• প্রচ্ছদ » » নিসর্গ : জীবন্ত চেতনার অভিরূপ


নিসর্গ : জীবন্ত চেতনার অভিরূপ

আমাদের নতুন সময় : 14/07/2019

অসীম সাহা

আকাশে ঘন কালো মেঘ, মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে, আন্দোলিত গাছের তুমুল আলোড়নে আতঙ্কিত পাখিগুলো কোন্ অন্তহীন গহন পাতার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে, কে জানে! গুরু গুরু মেঘের গর্জন, কখনো-বা আকাশ ফাটিয়ে ভয়ঙ্কর বজ্রপাতের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বিদ্যুতের বিস্ফোরণের আতঙ্কিত শিহরন বুকের গভীরে তীব্র তোলপাড় শুরু করেছে। চরাচরে কেউ কোথাও নেই। আবার একটা প্রবল বর্ষণের পর ঝকঝকে উপ্চে পড়া রোদে আকাশের কোথাও এক ফোঁটা মেঘ নেই। নদীর কোথাও নেই তরঙ্গের উতরোল। সাদা গাঙচিলেরা তাদের উচ্ছ¡সিত ডানা মেলে উদ্বেগহীন উড়ে যাচ্ছে। নদীর ঘাটে স্নান করছে কোনো কোনো অবুঝ কিশোরী, ছোট্ট কিশোরেরা উদোম গায়ে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবে গিয়ে ভেসে উঠছে আনন্দে কিংবা সেখান থেকে কলসী ভরে জল নিতে এসেছে ধনুকের মতো তীব্র শরীরের কোনো গ্রামীণ তরুণী। কোমল হাওয়ার ঝিরি ঝিরি কাঁপনে দোল খাচ্ছে মাছধরা ডিঙি নৌকোগুলো। নদীর পাড়ে কাশের বনে স্বচ্ছ সাদা কাশফুলগুলো মাথা দুলিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে নদীতীর ধরে আনমনে হেঁটে যাওয়া পথিকদের। সকাল গড়িয়ে দুপুর, তারপর অস্তগামী সূর্যের কামে-রাঙা রক্তিম আলোর ছড়ানো অবয়ব। অতঃপর ‘সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে’। সমস্ত চরাচর জুড়ে অন্ধকারের একটা ঘন আবরণ দুধের সরের মতো পৃথিবীকে ঢেকে দিয়েছে। কাছে-দূরে কোথাও ঝিঁঝির ডাকের একটানা অনুরণন আর অন্ধকারে টুকরো টুকরো অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো তাদের জ্বলে ওঠা, প্রকৃতিকে কেমন একটা মোহময় ঘনঘোর আবেশের মধ্যে আপ্লুত করে রেখেছে।
আবার কখনো আকাশকে রাঙিয়ে দিয়ে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ফুটে উঠেছে চোখ জুড়ানো ফুল। যেন পৃথিবীকে মাতাল করে জাগিয়ে তোলার জন্যই তার এই ফুটে ওঠা। আর গোলাপ, বেলী, শিউলী কিংবা গন্ধরাজসহ কতো যে নাম জানা, না-জানা ফুলের সমারোহে কিংবা তাদের বিমোহিত গন্ধে আকুল হয়ে উঠছে হৃদয়, তার কোনো বর্ণনা ভাষার আবরণে ধরে রাখা সম্ভব নয়। বৃক্ষের ঘন সবুজের সম্ভারে মাখা এই দেশের কতো যে গ্রাম-জনপদ ভরে আছে, ভরে আছে উঁচু-উঁচু পাহাড়-পর্বত-টিলা, আর সুন্দরবনের মাইল মাইলব্যাপী ঘন প্রেইরীর বন, যেন শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে মানুষের মনে। এতো নদী-নালা-পাহাড়-পর্বত এবং সমতলভূমির সুদূরতম ব্যাপ্তির মধ্যে প্রকৃতির নানা রূপের, নানা রঙের, নানা ঢঙের কিংবা নানা রসের যে অভিনব আয়োজন, তাকে আমরা কোনো নির্দিষ্ট নামে অভিহিত করেই কি তার অপরূপ সৌন্দর্যের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করতে পারি? পারি না।
