• প্রচ্ছদ » » বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার একমাত্র মেয়েকে আকাশ দেখাবে


বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার একমাত্র মেয়েকে আকাশ দেখাবে

আমাদের নতুন সময় : 08/07/2019

তুরিন আফরোজ

আমি নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নের চাওড়াডাঙ্গী নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়ে। আমার বড় চাচা (ফজল কাকু) এখনো জলঢাকার ক্ষেতে নিজে জমি চাষ করেন। আমার ছোট চাচা (মাজুল কাকু) ঢাকাতে থাকলেও নিয়মিত গ্রামে যাতায়াত করেন তার নিজ জমিজমা দেখাশোনা করতে। আমার বাবার (বাপীর) জলঢাকার সব কৃষি জমি গত ১৪ বছর ধরে আমি দেখাশোনা করে আসছি। আমার বাপী জীবনের শেষ দিনগুলো জলঢাকাতে কাটাতে চেয়েছিলো। বাপীর জন্য আমি নিজে আমাদের ভিটায় একটি আধুনিক টিনশেডের বাড়ি তৈরি করে দিই। বাড়ির নাম দিই, ‘মাসিরন’। এটি আমার বাপীর নিজের মায়ের নাম। আমি আমার নিজের দাদী মোছাঃ মাসিরনকে কোনোদিন দেখিনি কারণ আমার বাপীর যখন ১০ বছর বয়স ছিলো তখন আমার নিজের দাদী মারা যান। কিন্তু আমি সারাজীবন বাপীকে দেখেছি নারী শিক্ষার জন্য এবং নারীর সমান অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকতে।
আমার গ্রামের কোনো মেয়ে আমার মতো এতো পড়ালেখা করার সুযোগ পায়নি। আমার বাপী স্বপ্ন দেখেছিলো তার একমাত্র মেয়েকে আকাশ দেখাবে। আমার পড়ালেখা আর কাজের প্রতি তার উৎসাহ ছিলো অফুরন্ত। বাপী আমার মেয়ে তেজস্বীকে নিয়েও স্বপ্ন দেখতো। আমার মেয়ে যেন গ্রামে গেলে খেলতে পারে তার জন্য একটি বাগান বাড়ি বানানোর জমিও আমাকে লিখে দেয় ঠিক আমাদের পারিবারিক গোরস্তানের পাশেই। বাগান বাড়ির নামটিও বাপী দিয়ে যায়, ‘তেজস্বীপ্রিয়া’। বাপী বলতো, সে মারা গেলে আমি যেন তেজস্বীকে নিয়ে বাপীর গ্রামটাতে আসা বন্ধ না করে দিই। বাপী যেন কবর থেকেই তেজস্বীর বাগানের গাছগুলোর দেখাশোনা করতে পারে, তেজস্বীকে সেই বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখতে পারে। কি অদ্ভুত ব্যাপার তাই না? সবাই আমাকে বলে লড়াকু। কিন্তু একটি পুরুষশাসিত সমাজে এক প্রত্যন্ত গ্রামের পুরুষের কাছে এ ধরনের মন-মানসিকতা আশা করা একেবারেই অসম্ভব। বাপী আসলে নিজে একজন দৃষ্টান্ত। ছোট বয়সে মাহারা একটি ছেলে মা-জাতিকে সম্মান কী করে করতে হয় তা সে জানতো। আমি তো মায়ের আঁচলে বড় হওয়া অনেক ডিগ্রিধারী পুরুষকে দেখি কী করে একজন নারীকে পুরুষতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষে মারতে হয় তার সব ছলাকলা মুখস্থ করে রেখেছে। বাপীর মতো লড়াকু কজন পাওয়া যায়?
শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য আমি মাত্র কিছুদিন আগে একটি বিদেশি পুরস্কার পেয়েছি। আমার জলঢাকার মানুষজন খুশিতে কেক-উৎসব উদ্যাপন করেছে। আমি যেতে পারিনি কাজের কারণে। কিন্তু একটা জিনিস মনে হয়েছে, বাপী এিলা ওই উৎসবে। কেউ দেখতে পায়নি তাকে। কিন্তু আমি জানি বাপী সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বাপীর জলঢাকার মানুষজন তার মেয়েকে হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছে… বাপীর কাছে এর চেয়ে আর খুশির কী হতে পারে? আমি নিজেও খুশি… আমি কৃতজ্ঞ জলঢাকার মাটির কাছে, বাপীকে পেয়েছি, এতো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। আমার খুশিতে তারা আত্মহারা হয়, আমার কষ্টে তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। জয় জলঢাকা।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]