বাংলাদেশ কি চীনের দেনার ফাঁদে পা দিতে চলেছে?

আমাদের নতুন সময় : 17/07/2019

নূর মাজিদ : এ মাসের প্রথমে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সফরের সাফল্য স¤পর্কে কোন সন্দেহ নেই। বরং দ্বিপাক্ষিক স¤পর্কের উন্নয়নে একে একটি উলে¬খযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে আরো ১৭০ কোটি ডলার ঋণ প্রদানের চুক্তি করা হয়। এছাড়াও, উভয় দেশই বাংলাদেশ, চীন, ভারত, মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের (বিসিআইএম) মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিসিআইএম এই চারটি দেশের ৩শ কোটি জনসংখ্যার বাজারকে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে। এই সংযোগে বাংলাদেশকে খুবই তাৎপূর্যপূর্ণ মনে করে চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দক্ষিণ এশিয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের সঙ্গে স¤পকর্, চীনা পররাষ্ট্রনীতির অপরিহার্য অংশে রূপ নিয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও চীন নিজেদের স¤পর্ককে কৌশলগত সহযোগিতার স¤পর্কে রূপ দেয়। সেবছর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকা সফরে এলে দুই দেশের মাঝে সাড়ে ২১ শ কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ ও ঋণ চুক্তি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে চীন যে আর্থিক প্রভাব বৃদ্ধি করছে, তার অংশ হিসেবেই এসব চুক্তি করা হয়। ২০১৬ সালে শি জিনপিং ঢাকা এলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার বিষয়টিও সমাধান হয়। ফলে বাংলাদেশে চীনের সার্বিক ঋণ এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ হাজার ৮শ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই হিসেব দিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। সূত্র : ডয়েচে ভেলে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) জানায়, বিগত কয়েক বছরে চীন অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নগদ অর্থপ্রবাহ উলে¬খযোগ্য পরিমাণে বাড়িয়েছে। ২০১৮ সালের বাংলাদেশের সারাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহে (এফডিআই) যার প্রভাবে ৩৬০ কোটি ডলার যুক্ত হয়। এই বিনিয়োগের এক-তৃতীয়াংশ বা ১শ কোটি ডলারই এসেছে চীন থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশ স্থানীয় অবকাঠামো বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২২ সাল নাগাদ ২৪ হাজার মেগাওয়াট করতে চীনা অর্থের ওপর নির্ভর করছে। উলে¬খ্য বর্তমানে দেশটি ১৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

পদ্মা সেতুতে রেললাইন নির্মাণেও কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কো¤পানি। আর চীনের এক্সিম ব্যাংক এই রেলপথ নির্মাণে ৩শ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভারতের উদ্বেগ বাংলাদেশকে দেনার ফাঁদে ফেলতে চীন এসব ঋণ এবং বিনিয়োগ করছে। তবে বাংলাদেশের সকল অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এর সঙ্গে সার্বিকভাবে একমত নন।

ঢাকাভিত্তিক একটি নীতি-গবেষণা সংস্থার প্রধান আহসান এ. মনসুর ডয়েচে ভেলেকে জানান, ‘চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। আমরা এই ধরণের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এই বিনিয়োগ নতুন অর্থায়নের উৎস সৃষ্টিতেও অবদান রাখছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং আইএমএফের মতো প্রচলিত উৎসের দাতাদের দেয়া ঋণ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য পর্যাপ্ত নয়। অর্থনীতির অবকাঠামোর বিকাশে এখন আমাদের বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘চীনা অর্থ আরো বেশ কিছু সুযোগ সৃষ্টি করছে। এটা অন্যান্য দাতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য একটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। যার ফলে তাদের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক দর কষাকষি করতে পারছে। এছাড়াও, চীনের প্রভাব মোকাবেলায় এখন জাপান এবং ভারতের মতো দেশ বিনিয়োগ ও ঋণ বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছে।’

২০৩০ সাল নাগাদ ১শ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (সেজ) স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। চীনের বহু কো¤পানি এই সকল অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে । উদাহরণ দেয়া যায়, ঝেঝিয়াং প্রেসার ভেসেল কো¤পানির। চট্টগ্রামের কাছে একটি সেজ এলাকায় কো¤পানিটি ৫শ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।

এই ধরণের বিনিয়োগ অর্থনীতির বিকাশে উদ্দীপনা যোগাবে এবং এতে দেনাগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ কম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ পাকিস্তানের পড়ে চীনের দ্বিতীয় বৃহৎ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণকারী। আর উদ্যোগটা এসব ঋণ ঘিরেই। ভারত ও পশ্চিমা অর্থনীতি বিশারদেরা মনে করেন, ঋণের চাপে একসময় ঢাকা সকল বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য বেজিংয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে। তারা শ্রীলংকার উদাহরণ দিয়ে সেখান থেকে বাংলাদেশকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আহসান এ. মনসুর বলেন, ঋণের চাইতে চীন থেকে সরাসরি বিনিয়োগ নেয়া বাংলাদেশের জন্য অধিক লাভজনক। তিনি বলেন, চীন বিনিয়োগ ও ঋণ দুইভাবেই অর্থসাহায্য দেয়। বিনিয়োগে ঝুঁকিটা পুঁজি নিবেশকারী দেশ বা সংস্থার ওপরেই থাকে। নেই বাড়তি সুদের সমস্যা। তাই আমি বরাবরই চীনা বিনিয়োগের পক্ষে।  তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ দেনার দায়ে পড়বে এমন পূর্বানুমান করার জন্য এটা উপযুক্ত সময় নয়। ২০১৮ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩১ কোটি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মাঝে আবার চীনের দেয়া ঋণের পরিমাণ যে খুব বেশি এমনটাও নয়।

বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ শাখার প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা জাহিদ হোসেইন বলেন, বাংলাদেশের মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশ চীনের কাছ থেকে নেয়া। তবে সমস্যা হলো যেসব শর্তের ভিত্তিতে এসব ঋণ দেয়া হয়েছে সেগুলো তার স¤পর্কে খুব সামান্য তথ্যই প্রকাশ করা হয়েছে। তাই বলে এখনই বাংলাদেশ চীনের দেনার ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে, এমন কথা বলা ঠিক হবেনা। সম্পাদনা : ইকবাল খান

 




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]