• প্রচ্ছদ » » মানুষ নিজেই কেবল নিজের সমস্যা সমাধান করতে পারে


মানুষ নিজেই কেবল নিজের সমস্যা সমাধান করতে পারে

আমাদের নতুন সময় : 08/07/2019

সাদিয়া নাসরিন

ক’দিন বেশ স্যাঁতস্যাঁতে ভাব কাটিয়ে আজ বেশ রোদ উঠেছিলো শরীর আর মনে। মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম বেশ ফুরফুরে মেজাজে। ক্যান্টনমেন্ট পার হতেই ম্যাসেঞ্জারে পরপ র বেশ ক’টা টেক্সট করলো একটি মেয়ে। কথা বলতে চায়। আমি নম্বর দিয়ে বললাম ঘণ্টাখানেক পরে কল দিতে। বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই কল দিলো। কথা শুরু করলোই অঝোর কান্নায়। সব শুনলাম। কথা বললাম। এক্সপ্লয়টেশন, ইনসিকিউরিটি, ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স সব মিলিয়ে কমপ্লিকেটেড রিলেশনশিপ। ছাড়তেও পারছে না, ধরতেও না। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কতো বয়স মেয়েটির! পঁচিশ-ছাব্বিশ! তরতাজা একটি মেয়ে কি পরিমাণ পাজল্ড!
মানুষের এ রকম ভয়ংকর আবেগীয় অবস্থার সঙ্গে আমার খুব ভালো পরিচয় আছে। তাই এই মেয়েগুলো যখন অঝোরে কাঁদে, আমি আগে চাই তারা কাঁদুক। তাদের সমস্যা সমাধান আমি করতে পারি না। সে ক্ষমতা আমার নেই। সে চেষ্টাও আমি করি না। আমি শুধু আমার জীবনের কথা তাদের শোনাই। এই সত্য আমি আমার জীবন থেকে শিখেছি।
এই এক জীবনে নিজে ইনফিরিয়র থেকে দেখেছি, সুপিরিয়র পার্টনার কীভাবে উপেক্ষা করতে পারে, নিজে সাবমিসিভ হয়ে দেখেছি সাবমিশনকে পার্টনার কতোটা গ্রান্টেড ধরে নিতে পারে! কতো ঠাÐা মাথায় আমাদের কনফিডেন্স লেভেল শেষ করে দিতে পারে আমাদের সঙ্গীরা, সেটা আমার চাইতে ভালো কে জানে আর! আবার এই এক জীবনেই নিজেকে সুপিরিয়র অবস্থায় নিয়ে এসে দেখেছি পার্টনার ইনফিরিয়র কমপ্লেক্সে ভুগলে সে চাপও কীভাবে আমাদেরই নিতে হয়।
এ এক অনিবার্য ক্ষরণের দায়বদ্ধতা। তবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না করে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেগোসিয়েশন করতে পারলে যে সম্পর্কে শেষ পর্যন্ত বোঝাপড়া আর সমতার ভারসাম্য আনা যায়, সেও এই এক জীবনেরই শিখন। যখন এই মেয়েটি কাঁদছিলো আর বলছিলো, ‘আমাকে কেউ ভালোবাসে না, আমাকে সবসময় শেইমিং করে সবাই, সারাক্ষণ আমার বয়ফ্রেন্ড অন্যদের সঙ্গে কম্পেয়ার করে, আমার একজনও বেস্ট ফ্রেন্ড নেই’… আমি কি তখন ওকে বলছিলাম না নিজেকে বলছিলাম জানি না, তবে বলছিলাম, জানেন, আমাকে কেউ ভালোবাসে কিনা, আমি তা থোড়াই কেয়ার করি। কারণ আমাকে আমি ভালোবাসি। একটি ফোন না এলেও আমার এখন আর একলা লাগে না, কারণ ওই সময়টুকু আমি নিজেকে কাছে পাই। আমার কোনো বন্ধু নেই, সেই প্রয়োজনই নেই আমার। আমার ল্যাপটপ, আমার কাজ, আমার লেখালেখি, আমার সন্তান, একটা ভালো বই, প্রিয় গান আর একটা লং ড্রাইভ… ব্যস! সময় কোথায় আমার বন্ধু খুঁজে বেড়ানোর? আর বেস্ট ফ্রেন্ড বিষয়টাই একটা ধাপ্পা। আমার চাইতে বিশ্বস্ত বন্ধু তো কাউকে দেখিনা আমি! সবাই ছেড়ে গেলেও যে আমাকে ছেড়ে কখনো যাবে না সে তো এই আমিই! হ্যাঁ আমারও মাঝে মাঝে ভীষণ রকমের ভাঙচুর হয়, আমিও রক্তাক্ত হই। তবে আমি সেসব ভয়ংকর দুঃসময়ে নিজের সঙ্গে কথা বলতে জানি। নিজেকে নিজে সাহস