মিডলাইফ ক্রাইসিস

আমাদের নতুন সময় : 07/07/2019

মো. শামসুল ইসলাম

খুব সম্প্রতি পুরনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছিলাম। কথা প্রসঙ্গে আমরা একমত হলাম যে আমরা মিডলাইফ ক্রাইসিসে ভুগছি। মধ্যবয়সের সংকট নিয়ে আমি ফেসবুকে একবার একটা লেখা লিখেছিলাম। আসলে পুরুষদের এই সংকট নাকি দীর্ঘমেয়াদি… ৪৩ থেকে ৬০ এর মধ্যে নাকি যেকোনো সময় প্রায় দশ বছর থাকতে পারে। নারীদের অপেক্ষাকৃত কম… পাঁচ বছর ভুগতে পারেন। এটি এমন একটি সংকট যখন একজন তার জীবনকে অন্যভাবে দেখা শুরু করেন। জীবনে সফল বা ব্যর্থ এটা নিয়ে আর কোনো মাথাব্যথা থাকে না। জীবনের লক্ষ্য হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। এমন কিছু পরিবর্তন আসে জীবনে এ সময় যা মেনে নেয়া কষ্টকর। শরীরে রোগ বাসা বাঁধা শুরু করে। যমে মানুষে টানাটানি শুরু হয়। ঔষধ ইত্যাদির মাধ্যমে জীবনকে করতে হয় নিয়ন্ত্রিত। খাদ্যাভাসে আনতে হয় ব্যাপক পরিবর্তন। একসময় ফ্রাইড চিকেন আর চিপস আমার পছন্দের খাবার থাকলেও এখন তা প্রায় বাদ দিতে হয়েছে। রেড মিট তো খাই না। খাবার তালিকা এখন অনেক সংক্ষিপ্ত।
বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সম্পর্কেও চলে টানাপড়েন। পুরানো সম্পর্কের গভীরতা আর থাকে না। একেকজনের সোশ্যাল স্ট্যাটাস হয় একেক রকম। স্বার্থপর আর কিছুটা ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ি আমরা অনেকে এই বয়সে। তারুণ্যের উদারতা আর চপলতা হারিয়ে যায়। এটাই আসলে আমাকে বেশি মনঃকষ্টে ফেলে। অনেকদিন পর হয়তো এক পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো… আমি হয়তো অনেক আগ্রহ নিয়ে অতীত জীবনের একটা হাসির কথা বললাম। সে মুখ গম্ভীর করে বললো তোর তো কোনো পরিবর্তন দেখছি না। অর্থাৎ আমাদের বয়স হচ্ছে আমাদের হাসি-তামাশা বাদ দিতে হবে! আবার অনেকে হয়ে পড়ে বেশি বন্ধুবৎসল। যেকোনো উপলক্ষে ডাকাডাকি করে। এটা বেশ উপভোগ করি। এদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে মনে হয় যেন পুরানো দিনগুলোতে ফিরে গেছি। কিছু ব্যতিক্রমও ঘটে। যেমন বয়সে আমার ছোট আমার খুবই ঘনিষ্ঠ এক বুদ্ধিজীবী বন্ধুর কাছে গেলে তার স্কুল পড়ুয়া মেয়ের কৃতিত্বের বিভিন্ন গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। একদিন তো তার মেয়ের ইংরেজিতে লেখা পুরো একটা কবিতা শুনে আমাকে ভীষণ পুলকিত হবার ভান করতে হলো!
তরুণরাও আমাদের বয়সী লোকজন নিয়ে হয় বিব্রত। এই সপ্তাহখানেক আগে এক পুরানো বন্ধুর সঙ্গে বাসার কাছে এক ক্যাফেতে ঢুকলাম। পরিচিত এক অল্পবয়স্ক মেয়ে আমাকে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লো… আঙ্কেল বলে সালাম দিলো, চোখে-মুখে বিস্ময়… এ বয়সী লোকজন এখানে কেন? আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, তুমি এখানে কেন? বলা বাহুল্য সে এসেছে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিতে। আমাদের মতো উপদেশদাতা বয়সের লোকজন তো তাদের পছন্দ হবার কোনো কারণ নেই। আগে যে কোনো মুভি গ্রোগ্রাসে গিলতাম। এখন সব সিনেমা বা নাটক ভালো লাগে না। বেশ কিছুদিন আগে জুলিয়া রবার্টসের নটিংহিল ছবিটা আবার দেখতে বসলাম। আগে বোধহয় কয়েকবার দেখেছি। কিন্তু এখন দেখলাম আগের মতো আর উপভোগ করছি না। আশপাশে বিভিন্ন ঘনিষ্ঠ লোকের মৃত্যু, অসুস্থতা ইত্যাদি এ বয়সের মানুষকে কিছুটা ধর্মাশ্রয়ী করে তুলে। একেকজন একেকভাবে জীবনের অর্থ খোঁজা শুরু করেন। আমি অনেক চিন্তা করে দেখলাম এ বয়সে ভালো থাকার একটি অন্যতম পন্থা হচ্ছে নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যের সেবা করা, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকা। অবশ্য টাকা পয়সা না থাকলে এটা করাও বেশ কষ্টকর আমাদের দেশে। অনেকে এটাকে আবার সন্দেহের চোখে দেখেন। মতলব খুঁজেন। মান-সম্মানের মাথা খেয়ে আমি নিজেও শিশুদের দুই-একটি প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে চেয়েছি। সাড়া পাইনি। যদিও বিদেশে এটি একটি জনপ্রিয় ধারণা। ফেসবুকে ছাত্রছাত্রী বা তরুণ সাংবাদিকদের জন্য তাই মাঝে মাঝে লিখি। তাও নাকি অনেকে পছন্দ করেন না। তাদের প্রশ্ন : কে তুমি জ্ঞান দেবার? কি আছে তোমার? মাঝে মাঝে তাই চিন্তিত হয়ে পড়ি এটা ভেবে যে, এ জীবনে মানুষের কল্যাণে আমি কি করলাম! বিধাতার কাছে কি জবাব দিবো। মধ্যবয়সের এ চিন্তাই বোধহয় আমার জন্য সবচেয়ে বড় কষ্টদায়ক। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]