদের বিবাহজীবন ছিল তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ। ফ্রিদা ও রিভেরা উভয়েই নানা হঠকারিতা ও বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এসব সম্পর্কের পরম্পরায় এক সময় তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
১৯২৬ সালে ফ্রিদা প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি আঁকেন ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট ইন এ ভেলভেট ড্রেস’। ইউরোপিয়ান রেনেসাঁস মাস্টারদের কাজ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত উনিশ শতকের মেক্সিকান প্রতিকৃতি শিল্পীদের রীতিতে এটি আঁকা।
সাতচল্লিশ বছরের জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় তাকে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে রক্তস্রোত ঝরিয়ে যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন বেহুঁশ হয়ে কাটাতে হয়েছে। যন্ত্রণাকে ভুলতে ডুবে থেকেছেন মেক্সিকান মদ ‘টাকিলা’য়। নানা ধরনের মাদক আর সিগারেটে। কোনো বন্ধু নেই, সঙ্গী নেই। ছোটবেলায় নার্সের হাতে বেড়ে ওঠা। মায়ের প্রতি কোনো অনুভূতি নেই। বাবা ব্যস্ত তার কাজের পৃথিবীতে। এক অদ্ভুত কাজ করলো সে। নিজের অস্তিত্বকে দ্বিখ-িত করে সৃজন করলো কাল্পনিক এক বন্ধু। নিজের যন্ত্রণা, হতাশা, অবরুদ্ধ স্বপ্ন ও বাসনার জগৎ খুলে দিলো তার কাছে। কোমরের ঊর্ধ্বাংশ অনাবৃত নার্সটির মুখের জায়গায় প্রি-কলাম্বিয়ান টিওটিহায়াকান মুখোশ— যেখানে মিশে যায় ম্যাডোনা ও শিশুর বাইবেলীয় অনুষঙ্গের সঙ্গে আদিম মাতৃকা রূপ। যৌনতা, মাতৃত্ব ও মৃত্যু একাকার হয়ে যায় এখানে।
১৯৫৩ এর বসন্তে জীবিতাবস্থায় ফ্রিদার একমাত্র চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় মেক্সিকোতে। ফ্রিদার শরীর খুবই খারাপ হয়ে গেছে। ডাক্তার নিষেধ করেছেন প্রদর্শনীতে যেতে।
গ্যাংগ্রিনের ইনফেকশনের কারণে ঐ বছরেই ফ্রিদার ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা হয়। এই ঘটনায় তিনি খুবই বিপর্যস্ত, হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েন। আত্মহত্যার ইচ্ছা প্রবল হয়ে ওঠে তার। ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই ফ্রিদা মৃত্যুবরণ করেন। অফিসিয়ালি কোন পরীক্ষা কিংবা তদন্ত হয়নি, কিন্তু গুজব ছড়ায় ফ্রিদা আত্মহত্যা করেছে! ডায়েরিতে তার শেষ লেখা ছিলো ‘ও যড়ঢ়ব ঃযব ষরারহম রং লড়ুভঁষ ধহফ ও যড়ঢ়ব হবাবৎ ঃড় ৎবঃঁৎহ.’
ফ্রিদার ছবির বিষয়বস্তুতে যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি তিনি হচ্ছেন তার নিজের জীবন। নিজের বাস্তব জীবনের ঘটনা অনুষঙ্গ নিয়ে তিনি আত্মজীবনী এঁকেছেন ক্যানভাসে। এই অসাধারণ শিল্পীর জীবন এবং কাজকে আলাদা করা অসম্ভব। তার ছবিই তার জীবনী। তার কাজগুলো প্রায়ই দর্শককে এক ধরনের কষ্টের অনুভূতির মুখোমুখি করে। অন্যভাবে বললে তার ছবিগুলো যেন তার ব্যথারই প্রতিকৃতি।
ফ্রিদার আঁকা ১৪৩টি পেইন্টিং-এর মধ্যে ৫০টিই তার নিজের প্রতিকৃতি— যার মধ্যে প্রায়শই প্রকাশিত হয়েছে তার শারীরিক এবং মানসিক ক্ষত। বিশেষত তার শারীরিক অবস্থা, সন্তান ধারণে অক্ষমতা, প্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কিত দর্শন আর সবার উপরে দিয়েগোর সাথে অশান্ত-উদ্বেগপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত আবেগ এবং অনুভব ধারণ করে আছে। তার ছবির আসল ক্লু থাকে ছবির পশ্চাৎপটে (ব্যাকগ্রাউন্ড), ছবির রঙে, ছবির থিম এবং স্টাইলে। প্রত্যেকটি আত্মপ্রতিকৃতিতে এক একটা গল্প আছে বলার। ফ্রিদা কাহলো ১৯০৭ সালের আজকের দিনে (৬ জুলাই) মেক্সিকো সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]