তবুও বলতে হয়, বাংলার প্রকৃতিতে এই যে ব্যাপক, বিপুল সৌন্দর্যের সমারোহ, সে তো নিসর্গেরই আধার। নিসর্গের আভিধানিক অর্থ ‘প্রকৃতি’ হলেও তাকে এই শব্দবন্ধ দিয়ে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করা অসম্ভব। আসলে নিসর্গ প্রকৃতির আধার হলেও প্রকৃতপক্ষে তার অবস্থান চেতনা ও অনুভূতির গহন গভীর ও অতল সৌন্দর্যের মধ্যেই নিহীত, উপলব্ধির গহন অতলেই তার অবস্থান। আমরা চারপাশে যা কিছু দেখি, তার প্রায় সবই তো প্রকৃতির আওতায় ধরা পড়ে। কিন্তু তার সবকিছুকেই যদি আমরা নিসর্গ বলে চিহ্নিত করি, তা হলে নিসর্গের ব্যাপক ও গভীরতম অর্থের বদলে তার একটি স্থূল অবয়ব বেরিয়ে পড়ে, যাকে নিসর্গ বলে চিহ্নিত করতে মন কিছুতেই সায় দিতে চায় না। সেজন্যেই বোধহয় কবি-সাহিত্যিকগণ নিসর্গকে বর্ণনা করেছেন তাঁদের শিল্পসুষমার চূড়ান্ত অনুভূতির সারাৎসারকে একীভূত করে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গল্পের বিশাল অংশ জুড়ে প্রকৃতির যে বর্ণনা, তা তো প্রকৃতপক্ষে নিসর্গেরই বর্ণনা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পোস্ট মাস্টার’ গল্পে কাজের ছোট কিশোরী মেয়ে রতনকে ছেড়ে চলে যাবার সময় সঘন বর্ষার স্বরূপ বর্ণনার মধ্য দিয়ে রতনের হৃদয়ের যে মর্মস্পশী আর্তি ও ক্রন্দনকে প্রকাশ করেন, তাকে কি শুধুই প্রকৃতির বর্ণনার সঙ্গে রতনের হৃদয়ের আবেগের বেদনার্ত প্রকাশ বলে অভিহিত করা যায়? এখানে প্রকৃতি কি সম্পূর্ণরূপেই নৈসর্গিক হয়ে ওঠে না? যদি প্রকৃতিকে আমরা শুধু দৃশ্যমান এবং স্পর্শযোগ্য বিষয় বলে ভাবি, তা হলে তাকে আরো গভীরতা দানের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে নিসর্গ। কবিদের কবিতা বা গদ্য বর্ণনায় প্রকৃতি কি শুধু দৃশ্যমান প্রকৃতি হয়েই থাকে, নাকি তা প্রকৃতির সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে হয়ে ওঠে নিসর্গের এক গভীরতর রূপ? কারো করো মনে হতে পারে, এর মধ্যে প্রকৃতির চিত্রকল্পের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে কবির মনের গভীরতর আকুলতা কিংবা কাব্যিক করণকুশলতা সংযুক্ত হয়ে পড়ে বলে তা হয়ে ওঠে কবি বা ঔপন্যাসিকের উপলব্ধির অন্তরতম বহির্প্রকাশ। তাকে কি নিসর্গ বলা চলে? আমার কাছে মনে হয় এটি একটি সাধারণ প্রশ্ন। এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, নিসর্গ শুধু প্রকৃতি নয়, প্রকৃতিকে অতিক্রম করে আরো একটা কিছু। এই আরো একটা কিছুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সকল আধার। তা হলে এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় নিসর্গ নিজেই নিজের ভেতরে স্বয়ম্ভূ। মানুষ ইচ্ছে করলে প্রকৃতিকে বধ করতে পারে, ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু