• প্রচ্ছদ » সর্বশেষ » কাশ্মির অর্ন্তভুক্তির দলিলটি লাপাত্তা পাকিস্তান বলে ‘জালিয়াতি’, ভারত বলে ‘জানান হয় পরে’


কাশ্মির অর্ন্তভুক্তির দলিলটি লাপাত্তা পাকিস্তান বলে ‘জালিয়াতি’, ভারত বলে ‘জানান হয় পরে’

আমাদের নতুন সময় : 08/08/2019

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে : যে নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও প্রশান্তির প্রতিচ্ছবি নিয়ে বিশ্বে কাশ্মিরের সমাদর, সেই ভূখন্ডটি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের চলমান যুদ্ধবিগ্রহ এবং তা কী সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধে গড়াতে পারে, এমন প্রশ্নই ২০০০ সালে তোলেন ‘কাশ্মির ইন কনফ্লিক্ট: ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড দ্য আনএন্ডিং ওয়ার’ গ্রন্থের রচয়িতা ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড। এ নিয়ে তার নিজের একটি প্রতিবেদন ‘কাশ্মির: দ্য অরিজিনস অব দ্য ডিসপিউট’ প্রকাশ করে বিবিসি ২০০২ সালের ১৬ জানুয়ারি। সর্বশেষ এখন সেই কাশ্মিরের ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ‘বিশেষ মর্যাদা’ রক্ষায় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদটি রদ বা হরণ হওয়ায়, পরিস্থিতি কোথায় গড়াবে কেউ আগাম বলতে অক্ষম। কিন্তু কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের সঠিক কারণটি বোধ করি সকলেরই জানা প্রয়োজন।

বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের সূচনায় ব্রিটিশ গ্রন্থাকার ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড লিখেন, ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা পায়, তখন ৫৬৫টি রাজকীয় রাজ্যের অধিপতিরা, যাদের ভূখন্ড একত্রে ভারতের দুই-পঞ্চমাংশ ও জনসংখ্যায় ৯ কোটি ৯০ লাখ ছিল, তাদের বিবেচ্য ছিল তারা ভারত না পাকিস্তান ডোমিনিয়নে যুক্ত হবে। এক্ষেত্রে জম্মু ও কাশ্মিরের অধিপতি, যার অবস্থান এই দুই দেশের মাঝে পড়েছিল তিনি জানেন না কোন দেশের সঙ্গে যুক্ত হবেন। তিনি হিন্দু ছিলেন, তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি ছিল মুসলিম। তিনি নিরুপায় ছিলেন। তথাপি তিনি অব্যাহত বাণিজ্য, ভ্রমণ ও জনসংযোগের স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ বা কার্যকর চুক্তি সই করেন। কিন্তু ভারত তেমন কিছু করেনি।

পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে পস্তুন বংশোদ্ভূতরা কাশ্মিরে হানা দেয়। যৌক্তিক সংবাদে প্রকাশ সে সময় পাকিস্তানি সরকারের মদদে রাজ্যের মুসলিমদের উপর জাতিগত সহিংসতা ঘটে, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে অর্ন্তভুক্তির বিষয়ে উদগ্রীব ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজ্যের রাজা মহারাজা হরি সিং ভারতের কাছে সামরিক সহযোগিতার অনুরোধ জানান। সে সময় তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটন মনে করেন যে, ‘অ্যা রেফারেন্ডাম, প্লেবিসসাইট ইলেকশন’ বা নির্বাচন নির্ভর গণরায়ের আগে ভারতের সঙ্গে সাময়িক অর্ন্তভুক্তি পরিস্থিতিকে কম বিস্ফোরণ¥ুখ করবে। ফলশ্রুতিতে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ বা অর্ন্তভুক্তি দলিলের ক্ষমতা বলে ভারত পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও জনসংযোগের দায়িত্বভার পায়।
কিন্তু হরি সিং আসলে কখন ওই ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ বা অর্ন্তভুক্তি দলিল সই করেন, তা নিয়ে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তোলপাড় চলছেই (অর্থাৎ ২০০২ সালে এই প্রতিবেদনটি রচনাকালীন)। ভারতের দাবি, ২৬ অক্টোবর সকালে হরি সিং শ্রীনগর থেকে পালিয়ে দিন শেষে জম্মু পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর প্রতিনিধি ভি পি মেননের সঙ্গে কথা বলে তা সই করেন। ২৭ অক্টোবর ভারতীয় সেনা শ্রীনগরে অবতরণ করে।

ব্রিটিশ সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যা অবধি হরি সিং জম্মু পৌঁছতে পারেননি এবং একইভাবে ২৭ অক্টোবর সকালের আগে ভি পি মেনন জম্মু পৌঁছতে পারেননি, অথচ ওই সময়েই ভারতীয় সেনা শ্রীনগরে অবতরণ করেছে। তাই ভারত তার তত্ত্ব প্রমাণ করতে বলছে হরি সিং আগেই শ্রীনগরে ওই দলিলটি সই করেন, যা পরে জানান হয়। কারণ, তখনও তিনি কাশ্মিরি নেতা শেখ আবদুল্লাহকে তার ভবিষ্যত সরকারে অর্ন্তভুক্ত করতে রাজি হননি। অথচ বিশ্বাসযোগ্যভাবে সেই দলিলটি আজও দেখানো হয়নি। তাৎক্ষণিক প্রতিবাদে পাকিস্তান বলেছে, এটা জালিয়াতি, মহারাজাকে আতঙ্কগ্রস্থ করে তা করা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তি থাকতে তিনি তা ভারতের সঙ্গে করতে পারেন না। পাকিস্তান আরো যুক্তি দেখিয়েছে, হরি সিং যেহেতু কাশ্মির উপত্যকা থেকে পালিয়ে যান, সেহেতু তিনি জনগণের পক্ষে তেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপারগ ছিলেন।

তাই পাকিস্তানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জম্মু ও কাশ্মিরের অর্ন্তভুক্তির দলিল নিয়ে যৌক্তিক অভিমত রয়েছে। আর যেহেতু দিবালোকের মতো অর্ন্তভুক্তির দলিলটি ২৬ অক্টোবর সই হয়নি, সেহেতু পাকিস্তান বিশ্বাস করে ভারত সৎ আস্থার পরিচয় দেয়নি, ফলে ওই ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ বাতিল বলে বিবেচিত। ভারতের পাল্টা যুক্তি, সময়ের হেরফের ঘটলেও মহারাজা ভারতের সঙ্গে অর্ন্তভুক্ত হয়েছেন এবং তিনি কোনো প্রকার আতঙ্কগ্রস্থ ছিলেন না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভারত পুরো রাজ্যটাই দাবি করে, যার মাঝে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। ১৯৪৯ সালে ভারত সরকারের অনুরোধে মহারাজা হরি সিং তার সরকার শেখ আবদুল্লাহকে হস্তান্তর করেন। এরপর ১৯৬২ সালে তিনি বোম্বে বা আজকের মুম্বাইয়ে পরলোকগমণ করেন।
সংযুক্ত: ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড রচিত ‘কাশ্মির ইন কনফ্লিক্ট: ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড দ্য আনএন্ডিং ওয়ার’ গ্রন্থের কভার




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]