শুভ জন্মদিন কমরেড জ্যোতি বসু

আমাদের নতুন সময় : 08/07/2019

বাবলু ভট্টাচার্য

তাকে অনেকে গণআন্দোলনের নেতা বা পার্লামেন্টেরিয়ান অথবা সফল মুখ্যমন্ত্রীরূপে দেখে থাকেন। এটা খÐিত দেখা। তিনি ছিলেন প্রধানত এবং মূলত কমিউনিস্ট বিপ্লবী। মতাদর্শের ক্ষেত্রে তার অবস্থান ছিলো খুবই স্বচ্ছ। মার্কসীয় মতাদর্শের মর্মবস্তুকে তিনি বুঝতেন এবং সার্থকভাবে প্রয়োগ করতে পারতেন। মার্কসবাদে তার দখল ছিলো আর সেইসঙ্গে ছিলো প্রখর বাস্তব জ্ঞান। সবটা মিলিয়েই তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট গণনেতা, যার জনপ্রিয়তা ছিলো প্রায় আকাশ ছোঁয়া। তিনি শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসু।
এক শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। তিনি লেখাপড়া করেছেন কলকাতার অভিজাত স্কুল ও কলেজে। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএ পাস করেছেন প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে। তখনো তিনি মার্কসবাদের সংস্পর্শে আসেননি। তার পরিবারের মধ্যে স্বদেশি ও বৃটিশ বিরোধী চেতনাবোধ ছিল যা স্বাভাবিক কারণেই বালক ও তরুণ জ্যোতি বসুর মধ্যে সঞ্চায়িত হয়েছিলো। তার পিতার সঙ্গে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী অনুশীলন সমিতির সদস্যদের সঙ্গে তার পৈত্রিক পরিবারের যোগাযোগ ছিলো। একবার কলকাতায় সুভাষচন্দ্র বসুর সভায় গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠিচার্জে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
কলকাতার পড়াশোনা শেষে তিনি লন্ডন গিয়েছিলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। বিলাত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে তিনি দেশে ফিরে আসলেন, কিন্তু ব্যারিস্টারি করলেন না। তিনি হলেন কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী। বিলাতে থাকাকালীন তিনি ব্যারিস্টারি পাস করার পাশাপাশি আরেকটি অনেক বড় অর্জন করেছিলেন। তাহলো মার্কসবাদে দীক্ষা গ্রহণ। গ্রেট ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির হ্যারি পাল্টি, রজনীপাম দত্ত, বেন ব্রেডলি প্রমুখ তাকে সাহায্য করেছিলেন মার্কসবাদে শিক্ষিত করে তুলতে। উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান ব্যারিস্টার জ্যোতি বসু দেশে ফিরে আসলেন কমিউনিস্ট হয়ে। কমরেড মোজাফফর আহমদ তাকে কমিউনিস্ট হিসেবে কাজ করার পথ দেখালেন। প্রথমে তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। রেলওয়ে শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নে কাজ শুরু করেন।
কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়া ব্যারিস্টার জ্যোতি বসু ট্রামে-বাসে-রাস্তায় পার্টির পত্রিকা বিক্রি করেছেন। রেলওয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত করতে নানা জায়গায় ঘুরেছেন। শ্রমিক বস্তিতে থেকেছেন। এইভাবে তিনি নিজেকে শ্রেণিচ্যুত করেছিলেন।
কমরেড জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবনকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বে ব্রিটিশ আমলে শ্রমিক আন্দোলন। দ্বিতীয় পর্বে সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধীদলের ভ‚মিকা পালন। এই পার্টি শুরু হয়েছিলো ১৯৪৬ সাল থেকে। সংসদীয় সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি রাস্তায় সংগ্রামও করেছেন। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কংগ্রেস সরকার বিরোধী গণআন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এই সময় খাদ্য আন্দোলন খুবই ব্যাপক ও জঙ্গি রূপ নিয়েছিল যার পুরোভাগে যারা ছিলেন তাদের অন্যতম কমরেড জ্যোতি বসু। তৃতীয় পর্বটি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একটি রাজ্য পরিচালনা করা। টানা ২৪ বছর ধরে বারবার নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। পরে বার্ধক্যের কারণে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বটি তুলে দেন তারই দলের কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টচার্যের হাতে।
১৯৪৬ সালে রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে বঙ্গীয় পরিষদে (তখন বাংলা বিভক্ত হয়নি, দুই বাংলা মিলে ব্রিটিশ ভারতে একটি প্রদেশ হিসেবে ছিলো) আর দুইজন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন দার্জিলিংয়ের চা শ্রমিক নেতা রতনলাল ব্রাক্ষণ এবং দিনাজপুরের কৃষক নেতা রূপনারায়ণ রায়। বঙ্গীয় পরিষদে মাত্র তিনজন সদস্য নিয়ে ছিলো কমিউনিস্টদের ছোট গ্রæপ যার নেতা ছিলেন জ্যোতি বসু।
