• প্রচ্ছদ » » দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া বন্যার তাÐবকে রোখা যাবে না আমাদের দেশে


দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া বন্যার তাÐবকে রোখা যাবে না আমাদের দেশে

আমাদের নতুন সময় : 21/07/2019

সেলিম জাহান

বাংলাদেশে এ বছর বর্ষা নেমেছে দেরিতে, কিন্তু বন্যার ঢল নামতে দেরি করেনি। ইতোমধ্যে দেশের নানা নদীতে জল বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেছে। বন্যাকবলিত হয়েছে বাংলাদেশের নানা অঞ্চল। সেসব অঞ্চলে গেলেই বোঝা যায় সংকটের গভীরতা। বন্যা-উদ্ভূত অবস্থায় মানুষের কষ্ট, অসহায়ত্ব, ক্রন্দন আর তার নিঃস্বতা মানবতার চরম ভ‚লুণ্ঠনকেই বড় বেশি প্রকট করে তোলে। আজ সারা বাংলাদেশের বার্তা একটাই হোক : ‘মানুষ বাঁচান’। যে যেখানে আছি, যে যেভাবে পারি, আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে মানবতার এই ডাকে… এটা দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়, এটা নৈতিকতার ব্যাপার, সামাজিক ন্যায়বিচারের ব্যাপার এবং আমাদের বর্ধিত ও প্রলম্বিত স্বার্থ রক্ষারও ব্যাপারও বটে। আমরা অর্থের স্বল্পতার দোহাই দিতে পারি না, আমরা নির্বিকারত্বের ঢালে মুখ লুকোতে পারি না, আমরা আমাদের বিত্তের উলঙ্গ প্রকাশও করতে পারি না। কারণ চ‚ড়ান্ত বিচারে, ‘নগরীতে আগুন লাগলে দেবালয়ও যেমন রক্ষা পায় না’, তেমনি ‘অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না’। আমরা যারা বন্যা থেকে দূরে আছি… সর্ব অর্থেই… তাদের বোধহয় এ দুটো কথা বড় বেশি মনে রাখা দরকার। এ মুহূর্তে করণীয় চিন্তা তিনটিই। এক. জরুরি ভিত্তিতে মানুষের জীবন রক্ষা করা। সে কাজটি অতি দ্রæত দুটো পর্যায়ে করতে হবে… প্রথমত : বন্যাকবলিত মানুষদের নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তর এবং দ্বিতীয়ত : সেসব মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপদ পানীয়, বস্ত্র আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক জিনিসের ব্যবস্থা করা।
দুই. মধ্যমেয়াদে বন্যার জল নেমে গেলে তিনটি জিনিস প্রকট হয়ে দেখা দেবে। প্রথমত : অভাব, সব কিছুর… খাদ্যের, কর্মের, আয়ের। বুভুক্ষরা সেখানে জায়গা করে নেবে। দ্বিতীয়ত : জলবাহিত এবং সেইসঙ্গে নানা রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে এবং তৃতীয়ত : গ্রাম থেকে নিরন্ন উদ্বাস্তু মানুষের শহরে অভিবাসন ঘটবে। সে অবস্থার ব্যবস্থা চিন্তা করতে হবে এখনই।
তিন. চাইতে হবে দীর্ঘ মেয়াদেও। সন্দেহ নেই, আমাদের দেশের বন্যার একটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রেক্ষিত আছে। সেদিকটাতে নজর ফেরাতে হবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েই। চিন্তায় রাখা দরকার যে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনাই কি যথেষ্ট নাকি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো নিয়ে বহুপাক্ষিক পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে? কিন্তু বন্যার একটি অভ্যন্তরীণ মাত্রাও তো আছে। আমি কোনো জল বিশেষজ্ঞ নই, বন্যা বিশারদও নই। কিন্তু সাধারণ জ্ঞানে ক’টা জিনিস তো বুঝতে পারি।
প্রথমত : এদেশে বন্যা স্মরণাতীতকাল ধরে হয়ে এসেছে এবং বন্যার আপাতন অনেকটা অর্থনীতির বাণিজ্য চক্রের মতোই কাজ করেছে। যেমন : বেশ ক’বছর (ধরা যাক ৫/৭ বছর ছোট ছোট বন্যার পরে একটা বড় বন্যা হয়েছে, তারপর এক নাগাড়ে অনেকগুলো ছোট বন্যার পরে বড় একটা। ছোট বন্যাগুলো তাদের বুকে ধরে পলিমাটি নিয়ে এসেছে, যা আমাদের ভ‚মিকে করেছে উর্বর।
দ্বিতীয়ত : বড় বন্যাগুলো যখন ৫/৭ বছর পরে এসেছে, তখন ১২ ঘণ্টার মধ্যে সব কিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাই আমরা তাকে বলেছি বান। কোথাও আবদ্ধ হয়ে থাকেনি জল। ক্ষতি হয়েছে জনপদের, সম্পদের, মানুষের জীবনের। কিন্তু একটি বানের ক্ষতিকে যখন তার পূর্ববর্তী ৫/৭টি ছোট বন্যার পলি এবং তা থেকে উর্বরতা উৎসারিত ফসলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, তখন নীট ক্ষতি কিন্তু ততো বেশি হয়নি। তৃতীয়ত : আমাদের নদী কাঠামোর নাব্যতা উত্তর থেকে দক্ষিণে। জলধারা উপর থেকে নিচে নেমে আসে। কিন্তু বহু বছর ধরে ভৌত অবকাঠামো… বাঁধ, সড়ক… নির্মিত হয়েছে পূর্ব-পশ্চিমে। ফলে জলধারার বা বন্যার স্বাভাবিক গতিধারা বিঘিœত হয়েছে এবং এর ফলশ্রæতি বন্যার জল দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকা। এতে মানুষের ভোগান্তির কাল এবং গভীরতা দুটোই বেড়েছে। শহরাঞ্চলের জলাশয়, পুকুর এগুলো বুজিয়ে হর্ম্যরাজি উংঠ্ছ্ ঠিকই, কিন্তু বিঘিœত হয়েছে জলের স্বাভাবিক চলাচল। সামান্য বৃষ্টিতেই তাই আমাদের নগরগুলোতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া বন্যার তাÐবকে রোখা যাবে না আমাদের দেশে। সব সমস্যার মতো বন্যারও একটি উপশমের দিক আছে, আবার একটি নিবারণেরও দিক আছে। এ মুহূর্তে উপশমটাই জরুরি, কারণ ‘মানুষকে বাঁচাতে হবে’, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নিবারণটি অত্যাবশ্যকীয় কারণ ‘মানবতাকে বাঁচাতে হবে’। দুটোর জন্যই আবেগও লাগবে, বিবেকও লাগবে।
বিশ বছর আগে প্রয়াত নিপীড়িত মানুষের সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন তার শেষ গ্রন্থ ‘লক্ষীটারী’র প্রচ্ছদে যা বলেছিলেন, তা দিয়েই শেষ করি, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই এর জবাবদিহি একদিন তোমাকে করতেই হবে উপর-সাদা ভেতর-কালো হে ‘সভ্যতা’। ফেসবুক থেকে




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান

১৩২৭, তেজগাঁও শিল্প এলাকা (তৃতীয় তলা) ঢাকা ১২০৮, বাংলাদেশ। ( প্রগতির মোড় থেকে উত্তর দিকে)
ই- মেইল : [email protected]