দেই, একা লাগলে নিজেকে নিজে সময় দেই। সমস্যাগুলোকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে এনালাইসিস করি। অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, নিজের সঙ্গে কথা বলার কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প নেই নিজেকে ভালোবাসার। যেদিন নিজেকে আবার বলি, শুধুমাত্র নিজেকে ভালোবাসতে পারবে মেয়েরা সেদিন জীবনের অর্ধেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হবে।
এই বিশ্বব্রহ্মাÐে বাবা, মা, স্বামী, পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন, প্রেমিক, বন্ধু কেউই আমার নয়, আমিই কেবল আমার, এই সত্য, কেবল এই একটি সত্যের জোরে আমি আমাকে নিয়ে বাঁচতে শিখেছি। যখনই আঘাত এসেছে, যার কাছ থেকেই হোক না কেন তাকে প্রতিরোধ করেছি। নিজেকে ভালো না বাসা অবধি সে প্রতিরোধের শক্তি আসেনি, জানেন তো! নিজেকে না সম্মান করলে, না ভালোবাসলে সব মেনে নিতে ইচ্ছে করে কেবল। তো নিজেই যদি নিজেকে তুচ্ছ করে তুলি, অ্যাভেইলেবল করে ফেলি, তাহলে কার ঠেকা পড়েছে আমাকে মূল্য দেবার? প্রেমিক উপেক্ষা করে? স্বামী অন্য মেয়ের সঙ্গে সময় কাটায়? সন্দেহ করে? কম্পেয়ার করে? অপমান করে? ধুর! যেতে দিন। কারো জীবনে আপনার জায়গা নেই এটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে তার জায়গাটাও সরিয়ে দিতে শিখুন। উপেক্ষা করতে শিখুন। মনে রাখবেন উপেক্ষার চেয়ে বড় শাস্তি আর হয় না। উন্নাসিক হতে শিখুন। নিজেকে কনসেন্ট্রেড করুন। যোগ্য করে তুলুন। দুর্মূল্য করে তুলুন। দিন শেষে নিজের যোগ্যতা আর সক্ষমতার চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। প্রয়োজনে শূন্যস্থান থাক, কিন্তু কাচে যে খুশি হয় তাকে হীরার খনি তুলে দিলে নিজেরই অবমাননা হয় যে!
বডি শেইমিং করে? তার শরীর যে আপনার চাহিদামতো খাঁজকাটা নয় সেটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে শুরু করুন। ‘আপনার শরীর, মোটা থাকবেন নাকি শুকাবেন সেটা একেবারেই আপনার সিদ্ধান্ত, তার পছন্দে তা চলবে না… এই কথাটা মুখের উপর বলতে শিখতে হবে। নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে হবে নিজের আত্মবিশ্বাসের জন্যই, বয়ফ্রেন্ড কিংবা পার্টনারকে খুশি করার জন্য নয়।
জানি যতো সহজে কথাগুলো বলছি ততোটা সহজ নয় করাটা। কিন্তু অসম্ভব নয়। আপাতত কষ্ট হবে। খুব কষ্ট হবে। কিন্তু পারবেন শেষ পর্যন্ত। পারবেনই। কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। পুত্রশোকে কাতর মাও একসময় জীবনে ফেরে। সময় সব ক্ষত মুছে দেয়। তাই সময় দিন, সময় নিন। কেঁদেকেটে নিজেকে হালকা করতেই পারেন আপনি। কিন্তু সবশেষে নিজের কাছেই ফিরতে হবে আপনাকে। মনে রাখবেন, কেবল নিজেকে প্রমাণ করেই সব অপমান, অবমান, উপেক্ষা, অত্যাচারের জবাব দেয়া যায়। লড়াইটা জারি রাখতে পারলেই কেবল জয়ের মঞ্চে উঠে দাঁড়ানো যায়। মঞ্চ আপনার জন্য প্রস্তুত। সে মঞ্চে আপনি উঠবেন নাকি মুখ বুজে হারতে থাকবেন সে সিদ্ধান্ত আপনার।(পরিস্থিতিগুলো ঘুরেফিরে আসে বলেই এসব লেখাগুলোও প্রাসঙ্গিকতা হারায় না। আহা! যদি এসব লেখা প্রাসঙ্গিকতা হারাতো!) ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]