অনুগল্প : প্রায়শ্চিত্ত

আমাদের নতুন সময় : 13/07/2019

রুমা ব্যানার্জি

মনোরমা, অনেক ঝড়-ঝাপটা সয়ে, বাপমরা একরত্তি ছেলেটাকে বুকে করে আজ মানুষের মতো মানুষ করেছেন। এই ছেলের জন্য কি না করতে হয়েছে…ঠোঙা বানানো, বড়ি আচার, এমনকি লোকের বাড়িতে আয়ার কাজ অবধি করেছেন। কিন্তু ছেলেকে উনি পড়িয়েছেন মনের মতো করে। সে যে তার শিবরাত্তিরের সলতে। সেই ছেলে, আজ সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারি কর্মচারী। আজ তার নিজস্ব একটা ফ্ল্যাট আছে, গাড়ি আছে। বৌমাও শিক্ষিত,
ভালো চাকুরে ও সুগৃহিণী। সংসারে সুখ উথলে পড়ছে। মনোরমা এখনো যতোটা পারেন, সংসারের খুঁটিনাটি দেখে-শুনে রাখেন। মনে মনে শিবশম্ভুকে ডাকেন…সব রক্ষা করো বাবা। কার কুনজর লাগলো, কে জানে? একদিন মিস্ত্রির বেশে এলো এক চোর। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন মনোরমা দেবী। শীর্ণকায় বৃদ্ধার রণচÐী মূর্তি দেখে পালিয়ে গিয়েছিলো সে। কিন্তু যাবার আগে ওই মারমুখী বুড়িকে উচিত শিক্ষা দিয়ে যায়। রক্তাক্ত, অর্ধমৃত অবস্থায় বেশ ক’ঘণ্টা পড়ে থাকেন বৃদ্ধা । তিন মাস কেটে গেছে। হীরের টুকরো ছেলে তাঁর। চিকিৎসার ক্রটি রাখেননি। ডাক্তার-বদ্যি সব করেছেন। একে বয়স হয়েছে, তার ওপর অত জখম। ভরসা দিতে পারেননি কোনো চিকিৎসক।
মনোরমার যখন জ্ঞান থাকে, তখন বোবা দৃষ্টিতে আবছা মুখগুলো মাঝেমাঝে দেখেন। কখনো চাপা গলায় ঝাঁঝালো ক্ষোভ কানে আসে, “আরো যে কতোদিন চলবে?” কিংবা “জলের মতো টাকাগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে।” কখনো কানে আসে “বুড়ির আশ্চর্য জীবনীশক্তি, কিছুতেই মরবে না!” অথবা “কতো পাপ করেছিলো যে, এভাবে দগ্ধে দগ্ধে মরছে।” এক এক সময় পুরনো দিনগুলো চোখে ভাসে মনোরমার। এই তো সেদিনের কথা…গলবস্ত্র হয়ে মাকালীর মূর্তির সামনে মাথা ঠুকছেন তরুণী বিধবা মেয়েটি, মনোরমা। কী করবে, বুঝতে না পেরে এই মন্দিরে এসে হত্যে দিয়ে পড়েছে সে। ডাক্তার যে জবাব দিয়েছে। ‘ঠাকুর মশাই,”…খুব উদ্বিগ্ন গলায় বললো সে “তাহলে উপায়? কোনো বিধান বের করুন, দয়া করুন ঠাকুর। এ আমার একমাত্র শিবরাত্তিরের সলতে। বাঁচান ঠাকুর।”
ঠাকুর মশাই বললেন, “ওঠ রে মা, শোন। সূর্য ওঠার আগে শুদ্ধবস্ত্রে, মন্দিরটা দশ পাকদÐী খেটে আয় ছেলেকে কোলে নিয়ে। আমি নবগ্রহ পুজোর আয়োজন করছি। তোর ছেলে সুস্থ হয়ে যাবে।” তখন অনেক রাত। নিজের শেষ অবলম্বন দুগাছা চুড়ি গতকাল রাতেই মনা স্যাকরার কাছে বেচে দিয়েছিলো। সেই টাকা আঁচলের খুঁটে বেঁধে নিয়ে কোলের ঘুমন্ত ছেলেকে তুলে জোর পায়ে হাঁটতে লাগলো সে। পাছে কাক ডাকে, পাছে সময় চলে যায়! আজ অনেকটা সময় জ্ঞান থাকছে মনোরমার…তাঁর চোখ দুটো চকচক করছে। কারণ আজ ঘরে সকাল থেকেই খোকনকে দেখছেন
মন চায় খোকনকে ডেকে একটু ভালোমন্দ কথা বলেন। মুখ থেকে শুধুই একটু অস্পষ্ট গোঙানির আওয়াজ ছাড়া কিছু বেরিয়ে আসে না। খোকন আজ ব্যস্ত, সকাল থেকে কিচ্ছুটি দাঁতে কাটেনি। ঠাকুর মশাই এসেছেন। পুজোয় বসেছে খোকন। প্রায়শ্চিত্ত করছে। এই সোনার সংসার থেকে, অবাঞ্ছিত আপদ থেকে মুক্তি পেতে ঠাকুরমশাই এমনি বিধান দিয়েছেন। ওঁ শান্তি। ওঁ শান্তি।




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]