• প্রচ্ছদ » » ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিকভাবেই আমরা ‘জল-সমাজ’


ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিকভাবেই আমরা ‘জল-সমাজ’

আমাদের নতুন সময় : 13/07/2019

শেখ রোকন

মজার ব্যাপার, ওরহান পামুকের ‘দ্যা রেড হেয়ারড ওম্যান’ উপন্যাসে অন্তত দু’বার, ছোট্ট করে হলেও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে। মজার ব্যাপার এই কারণে যে, ২০০৬ সালে তিনি নোবেল পাওয়ার পর ঢাকাই এক ‘বোদ্ধা’ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন পামুক বাংলাদেশ চেনেন কিনা।
‘দ্য রেড হেয়ারড ওম্যান’ পড়তে গিয়ে আমার কাছে পামুককে বরং বাংলা ভাষারই তিন লেখকের মিশ্রণ মনে হয়েছে। তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো নারী-পুরুষের মনো-শারীরিক জটিল বিষয়গুলো নিয়ে খেলতে পারেন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতো শক্তিশালী সংলাপ নির্মাণ এবং তার মধ্য দিয়ে ঘটনা এগিয়ে নিতে পারেন, এবং শংকরের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতির নিরস বিষয়কেও উপন্যাসের সরস প্লট বানাতে পারেন। যেমন তুরস্কের রিয়েল এস্টেট ব্যবসার পরিষ্কার চিত্র পেতে যে কোনও ব্যবসায়ী এই উপন্যাসকে ‘গাইড’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। একেবারে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আপডেটেড। পামুকের ‘ব্রান্ড’ যদি বলি, সেটা সম্ভবত ঘটনা ও চরিত্রের চমক। মহাকাব্যিক ধীরলয়ের মধ্যেও তিনি এমন চমক দিয়ে যান, যা অন্য কারও পক্ষে ভাবাও কঠিন। যেমন লালচুলো সুন্দরী নায়িকাকে প্রথম কিশোর নায়কের কাছে মনে হয়েছিলো গৃহবধূ মাত্র। পরে দেখে, তিনি রীতিমতো থিয়েটারের নায়িকা, ব্যাপক জনপ্রিয়। আরও পরে জানতে পারেন, তিনি গোপন বামপন্থি দলের সদস্য। থিয়েটার নিছক মুখোশ মাত্র। আর যাকে এতোদিন নারীর ছোট ভাই ভেবেছেন, সে তার স্বামী। এখানেই শেষ নয়, প্রেম ও বিচ্ছেদের পর জানতে পারেন, ওই নারী তার পিতারও কমরেড ও প্রেমিকা ছিলো। আর পৌঢ়ত্বে এসে নিঃসন্তান নায়ক জানতে পারেন, তারও একজন পুত্র রয়েছে। লালচুলো ওই নারীর গর্ভে জন্মানো। নায়কের মৃত্যু হয় সেই পুত্রের হাতেই। চমকের পর চমক নয়? তুর্কি ঐতিহ্য ওরহান পামুকের বরাবরের মনোযোগ। এই উপন্যাসে তিনি যেভাবে সোহরাব-রোস্তম, পিতা-পুত্রের সেই অমর মহাকাব্যকে আধুনিক দুই মানুষের জীবনে ছায়াপাত ঘটিয়েছেন, তা সত্যিই অনবদ্য। এর সঙ্গে গ্রিক মাইথলোজি ইডিপাসকে যোগ করাও কম মুন্সিয়ানা নয়। কিন্তু প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের দুই মহাকাব্যের মিলন দেখানোই শেষ কথা নয়। পামুক উত্তম পুরুষে একইসঙ্গে পিতৃত্বের ও পুত্রত্বের অনুভ‚তি একই ব্যক্তির মধ্যে যেভাবে দেখতে পেয়েছেন, তার তুলনা আমার ক্ষুদ্র পাঠগÐিতে নেই। একজন পুরুষ তার পিতা ও পুত্র চরিত্রের মধ্যে তাতের মাকুর মতো যে দোলাচলে থাকে, তা পামুকের মতো করে আর কেউ ব্যাখ্যা করতে পারেননি। নিরেট সাহিত্যের বাইরে আমার ভালো লেগেছে ‘ওরিয়েন্টাল ডিপোটিজম’ তত্তে¡র সঙ্গে পরিচিতি। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী কার্ল উইটফোগেলের এই তত্ত¡ পামুক বিশ্লেষণ করেছেন আধুনিক তুরস্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। দুর্ভাগ্যবশত, কৃষি উৎপাদন রক্ষায় নদী-জলাশয় মারার এই তত্ত¡ বাংলাদেশও অন্য নামে খেয়েছে। পামুকের মতে, উইটফোগেলের ‘হাইড্রোলিক সোসাইটি’ তত্ত¡ চীনের হজম হয়েছে, তুরস্কের গলায় আটকে গেছে। কারণ এর অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে ‘চরম কেন্দ্রীভ‚ত শাসন ব্যবস্থা’। আমার মতে, বাংলাদেশে যে কোনো অবস্থাতেই তত্ত¡টি গলায় আটকে যেতে বাধ্য। কারণ ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিকভাবেই আমরা ‘জল-সমাজ’। হাজার বছরেরর সেই ব্যবস্থায় যে কোনও প্রকৌশলই ব্যর্থ হতে বাধ্য। পামুক কখনো বাংলাদেশে এলে হাতে-কলমে দেখতে পাবেন।
অযাচিত পরামর্শ : প্রকৃত রস আস্বাদন করতে চাইলে বিদেশি উপন্যাসের বঙ্গানুবাদ এড়িয়ে চলবেন। অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ উপন্যাসের বঙ্গানুবাদ পড়তে গিয়ে প্রথম বিষয়টি হাড়ে হাড়ে টের পাই। ওই-ই শেষ। এরপর থেকে আর অনুবাদের ছায়া মাড়াইনি। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]