নিসর্গকে কিছুতেই ধ্বংস করা সম্ভব নয়। কারণ আগেই বলেছি, নিসর্গ থাকে দৃষ্টি ও চেতনার গভীর গহŸরে, উপলব্ধির সীমাহীন অতল জলের নীচে। তাই যাকে আমরা দেখি অর্থাৎ প্রকৃতিকে, যে কবি-শিল্পীরা তাকে জীবন্ত করে তোলে তাদের কলমে কিংবা তুলিতে, প্রকৃতির সীমাবদ্ধ সীমানার বাইরে এসে তা হয়ে ওঠে নিসর্গেরই জীবন্ত চেতনার অভিরূপ, যা আমাদের দৃষ্টি, আমাদের মন ও আমাদের চেতনাকে এক রহস্যময় বাতাবরণের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য করে। নিসর্গের কাজই তাই। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি শুধুই প্রকৃতি। সে কেবল জড় পদার্থের মতো অচঞ্চল, স্থবির এবং হৃদয়-অভেদ্য এক বিশাল বস্তুপুঞ্জ। তারই মধ্যে যখন প্রাণ প্রতিষ্ঠা প্রায়, সে হয়ে ওঠে জীবনের আধার এবং প্রাণের উষ্ণ সরোবরে কম্পমান ঢেউয়ের আঘাতে গতিসঞ্চর। আর তখনই সে হয়ে ওঠে নিসর্গের দাবিদার। কখনো কখনো মনে হয় প্রকৃতি যেন শুধু কতোগুলো নি®প্রাণ ও স্থবির বৃক্ষ, লতাপাতা, ফুল, ফল, নদী, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, আকাশ-বাতাস কিংবা বাংলা ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যময় বহির্প্রকাশে তৎপর অসংখ্য বস্তুর এক বিপুল-বিশাল সমাহার। সে-শুধু বস্তুই। আসলে এ যেন এক মানবদেহের প্রতীক, প্রকৃতির মধ্যে যে গিয়ে তার বাসা বেঁধেছে। প্রাণহীন দেহ মানেই যেখানে মৃত, ঠাÐা-শীতল এক জড় বস্তু, প্রকৃতিও যেন তাই। কিংবা এ যেন কুমোরের গড়া মাটির প্রতিমা। কুমোর যখন কাঠ, খড়, মাটি এবং রঙের আল্পনা দিয়ে শুধুই একটি মূর্তি গড়ে তোলে এবং পুজোর আগে যখন সেই বিগ্রহকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়, অতঃপর পুরোহিত এসে মন্ত্রপাঠ ক’রে তার মধ্যে প্রাণের প্রতিষ্ঠা করেন বলে ভক্তবৃন্দের বিশ্বাস, তেমনি প্রকৃতির মধ্যে প্রাণের স্পর্শের যোগ না হলে, চেতনার অভ্যন্তর থেকে তাকে জীবনের আকুলতার মধ্যে নিয়ে না এলে সে শুধুই দৃষ্টিগ্রাহ্য ও স্পর্শগ্রাহ্য প্রকৃতি হয়ে থাকে, নিসর্গ হয়ে ওঠে না?
আসলে নিসর্গের কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য কিংবা স্পর্শগ্রাহ্য অবয়ব আছে বলে আমার মনে হয় না। দৃষ্টিগ্রাহ্য ও স্পর্শগ্রাহ্য থাকে প্রকৃতি। এই প্রকৃতিকে দেখে চোখ যখন জুড়িয়ে যায়, হৃদয় যখন আন্দোলিত হয়, প্রাণের সমস্ত আবেগ যখন স্ফীত দুর্বার ঢেউয়ের উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছোয়, তখনই তা হয়ে ওঠে নিসর্গ। তাই বলা যায়, নিসর্গ একটি চেতনার নাম। তার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অন্তর্গত। অন্তর দিয়ে প্রকৃতিকে অনুভব করতে না পারলে তা কখনো নিসর্গ হয়ে উঠতে পারে না।লেখক : সংযুক্ত সম্পাদক, দৈনিক আমাদের সময়ও




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]