ক্ষমতায়নের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত

আমাদের নতুন সময় : 10/07/2019

কাকলী সাহা, কলকাতা

ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে যে তিনটি প্রধান শর্ত রয়েছে, তা হলো :

১) সমরাস্ত্র প্রয়োগ

২) ধর্মবিস্তার

৩) মানুষের মন ও মস্তিষ্কের দখলদারিত্ব

এই তিনটি শর্তই বহু পরীক্ষিত এবং সাফল্য আনতে সক্ষম। তবে সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের চেহারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। তবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। সমরাস্ত্র প্রয়োগের ঘটনা প্রায় আদিমকাল থকেই চলে আসছে। এক্ষেত্রে কেবল অস্ত্র ও তার প্রয়োগ-কৌশলে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তার না হলে মূল ভাবনা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আর ধর্মীয়ভাবে ক্ষমতায়নের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কার্যকরী হয়েছিলো একসময়। চ-াশোকে থেকে ধর্মাশোকে পর্যবসিত হওয়া যেন সামন্তবাদিতা থেকে পুঁজিবাদে রূপান্তরেরই নামান্তর। মুসলিম আধিপত্যবিস্তার বা পৃথিবী জুড়ে মিশনারীদের আড়ালে খ্রিস্টান আধিপত্য বিস্তার, এ-বিষয়টিকেই নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে আধুনিক ভাবনা হলো মানুষের মনন ও মস্তিষ্কের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করা। এখানে রক্তপাতের বীভৎসতা নেই বটে, তবে রক্তনিঃসরণ ঘটে নীরবে। পৃথিবীজুড়ে এই প্রক্রিয়াতেই অভিনববরূপে শোষণ চলছে। এখানে সবচেয়ে মজার বিষয়টি হলো, যারা শোষিত হচ্ছেন, তাদের কোনো ক্ষোভ নেই; এমনকি তারা স্বীকার করতে পর্যন্ত নারাজ যে, তারাই শোষিত হচ্ছেন। এরা শ্রেণিগতভাবে সাধারণত শিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত, সাধারণ বিত্তশালী বা অভিজাত, অবস্থানগতভাবে এরা মূলত শহরে বসবাস করেন; আবার মফঃস্বল বা গ্রামে বাস করে, এমন সংখ্যাও কম নয়।

সমস্যাটা হলো, এই ক্ষমতায়ন দেশীয় বা আন্তর্দেশীয় দুই-ই হতে পারে। কারণ এর আসল উদ্দেশ্যই হলো, বাজারের দখল নেয়া। নয়নাভিরাম পরিবেশনার সাথে উপযুক্ত গুণের কথা প্রচার করলে মানুষ তাকে সহজেই গ্রহণ করে থাকে। যেমন, একটি খাবারকে কেবল টেস্টি বলাই বর্তমানযুগে জরুরি নয়। কারণ মানুষ উন্নত হয়েছে। তাই তাকে ঐ খাদ্যের ফুড ভ্যালুও উল্লেখ করতে হবে, উল্লেখ করতে হবে তাতে কতো পারসেন্ট ভিটামিন, কতোটাই বা মিনারেল বিদ্যমান। ঠিক একইভাবে কোনো মানুষকেও প্রোডাক্ট হিসেবে বাজারজাত করা যায়। ভাবছেন,এ আবার কেমন কথা? না না, এ-মোটেই হাসির কথা নয়। এ-কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রয়োগ করে বহুক্ষেত্রেই দারুণভাবে সাফল্য এসেছে। বহু রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এভাবেই আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। মানুষের মধ্যে সেই প্রোডাক্টের চাহিদাও সৃষ্টি হয়েছে। বরং বলা যায়, চাহিদা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছে। আবার ব্যবহারিক গুরুত্ব থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন কোনো কোনো প্রোডাক্ট বাজারে মূল্য পায় না; তেমন করেই মানুষের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা বিরল নয়।

অতি সাম্প্রতিক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের গিমিক ছড়িয়ে, মানুষের মন ও মস্তিষ্কের দখল নিয়ে মানুষের আস্থা অর্জনের যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তা অতি আধুনিক। অন্য কোনো অস্ত্রই এর মোকাবিলা করতে পারে না। তবে এই পদ্ধতির বহুল ব্যবহারে ও মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে কোথাও না কোথাও নিশ্চয় ধাক্কা খেতে বাধ্য। ভারতীয়দের বিদেশী টান বিশেষত পশ্চিমী ঝোল টানার বিষয়টি বরাবরই ছিলো। আর এখান থেকেই এসেছে ভোগবাদের প্রতি তাদের গভীর অনুরাগ। তবে বর্তমানে আর একটি অভিনব পদ্ধতির প্রয়োগও দেখা যাচ্ছে, ভোগবাদকে ভোজবাজির আড়ালে রাখার একটা দুর্দান্ত চেষ্টা। অর্থাৎ মানুষের মনন ও চিন্তনের দখল নিতে কেবল বিষবৃক্ষের ফলের ওপরই তারা আর আস্থা রাখতে পারছেন না বা বলা ভালো চাইছেন না। সেই ফলকে তারা ধর্মীয় রঙিন আকর্ষণীয় মোড়কে পুড়ে তাকে দেশপ্রেমের আড়কে ভিজিয়ে রেখে প্রায় অমরত্ব দান করার প্রবল একটা প্রয়াস চালাচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, কেবল শিক্ষিত, বিত্তবান মানুষের মস্তিষ্কের দখল নিলে অর্ধেকের বেশি মানুষ থেকে যায় এর বাইরে, একটা বৃহৎ দেশের ক্ষেত্রে আর গোটা পৃথিবীর ক্ষেত্রে সেই সংখ্যাটা মোটেই খুব একটা হালকাভাবে দেখার ব্যাপার নয়। তাই বাজারের দখল নিতে সাম্রাজ্যবাদের এই অভিনব পন্থায় ক্ষমতায়নের তিনটি শর্তই ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]