বঙ্গবন্ধুর রেণু, আমাদের বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা

আমাদের নতুন সময় : 08/08/2019

ফরিদুন্নাহার লাইলী : বঙ্গবন্ধু তার জীবন ও যৌবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন জনগণের সেবায়, দেশের কল্যাণে। এই সময়কালে বেশিরভাগ সময় বঙ্গবন্ধুকে কাটাতে হয়েছে জেলে। আর সেই সময়গুলোতে কা-ারির মতো হাল ধরেছিলেন তারই স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ৮ আগস্ট এই মহীয়সী নারীর জন্মদিন। ১৯৩০ সালের এই দিনে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনে তার প্রভাব অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর নিজের কথা থেকেই তা জানা যায়। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী লেখার পেছনেও মূল প্রেরণা ও উৎসাহ ছিলো বেগম ফজিলাতুন্নেছার। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী লেখা শুরুই করেছেন এই বলে… ‘আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বললো, ‘বসেই তো আছো, লেখো তোমার জীবনের কাহিনি।’ বললাম, ‘লিখতে যে পারি না, আর এমনকি করেছি যা লেখা যায়। আমার জীবনের ঘটনাগুলো জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’ বেগম ফজিলাতুন্নেছা একদিকে যেমন শক্ত হাতে সংসার ও সন্তানদের সামলিয়েছেন, তেমনি নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে অতিক্রম করে স্বামীর সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে ছায়াসঙ্গীর মতো জুগিয়েছেন সাহস ও উদ্দীপনা।  দুঃসময়েও সবদিক লক্ষ্য রেখে শান্ত মনে নিজেই সামলাতে পারতেন সব কিছু। ছেলেমেয়ে নিয়ে বহু কষ্ট আর অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি সংসার চালিয়ে যেতে সমর্থ হন। নিজেই বাচ্চাদের কাপড় সেলাই করতেন। তাদের লেখাপড়ার দিকে লক্ষ্য রাখতেন। পিতার অভাবটা নিজের স্নেহ-ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতেন। আবার তাকে মামলার খোঁজখবর নিতে আইনজীবীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। কারাবন্দি স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে হয়েছে। স্ত্রীর এই ত্যাগের কথা স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু একটি ঘটনার প্রসঙ্গে তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘রেণু খুব কষ্ট করতো, কিন্তু কিছুই বলতো না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করে রাখতো যাতে আমার কষ্ট না হয়।’ (পৃষ্ঠা- ১২৬)

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়, যার শাস্তি ছিলো মৃত্যুদ-। শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে উনসত্তরের গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় পর ক্যান্টনমেন্টে বন্দি শেখ মুজিবের সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছাকে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হতো। এ সময় শেখ মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ছাত্র নেতাদের কাছে পৌঁছে দিতেন ফজিলাতুন্নেছা। তারপর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দি মুক্তি পান। পরের দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ছাত্র-জনতা ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে সংবর্ধনা জানিয়ে বাঙালির একক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।  ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের নেপথ্যে প্রেরণাদাত্রী হিসেবে ফজিলাতুন্নেছার অনন্য ভূমিকা রয়েছে। ঘটনাটি ছিলো এ রকম… এই ভাষণ দিতে যাবার আগে শেখ মুজিব কী বলবেন সে বিষয়ে অনেকে তাকে পরামর্শ, উপদেশ, চিরকুট পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ফজিলাতুন্নেছা তাকে সভায় যাবার আগে ঘরে বিশ্রাম নেবার জন্য কিছুটা সময় একাকী থাকতে দেন। সেসময় তিনি তাকে বলেছিলেন, ‘মনে রেখো, তোমার সামনে আছে জনতা এবং পেছনে বুলেট। তোমার মন যা চাইছে তুমি শুধু সেটাই আজ করবে।’ সেই শৈশব-কৈশোর থেকে তিনি শেখ মুজিবের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকা-ের সঙ্গে পরিচিত। শেখ মুজিবের স্ত্রী ও সহযাত্রী হিসেবে বাংলার স্বাধীনতা ও বাঙালির প্রতিষ্ঠা ছিলো তারও লক্ষ্য। তাই ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব জনতাকে কি বলবেন, তা রেণুকেও আলোড়িত করেছিলো।

শেখ মুজিবের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে ফজিলাতুন্নেছার একটা দৃঢ়চেতা অথচ দরদী মন ছিলো এবং ছিলো আন্তরিক সহযোগিতা। বাঙালির অধিকার আদায় ছাড়া শেখ মুজিবের কাছে প্রধানমন্ত্রীত্ব বা ক্ষমতার কোনো আকর্ষণ ছিলো না। ফজিলাতুন্নেছাও সেই আদর্শে নিজেকে গড়ে তোলেন। সন্তানদের তৈরি করেন।      শহীদ পরিবার ও মুক্তিযোদ্ধাদের রেণু ব্যক্তিগতভাবে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। অনেক বীরাঙ্গনাকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়ে পুনর্বাসিত করেন। এসব কাজ তিনি নিজ উদ্যোগে করতেন। কখনো সরকারিভাবে কিছু চাইতেন না। নিভৃতচারী, ত্যাগী এ নারীকে জনগণ ‘বঙ্গমাতা’ হিসেবে সম্মানীত করেছে। বঙ্গবন্ধুর আজন্ম জীবনসঙ্গী বেগম ফজিলাতুন্নেছা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে নিহত হন। এই মহীয়সী নারীর কথা বাঙালির ইতিহাসে লালিত হয়ে থাকবে ইতিহাসের পথ ধরে।

লেখক : কৃষি ও সমবায় সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সাবেক সংসদ সদস্য




সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈমুল ইসলাম খান
বার্তা ও বাণিজ্য বিভাগ ঃ ১৯/৩ বীর উত্তম কাজী নুরুজ্জামান সড়ক , পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
ছাপাখানা ঃ কাগজ প্রেস ২২/এ কুনিপাড়া তেজগাঁও শিল্প এলাকা ,ঢাকা -১২০৮
ই- মেইল : [email protected]