রেল শ্রমিক নেতা জ্যোতিবসু এই ছোট গ্রæপ নিয়েও সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছিলেন। তিনি সংসদীয় রাজনীতির মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েননি। সুখ সুবিধা ইত্যাদি তাকে গ্রাস করতে পারেনি। বরং শাসকশ্রেণির চরিত্র উন্মোচিত করা এবং মেহনতী জনগণের স্বার্থের কথা তুলে ধরার কাজটি তিনি যোগ্যতার সঙ্গে করতে পেরেছিলেন। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতে প্রথম নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি বঙ্গীয় পরিষদে (বিধানসভা) তিনজনের গ্রæপ থেকে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছিলো। এভাবে তিনি শ্রমিক নেতা থেকে পার্লামেন্টেরিয়ান এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা থেকে গণনেতায় পরিণত হন।
সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধী ইমার্জেন্সি জারি করলে ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি দারুণ আক্রমণের মুখে পড়ে। সেই সময় জ্যোতি বসু ও তার পার্টি প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে কাজের সমন্বয় করতে শিখিয়েছিলেন সমগ্র পার্টিকে। যারা জ্যোতি বসুকে একজন ভালো প্রশাসক এবং ‘বিপ্লব বিরোধী সংস্কারবাদী শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী’ বলে মনে করেন তারা পরিপূর্ণরূপে ভ্রান্ত। বস্তুত জ্যোতিবসু আগাগোড়া বিপ্লবী এবং মাকর্সবাদের বিপ্লবী সত্তায় আস্থাশীল নেতা ছিলেন।
১৯৭৭ সাল থেকে টানা ২৩ বছর জ্যোতিবসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বারবার নির্বাচনে তার দল বিজয়ী হয়েছিলো। এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আরেকটি আছে বলে আমার মনে হয় জানা নেই। প্রশাসক হিসেবে জ্যোতিবসু আসাধারণ দক্ষতার ও প্রখর বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। ২৩ বছর মুখ্যমন্ত্রীত্ব করার পর তিনি ওই দায়িত্বটি তুলে দেন তারই দলের কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হাতে। এই যে বিরাট সাফল্য তার পেছনে জ্যোতি বসুর ব্যক্তিগত যোগ্যতাও যেমন ছিলো, তেমনি ছিলো অত্যন্ত সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও আদর্শনিষ্ঠ পার্টির ভ‚মিকা। এই সময়কালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যের ক্ষেত্রে তিনি যা করছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভ‚মি সংস্কার, বর্গা অপারেশন, শিল্পায়ন এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ফলে গরিব জনগণ কিছুটা ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিলো। গরিব সীমিত আকারে হলেও গরিব জনগণের যে ক্ষমতায়নের কাজটি করতে পেরেছিলেন সেটাই ছিলো তার দলের এবং তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার মূল কারণ। আরও উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি খুবই কম ছিলো।
জ্যোতি বসুর বাংলাদেশের প্রতি দুর্বলতা ছিলো সবসময়। তিনি ছিলেন আসলেই বাংলাদেশের জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু। ১৯৯৬ সালে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন মূলত গঙ্গার পানি বণ্টন বিষয়ে আলোচনা করতে, যদিও তিনি কেন্দ্রীয় সরকারে ছিলেন না। তখনি লক্ষ্য করা গেছে যে, বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা করার ব্যাপারে তার ছিলো আন্তরিক প্রচেষ্টা। সম্ভবত নাড়ির টানে তার এই বিশেষ দুর্বলতা ছিলো।
জ্যোতি বসু ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন সন্দেহাতীতভাবে সৎ ও আর্দশনিষ্ঠ। তার মধ্যে ছিলো এক দরদী মন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অতি উঁচু এবং কঠিন বিষয়কে সহজে ব্যাখ্যা করার অসাধারণ যোগ্যতা তার ছিলো।
জ্যোতি বসুর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবার কথা উঠেছিলো। ভারতের লোকসভায় সিপিআই (এম)-এর সদস্য সংখ্যা ছিলো বেশ নগণ্য। তার পরও অধিকাংশ দল তাকেই প্রধানমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। এটা খুব সাধারণ ব্যাপার নয়। অর্থাৎ সর্বভারতীয় পর্যায়েও তিনি ছিলেন জনগণের আস্থাভাজন নেতা। তার পার্টি সিপিআই (এম) এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তিনি পার্টির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে এমন আপাত লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
জ্যোতি বসু ১৯১৪ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন।
লেখক :চলচ্চিত্র গবেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]