• প্রচ্ছদ » » এরশাদের বিদায়ে দেশের রাজনীতি কি কলুষমুক্ত হবে?


এরশাদের বিদায়ে দেশের রাজনীতি কি কলুষমুক্ত হবে?

আমাদের নতুন সময় : 15/07/2019

বিভুরঞ্জন সরকার : বিরোধী দলীয় নেতা, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিয়ে সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটলো। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কয়েকদিন ধরে ‘গুজব’ রটছিলো। ১৪ জুলাই তার মৃত্যুর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর মধ্য দিয়ে এরশাদ অধ্যায়ের অবসান হলো। এরশাদ দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন। আমাদের গড় আয়ুর চেয়েও বেশি আয়ু তিনি পেয়েছেন। ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর থেকেই তিনি এক আলোচিত চরিত্র। আমৃত্যু তিনি আলোচনায় ছিলেন। তাকে নিয়ে প্রশংসাসূচক বাক্য উচ্চারিত হয় কম। পৃথিবীর যেমন তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল, এরশাদেরও সম্ভবত তিনভাগ খারাপ, একভাগ ভালো।

এরশাদের বিরুদ্ধে আমি অনেক লিখেছি। তার শাসনামলেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো শফিক রেহমানের সাড়া জাগানো সাপ্তাহিক যায়যায়দিন। তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ায় তিনি দুইবার কাগজটি বন্ধ করেছিলেন। যায়যায়দিন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্রে পরিণত হয়েছিলো। তারিখ ইব্রাহিম ছদ্মনামে রাজনৈতিক প্রতিবেদন লিখে আমি হয়ে উঠেছিলাম ‘খ্যাতিমান’। সে হিসেবে এরশাদ দেশের অপকার করলেও ব্যক্তিগতভাবে আমার কিছু ‘উপরকার’ই করেছিলেন। সেসময় আজকালকার মতো এতো রাজনৈতিক ভাষ্যকার খুঁজে পাওয়া যেতো না। আমার তখন তরুণ বয়স। আমার বন্ধুরাই তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সামরিক শাসনের কারণে দৈনিক পত্রিকাগুলো রাজনৈতিক বিষয় এড়িয়ে চললেও যায়যায়দিন রাজনীতিকেই মুখ্য করছিলো। এরশাদের রক্তচোখ উপেক্ষা করার একটি সাহস তখন ছিলো।

লাগাতার যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন হয় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। পতন হয় মানে তিনি পদত্যাগ করেন বা পদত্যাগে বাধ্য হন। সেনাবাহিনী তার উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার না করলে তখন কি হতো, সে আলোচনা এখন অপ্রাসঙ্গিক। এরশাদ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশের রাষ্ট্রপতি হননি। তিনি বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। ক্ষমতায় থাকার জন্য তিনি শক্তি বা বল প্রয়োগ করেছেন। অনেকের রক্ত ঝরিয়েছেন। ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি রক্ত নিয়েছেন। তার আমলে টার্গেট করে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে নূর হোসেনকে। ট্রাকচাপা দিয়ে মারা হয়েছে সেলিম-দেলোয়ারকে। অ্যাডভোকেট ময়েজউদ্দিন, শ্রমিক নেতা তাজুল ইসলাম, ডা. মিলনসহ কতো নাম মনে পড়ছে।

আজ দুঃখ হয় এটা ভেবে যে, ক্ষমতা জবরদখলকারী এরশাদকে আমরা নিন্দা করি তার জুলুম-অত্যাচার-হত্যার রাজনীতির জন্য। কিন্তু রক্ত দিয়ে তাকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে আমরা যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পেলাম সেখানে কি আমরা এরশাদী শাসনধারা অব্যাহত দেখছি না?  রক্ত ঝরা কি বন্ধ হয়েছে? নীতিহীনতার রাজনীতির জন্য এরশাদ ব্যাপকভাবে নিন্দিত ও সমালোচিত। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেশের রাজনীতিতে নীতিনৈতিকতা কি ফিরে এসেছে?

এরশাদকে আমরা একজন নিষ্ঠুর শাসকের প্রতিভূ হিসেবে দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু ‘নির্বাচিত’ সরকারের নির্দয়তা-নিষ্ঠুরতা কি আমরা কম দেখেছি? এরশাদের আমলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সমাবেশে চট্টগ্রামে নৃশংস হামলা চালিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাকা- সংঘটিত করা হয়েছিলো। কিন্তু খালেদা জিয়ার আমলে যে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার অপচেষ্টা চালানো হলো, সেটাকে আমরা কীভাবে দেখবো? এরশাদের প্রতি আমাদের মনোভাব কঠিন, তাকে কোনোভাবেই ক্ষমা করা যাবে না, তার প্রতি দয়া দেখানো যাবে না বলে যারা মনে করেন তারা আবার খালেদা জিয়ার প্রতি এতোটা কঠোর নন, বরং অনেক নমনীয়।  কারণ এরশাদ ‘স্বৈরাচারী’ আর খালেদা ‘গণতন্ত্রী’।

মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এরশাদ-অধ্যায়ের অবসান ঘটলো বলে মনে করা যায়। এরশাদের শরীরী অনুপস্থিতি তার রাজনৈতিক ধারা বা দলটিকে কতোটুকু সজীব রাখতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এরশাদের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টির ঐক্য সংহত না হয়ে ভাঙন অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। সম্পত্তির ভাগাভাগি এবং দলের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করার জন্য এখন জি এম কাদের এবং রওশন এরশাদের কাঁধে বন্দুক রেখে কে কোন দিকে গুলি ছোড়ে সেটাও একটা দেখার বিষয়। এরশাদ ঘন ঘন ডিগবাজি খেলেও তার একটি লক্ষ্য এবং পরিকল্পনা ছিলো বলেই মনে হয়। তিনি এবেলা এক কথা বলে, ওবেলায় ভিন্ন কথা বললেও রাজনীতিতে আওয়ামী লীগবিরোধী ধারায় যাননি। এরশাদকে বিএনপিও পক্ষে টানার চেষ্টা করেছে। এরশাদ যদি ওই হাটে বিক্রি হতেন, তাহলে দেশের রাজনীতি আজ কোথায় থাকতো, একবার ভেবে দেখার চেষ্টা কি করা হবে?

এরশাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। তিনি নানা কেলেঙ্কারির জনক। তার বিদায় দেশের রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে কোনো ভূমিকা রাখবে কি?

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]